বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯ |

মশায় মহামারী, আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ...

  শুক্রবার , ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মো: আল আমিন চৌধুরী

মশা পৃথিবীর অতি ক্ষুদ্রও সুক্ষ্ম একটি প্রাণী। শুনে হয়তো বিষ্ময়ত হবেন যে,প্রতিবছর শুধুমাত্র এইক্ষুদ্র প্রাণীটি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যে পরিমান মানুষ মৃত্যুবরন করছেন এর চেয়েঅনেক কম সংখ্যক মানুষ মারা যায় হিংস্র বন্যপ্রাণী বাঘ,সিংহ,হাতি,কুমির  ইত্যাদি আক্রমনে। যদি আমরা একটি ছোট একটিপরিসংখ্যানের দিকে তাকায় খুব সহজেই তা বুঝতে পারব মশার ভয়ংকর রূপ সম্পর্কে ২০১৯সালের জানুয়ারী হতে ১০ই অগাস্ট  পর্যন্তফিলিপাইনে ১,৩০,৪৬৩ জন মানুষ মশা বাহিতরোগে আক্রান্ত হয়ে ৫৬১ জন মারা গেছেন, মালয়শিয়াতে ৭৫,৯১৩ জন মানুষ মশা বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১১১ জন মারা গেছেন, ভিয়েতনামে ১,১৫,১৮৬ জন মানুষ মশা বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১২ জন মারা গেছেন, থাইল্যান্ডে ৪৪,৬৭১ জন মানুষ মশা বাহিতরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬২ জন মারা গেছেন, সিংগাপুরে ৮,০২০ জন মানুষ মশা বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে,শ্রীলংকায় ২৩,৪০৭৮ মানুষ মশা বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জন মারা গেছেন (সূত্রঃ https://reliefweb.int)

বাংলাদেশে ২০১৯ সালে এইপর্যন্ত ৬৯,৮৩৫ জন মানুষ মশা বাহিত  ডেঙ্গু রোগেআক্রান্ত হয়েছে, বেসরকারী তথ্যানুযায়ী প্রায় ১৮৭ জনমানুষের প্রানহানি হয়েছে এবং ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনইআশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েই চলছে। উপরোক্ত তথ্য থেকে সহজেই  বুঝা যায় যে মশা মানুয়ের জন্য কতটা ভয়ংকর।বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর আগে থেকেই মশা বাহিত রোগ ম্যালেরিয়া দ্বারা  আক্রান্ত হয়ে আসছে বলে আমরা জানি। কিন্তু ২০০০সালের দিকে এডিস নামক মশা কামড়ে ডেঙ্গু রোগের কথা প্রথম শুনা যায়, ঐবছর ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫৫৫১ জনএবং প্রায় ৯৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়।এই রোগের ভয়াবহতার বিষয়টাও মানুষ তখন উপলদ্বিকরতে পেরেছি ছিল । ঐবছর আমাদের দেশের নগর অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে ঢাকাবাশী খুবআক্রান্ত হয়েছিল এবং মারা গেয়েছে, তখন গ্রামের দিকে ডেঙ্গুরতেমন কোন প্রভাব পড়ে নাই যেহেতু এডিস মশা থেকে ডেঙ্গু রোগ ছড়াই, আর এই এডিস মশা দুই ধরনের হয় ১)ইজিপটাই ২) অ্যালবোপিকটাস, সাধারনত ইজিপটাই জাতীয় এডিস মশাই ডেঙ্গুর জীবানু বা ভাইরাসবহন করে, আর এই ইজিপটাই জাতীয় এডিস মশাটি শহরেই উৎপাদিত হয়ে আসছিলগ্রাম-গঞ্জে  এডিস তেনম লক্ষ্য করা যায় নাই, যার কারনে নগর অঞ্চলের মানুষজনই এই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তহয়ে আসছিল। মশা উৎপাদনের মূল কারনগুলো সম্পর্কে আমরা সকলে কম বেশী জানি যেনম, বসতবাড়ী,অফিস-আদালত,কারখানা ইত্যাদির পাশে দীর্ঘদিন জমে থাকা পানিতেই এডিস মশা ডিম পারে আর এই ডিমএকবার পারলে ঐ মশার ডিম তিন বছর পর্যন্তু নানা রকম বিরূপ পরিবেশে সুপ্ত অবস্থায় মশা জন্ম উপযোগী াকে বলে বিশেষজ্ঞগনজানিয়েছে।

 মশা যে কতটা ভয়ঙ্কর কীটপতঙ্গ  তা বলার বাকী নেই। সুতারাং রাষ্ট্র ও সমাজ তারজনগনে সুরক্ষা দেওয়া জন্য বা নাগরিকের জীবনে নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থানেয়া উচিত। কিন্তু আমাদের  দেশে সমস্যাযেটা গাং পাড় হলে মাঝি কোন বেটা  বিপদ একটু কমলেই হয়, ভবিষ্যতে কি হবে সেই  প্রতিরক্ষা,পরিকল্পনা ও  প্রস্তুতিতে কারো মাথা ব্যাথা নাই।অতীতের  ভয়াবহতা মনে রাখার দরকার নেই, ভবিষ্যৎ  হুমকি  সে আবার কি জিনিস, যখন আসে এখন দেখা যাবে , চোখের পলকেই সব ভুলে যাই।যেমনটি মশার ক্ষেত্রেও ঘটেছে ২০০০ সালে এডিস মশার প্রকোপ হওয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবেযথাযথ পদক্ষেপ নিতে দেখা যাই নাই ২০১৭ সালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ বাংলাদেশেভয়াবহরূপ ধারন করে, তার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালেও ডেঙ্গু ওচিকুনগুনিয়াতে ক্রমাগতভাবে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে,তখন প্রায় ১০,১৪৮  মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ২৬ মারাগেছে। তারপরও কর্তৃপক্ষের কোন ধরনে টনক নড়তে দেখি নাই। মশাকে আমাদের গৃহপালিতশত্রু করে সযত্নে রেখে দেয়েছে। মশা বাহিত এই সব রোগের প্রকোপের পর রাষ্ট্রীয়কতৃপক্ষ মশা নিধনের যথাযথ পদক্ষেপগুলো কি ছিল? যার পরিণতিসরূপ ২০১৯ সালেবাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগে ৬৯ হাজারের বেশী মানুষ আক্রান্ত হয়, প্রায় ১৮৭ জন মানুষ মারা যায় এবং আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাক্রমাগত বেড়েই চলছে, এই মৃত্যু দায় কার?

সবচেয়ে দুঃশ্চিন্তার বিষয় হল গত ১৯ বছরের এডিস মশা নিধনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থার  অভাবেই ডেঙ্গু রোগ যেমনতার লক্ষন বদলে ফেলেছে তেমনি ধারন করেছে আরো ভয়াবহরূপ। এছাড়াও আগে শুধু মাত্রইজিপটাই জাতীয় এডিস মশা ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস ছড়াত এইবার  অ্যালবোপিকটাস জাতীয় এডিস মশাও নাকি ডেঙ্গুভাইরাস ছড়াচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞ বলছেন। সেই জন্যই হয়তো নগর হতে গ্রাম পর্যায়েও ডেঙ্গুরোগ  প্রকোপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং যাবড় ধরনের মহামারির সংকেত দিচ্ছে যেমন কুষ্টিয়ার দৌলপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নেরছাতারপাড়ায় মানুষ আগস্ট মাসের আগে জানতেনই না ডেঙ্গু কি রোগ অথচ  সেখানে গত ১৩ দিনে ৪১ জন মানুষ ডেঙ্গুতেআক্রান্ত। আমাদের সমাজের বড় সমস্যা যেটি তা হলে রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় নাপড়লে আমরা প্রতিরোধের পদক্ষেপ নিতে চাই নাই। যেখানে  এই বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু চোখ রাঙ্গানিদিচ্ছিল এখন আমাদের নগর কর্তৃপক্ষের কোন ধরনের কর্ণপাত তো করছিল না, বরং এগুলো সম্পর্কে মিথ্যা ধারনা ছিল, কেউ কেউ নামেমাত্র কিছু ব্যবস্থা নিলেও, যাচাই করে  দেখে নাইযাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা  আদৌকিছু করেছে  নাকি নিজের পেঠ পালনেই ব্যাস্তছিল।

আপনি যদি ঢাকা কিংবা চট্র্রগ্রাম নগরীর বাসিন্দা হয়ে থাকেন তাহলে আপনি নিজেইবলতে পারবেন আপনার ওয়ার্ড বা মহলায় সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে মশক নিধনের কিব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, নগরীর রাস্তাঘাট,পার্ক,খাল,জলাশয় পরিছিন্ন ও মশকমুক্ত রাখতে কর্তৃপক্ষ কি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে?নগরী পরিষ্কার রাখা ওমশামুক্ত রাখা কি খুব ব্যয়বহুল কাজ? অথচ আপনারা লক্ষ্য করবেনবিগত ৩/৪ বছরে নগরীর বাসিন্দাদের  নগরকরদ্বিগুনেরও বেশী বৃদ্ধি করা হয়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ীনাগরিক সেবা তো বাড়ছে তো? না,যা বিগত দিনের  তুলনায় দিনে দিনে মুরগী থেকে ডিমে রূপান্ত হয়েযাচ্ছে, যেখানে ২০ বছরে নগরী হওয়ার কথা ঝলমলে সেখানে দিনে দিনে নগর হচ্ছে আবর্জনা, ধূলা-বালি ও মশা-মাছি বিচরন ভূমি।  আমাদের নগরীকে যারাদায়িত্ব নিয়েছেন এবং সেবার নামে আমাদের পকেট থেকে নিচ্ছেন টাকা, যা দিয়ে তারা নগর ও নাগরিক উন্নয়নের কার্যক্রম পরিপালনকরবেন, মশকসহ ক্ষতিকর কীটপঙ্গ নিধনে প্রয়োজনী কীটনাসক ব্যবহারকরবেন, গবেষনা করবেন, সেখানে  আমাদের প্রশাসনেক কর্তাগন তাদের শো-ডাউন করারজন্য করছেন নাট্যমঞ্চ, গেঞ্জী-টুপির কাড়াকাড়ি, টেলিভিশনে ঝাড়ু নিয়ে নাড়ানাঢ়ি ইত্যাদি আরো অনেক হাস্যকরজিনিস অথচ সারা বছর কোন ব্যবস্থা নেই, দিনে শেষে মশা যখন নাকেরডগায় তখন এসে পায়চাড়ী করেছে।

বিগত দিনেআমাদের রাষ্ট্রী কর্তৃপক্ষ ও জনসাধারন ডেঙ্গু বিষয়ে যে অসচেতন নীতি অবলম্বন করেছে।তারই সুযোগে দিনেদিনে মশা যে বিদধ্বংশী ও ভয়ঙ্কর উঠেছে ,বিগত ২০ বছর পর এডিস মশা ১০গুন বেশী মাত্রায় রোগ প্রকোপ ছড়াচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মূখে পড়বে। সুতারাডেঙ্গু প্রতিরোধে এখনই সবোর্চ্চ পদক্ষেপ রাষ্ট্র ও জনগনকে নিতে হবে।কেননা মশা ভাইয়েরা কিন্তুছোটভাই-বড়ভাই, ধনী-গরীর, রাজা-প্রজা ও উঁচুনিচু বিছুই চিনে না ,সেটা কিন্তু আমরা এইবারই লক্ষ্য করেছি যেমন ডেঙ্গুতে চট্রগ্রামের সিভিল সার্জন,  ঢাকাতে পুলিশ পত্নি ওডাক্তারসহ আরো পদস্থ জায়গার মানুষ মৃত্যুবরন করেছেন। সুতারাং হঠাৎ করে ডাক-ঢোল, শোভাযাত্রা,নাট্যমঞ্চ, গেঞ্জী-টুপি পরে ঝাড়ু নিয়া দৌড়ঝাপ দিলেই কিংরা ১০ তলার উপরেবসে থাকলেই মশার আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। সেজন্য যেটা দরকার রাষ্ট্র,সমাজ, পরিবেশ,জনগণের নিরাপত্তা বিধানেদুর্নীতি রোধ করে একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা প্রনয়ণ করে নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে  আন্তরিকতার সহিত  মশা নিধনে বাস্তবসম্মত  ব্যবস্থা করিলে হয়তো আমরা  আগামী দিনের মহামারী হতে রক্ষা পেতে পারি।  

 

প্রকাশক, দি এশিয়ান এইজ

 

 

 


 

 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ