সোমবার , ২১ অক্টোবর ২০১৯ |

বিবেকের অনুশাসন ও স্বাধীনতার সীমারেখা

  রবিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আহমাদ ফরিদ


বিবেক মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার। মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্যের মাপকাঠি। সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ হিসাবে মানুষকেই শুধু বিবেক দেয়া হয়েছে। বিবেকের পাশাপাশি মানুষের জন্য রয়েছে কিছু অনুশাসন ও আচরণবিধি। বিবেক হচ্ছে ন্যায়-অন্যায় যাচাইয়ের মানদ্ল। বিবেকের সঙ্গে মানুষকে দেয়া হয়েছে ইচ্ছা-অনিচ্ছার ক্ষমতা ও সীমিত স্বাধীনতা। পশুদের কোন বিবেক নেই, তাই তার জন্য কোন আচরণবিধিও নাই। অথাৎ পশুদের যথেচ্ছাচারের সুযোগ থাকলেও মানুষের সে সুযোগ নেই। মানুষকে চলতে হবে তার শ্রেষ্ঠ অলংকার বিবেকের অনুশাসন মেনে। কারণ বিবেকই মানুষকে ন্যায্য পথে পরিচালিত করে। বিবেক এমন একটা কিছু যাকে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু একটা মানুষের বিবেক আছে কিনা তা তার আচরণ দেখেই বুঝা যায়। বিবেক এমন একটা বোধ যা মানুষকে সুপথে পরিচালিত করে। কথায় আছে বিবেকহীন মানুষ পশুর সমান। বিবেক মানুষকে সত্য,ন্যায়-নিষ্ঠা ও মানবিক কর্তব্য বোধের পথে অগ্রসর  করে।

বিবেক মানুষকে পাশবিক হতে বাধা দেয় ,মানুষের মনুষ্যত্ব ধরে রাখে। আর যে পশু হতে চায়, তাকে প্রথমেই যা বিসর্জন দিতে হয়, সেটা হচ্ছে তার বিবেক। মোটকথা বিবেক হচ্ছে মানুষের মনুষত্বের সনদ কেউ বিবেকহীন হলে সেটা তার মনুষ্যত্বের অবনমন। প্রকৃত পক্ষে বিবেক ছাড়া একজন মানুষকে কল্পনাই করা যায় না। কাজেই বিবেক বিসর্জন দিয়ে কেউ নিজেকে ঠিক মানুষ দাবী করতে পারে না। কারণ বিবেকই মনুষ্যত্বের একমাত্র পরিচায়ক। একজন মানুষের বিবেক থাকলে তার পক্ষে মিথ্যা বলা, দূুর্নীতি করা, প্রতারণা করা, খুন-ধর্ষণ করা সহ কোন অন্যায়-অপরাধ করাই সম্ভব নয়। বিবেক হচ্ছে মানুষের মনুষ্যত্বের রক্ষা কবচ। মনুষ্যত্বের সেফটি গার্ড। অন্তরের পাহারা। কেউ পাপ বা অন্যায় করতে চাইলে তার মনে বিবেকের এলার্ম বেজে উঠে। তখন বিবেক সতর্ক হয়ে তাকে অন্যায় বা পাপকাজে বাধা প্রদান করবে। এটাই মূলত বিবেকের কাজ। যে মানুষ চায় বিবেক তার সঙ্গে থাকে। যে বিবেকের পাহারা চায় না বিবেক তার সঙ্গে থাকে না।

সকল মানুষই বিবেকবান হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইদানিং কালে মানুষের বিবেক একটা দূর্লভ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ দিনদিন বিবেকবান মানুষের সংখ্যা কমছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। অবক্ষয়ে অবক্ষয়ে মানুষ দিনদিন বিবেকহীন হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু মানুষের বিবেক না থাকাটা পশুত্বের সামিল, সেহেতু বর্তমানে  মানুষের মধ্যে পশুসূলভ আচার আচরণ যেমন,অন্যায় অবিচার,নির্মম নিষ্ঠুরতা,লুটপাট,ঘুষ দুর্নীতি ও হত্যা ধর্ষণ ইত্যাদি বেশী মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। মানুষ  যেন তার শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আর থাকতে চাইছে না। তারা বিবেকের অনুশাসনের ধারই আর ধারতে চাইছে না। যেন বিবেক বড্ড সেকেলে বিষয়, আধুনিকতার জন্য যাকে তার পরিত্যাগ করতেই হচ্ছে! বিবেকের অনুশাসন না মেনে চললে যা হয়, বর্তমানে আমাদের তাই হয়েছে। আমাদের চারপাশে এখন অশান্তি,অস্বস্তি আর অস্থিরতায় ঠাসাঠাসি। বিবেক, মনুষ্যত্ব আর মানবতার কোন স্থান সেখানে নেই। অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, বিবেকের কথা শুনলে নাকি এখন মানুষের হাসি পায়! এটা মানব সভ্যতার জন্য একটা বড় মাপের অশণি সংকেত। এই  বিবেকহীন অভিযাত্রা  আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, আমরা তা একবার চিন্তা করেও দেখছি না। বিবেক পরিত্যাগের বর্তমান লাভ আমরা দেখছি কিন্তু এর ভবিষ্যত পরিণাম কি হবে আমরা তা ভাবতে পারছি না। আর ভাবতে পারছি না বলেই আমাদের বিবেকহীন অভিযাত্রা এখনো অব্যাহত আছে।

আমি পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, মানুষের বিবেকহীন অভিযাত্রা এভাবে চলতে থাকলে সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন মানুষ আর পশুতে কোন পার্থক্য থাকবে না। দৃশ্যত মানুষ সেদিন পশুদের মতই সম্পুর্ণ বিবেকহীন হয়ে যাবে। আর আমরা সবাই একসঙ্গে বিবেকহীন হয়ে গেলে পৃথিবীটা মানুষ পশু কারোরই বাসযোগ্য থাকবে না। পাশবিকতার ভিতর মানবিকতা  হারিয়ে গেলে মানুষ পশুর চেয়েও  এক কাতার নিচে নেমে আসবে। যখন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন পশুরাও মানুষকে আর ছাড় দেবে না। তখন মানুষ পশুতে সংঘর্ষ অনিবার্য। আর পশুরা যেহেতু জন্মগত পাশবিক, তাই মানুষের তার সাথে পেরে না উঠারই কথা। একটা কথা মনে রাখতে হবে, পশুরা কিন্তু বিবেকহীন মানুষের মত দুই নম্বরী মাল নয়

। পাশবিকতার বেলায় তারাই কিন্তু অরিজিনাল। সেই ক্ষেত্রে বিবেকহীন মানুষেরা হবে দুই নম্বর পশু। তো সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের আসন ছেড়ে দুই নম্বর পশু হওয়াটা কি আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে? প্রশ্নটা রইল আপনি আমি সকলের কাছেই । সৃষ্টিজগতে সেরা জীব মানুষকে আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন মনে হলেও সৃষ্টিতত্ত্ব মতে সে স্বাধীন নয়, পরাধীন। স্রষ্টার ইচ্ছায়  পৃথিবীতে প্রেরণের সময় তাকে অনেক শর্ত,নিয়ম কানুন,আচরণবিধি হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে এসে মানুষ সে অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করবে-এটাই সৃষ্টিকর্তার বিধান। মানুষকে নিয়তি দিয়ে বেধে ফেলা হয়েছে। নিয়তিকে এড়িয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। নিয়তি ছাড়াও মানুষের জন্য রয়েছে বিস্তারিত আচরণবিধি। সেই আচরণবিধিতে মানুষকে সীমিত স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। চাইলে মানুষ তার আচরণবিধি পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ মানুষ ইচ্ছা করলে ভালো কিংবা খারাপ যে কোন পথে চলতে পারে। এই সীমিত স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টিকর্তা মানুষকে পরীক্ষা করছেন। সৃষ্টিকর্তার বিধান মত চলতে হলে মানুষকে সৃষ্টিকর্তা যে সীমা বেধে দিয়েছেন তার মধ্যে থাকতে হবে। বিধান মতে চললে মানুষকে এর সীমা লংঘণের কোন অধিকার দেয়া হয়নি। মানুষ সম্পুর্ণ স্বাধীন হলে সীমা লংঘনের এই নিষেধাজ্ঞা তার জন্য থাকতো না।

 সৃষ্টিতত্ত্বের বাইরেও রয়েছে মানুষের সামাজিক আচরণবিধি। মানুষ সেখানেও পরাধীন। সেখানেও রয়েছে পদে পদে দায়বদ্ধতা। এত দায়বদ্ধতা নিয়ে স্বাধীনতা উপভোগ করা যায় না। তবে এই দায়বদ্ধতার জন্যই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের আসন লাভ করেছে সৃষ্টি জগতে। এ দায়বদ্ধতা,এই পরাধীনতা কিন্তু মানুষের জন্য গর্বের। আত্মমর্যাদাবোধের কারণে মানুষ নিজেই তার মনুষ্যত্বের কাছে দায়বদ্ধ। এই দায়বদ্ধতাই মানুষকে মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়। সৃষ্টির খেলায় পাশ করায় একটা নির্দিষ্ট সীমার ভিতর মানুষের জীবনযাপন,বিচরণ। এই সীমার বাইরে তার যাওয়া বারণ। তার যত কল্যাণ যত মঙ্গল সব এই সীমার ভিতরেই। সীমার বাইরে তার জন্য রয়েছে অকল্যাণ আর সর্বনাশ। কাজেই নিজের মঙ্গল চাইলে কেউ তার সীমা লংঘণ করবে না। সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টি মানুষের মঙ্গল চান বলেই তিনি সীমা লংঘণের অধিকার মানুষকে দেননি। পশুদের সাথে রয়েছে মানুষের একটা সীমানা প্রাচীর।

মানুষ যদি সেই প্রাচীর টপকাতে চায় তাও সীমা লংঘণ। এখানেও মানুষের জন্য রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। মানুষের মত মানুষ থাকতে চাইলে সেই সীমাও লংঘণ করা যাবে না। আচরণগত দিক দিয়ে পশুদের জগতে মানুষের প্রবেশ নিষেধ। তারপরও কেউ সেখানে প্রবেশ করলে সেটাও হবে সুষ্পষ্ঠ সীমা লংঘণ। এই সীমা মানুষদের মধ্যে যে বা যারা লংঘণ করবে তারাও পশু সমতুল্য হয়ে যাবে। কারণ তারা সীমা লংঘনকারী । মানুষকে যেহেতু সীমা লংঘণের অধিকার দেয়া হয়নি, তাই মানুষ  স্বাধীন নয়। তার শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা ধরে রাখার সংগ্রাম, স্বাধীনতার চাইতেও মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যা খুশি তা করা মানুষের কাজ নয়,পশুদের কাজ। সেই অর্থেই বলছিলাম মানুষ স্বাধীন হতে পারে না। পদে পদে সে তার নিয়তি আর মানবিক ও সামাজিক আচরণবিধির কাছে দায়বদ্ধ। একটা নির্দিষ্ট সীমার ভিতর তাকে জীবন যাপন করতে হয়। সেই সীমা লংঘণের কোন অধিকার সৃষ্টিকর্তা ও সমাজ কেউই  তাকে দেয় না। তাইতো তিনি বারবার সীমা লংঘণকারীদের বিষয়ে হুসিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। তার এ হুসিয়ারী মানব জাতির কল্যাণের জন্য, মুক্তির জন্য। যা কোনমতেই  উপেক্ষা করা যায় না। যারা উপেক্ষা করেন, তাদের সর্বপ্রকার সর্বনাশ সুনিশ্চিত। এ ব্যাপারে পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মই একমত।  -- লেখক ও সাংবাদিক


 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ