বৃহস্পতিবার , ০৫ অক্টোবর ২০১৭

মানুষ কতটা শিকারিপ্রবণ

  বৃহস্পতিবার , ০৫ অক্টোবর ২০১৭

অতি শক্তিশালী শিকারি প্রাণী হিসেবে মানুষ অতুলনীয়। মানুষের শিকারের ধরন নির্মম। আধুনিক নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে রেখেই বেশি বেশি শিকার সম্পন্ন করতে পারছে। মানুষের এই আধিপত্যের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অন্যান্য প্রাণী ও প্রজাতির ওপর। শিকারি হিসেবে মানুষের নিষ্ঠুরতা এবং বিভিন্ন প্রাণীর ওপর তার প্রভাব নিয়ে সারা বিশ্বের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কানাডার একদল বিজ্ঞানী সায়েন্স সাময়িকীতে এসব কথা জানিয়েছেন। চোখ বন্ধ করে ভাবলেই এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষ কি না করে। তারা বনের পশুকে শিকার করার কৌশলকে ক্রমাগতভাবে মানবজাতির ওপরই প্রয়োগ করছে এখন। খাবারে বিষ মেশায়, ওষুধে ভেজাল দেয় বা ভেজাল ওষুধ তৈরি করে। সায়েন্স সাময়িকীতে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক প্রাণীর শিকার হয়ে পূর্ণবয়স্ক মাছের সংখ্যা যত কমেছে, মানুষের কারণে কমেছে তার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি। আর স্থলে ভালুক, নেকড়ে ও সিংহের মতো বিভিন্ন শিকারি প্রাণী হত্যা করছে মানুষ। এসব প্রাণী পরস্পরকে যে হারে শিকার করে, সেই তুলনায় তারা নিজেরাই মানুষের শিকার হচ্ছে ৯ গুণ বেশি। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, শিকারি মানুষের আগ্রাসন জলে-স্থলে অন্যান্য প্রজাতির জন্য এতটাই বিপর্যয়কর যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্রাণীর ক্রমবিকাশের ধারাই বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মানুষ যে শিকারি প্রাণী—এই নিয়ে সংশয়ের অবকাশ হয়তো নেই। কেননা, মানবজাতি সৃষ্টির পর থেকেই বনে-জঙ্গলে বসবাস করতে শুরু করে। আর বনে-জঙ্গলে হিংস্র পশু ও প্রাণী থেকে আত্মরক্ষা করে নিজেদের আহার সংগ্রহসহ বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ শিকারের ক্ষেত্রে কৌশলী হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আদিমকাল থেকে শিকারের প্রবণতা মানুষ কি আধুনিক সভ্যতায় ভুলতে পেরেছে? আমরা কি বুকে হাত রেখে বলতে পারব যে, মানুষ এখন আর শিকার করবে না। আজ বনের হরিণ, বাঘ, সাপ, পাখিসহ বেশির ভাগ প্রাণী মানুষের শিকারে পরিণত হয়। হিংস্রমাংসাশী বাঘ, বিষধর সাপকে যে মানুষ শিকার করতে পারে সেই তো সবচেয়ে বড় শিকারি—তাই নয় কি। এই শিকারিপ্রবণ মানুষের নির্মম, নির্দয় আর নিষ্ঠুরতার শিকার এখন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানরা। মিয়ানমারের বৌদ্ধরা আরাকান রাজ্যের নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ নিরীহ স্বজাতিকে (মানুষ) হত্যা করছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধদের অমানবিক নির্যাতন মানবসমাজের সৃষ্টিগত মাহাত্ম্যকেও নির্মমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বৌদ্ধদের এই নির্মমতা তাদেরকে মানুষজাতি হিসেবে প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিয়েছে। একজন ভালো থাকার জন্য অপরজনকে হত্যা বা নিধন করার এমন নিষ্ঠুরতাই প্রমাণ করে যে, মানুষই সবচেয়ে বড় শিকারি!

অন্যান্য শিকারি প্রাণীর চেয়ে মানুষের শিকারের ধরন আলাদা। আগে মানুষ বিপজ্জনক নানা উপায়ে শিকার করত। এখন অত্যাধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণী হত্যা করা হচ্ছে। স্তন্যপায়ী প্রাণী হত্যায় বন্দুকের গুলি এবং মাছ শিকারে জাল ও হুক ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজেদের নিরাপদে রেখেই শিকার করার এই সুবিধাটা অন্য কোনো শিকারি প্রাণী পায় না। মানুষ পায় এবং তারাই সবচেয়ে বড় শিকারি প্রাণী। ধামরাইয়ের গভীর জঙ্গল থেকে পলিথিনের ব্যাগে শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে এলাকাবাসী। জানা গেছে, ধামরাইয়ের শুয়াপুর পুকুরপাড়ে গভীর জঙ্গলে পলিথিনের ব্যাগে ভরে ফুটফুটে নবজাতককে কে বা কারা ফেলে চলে যায়। ভোররাতে পথচারীরা শিশুর কান্না শুনে প্রথমে ভয়ে দৌড় দেয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সবাই মিলে জঙ্গলে গিয়ে পলিথিনের ব্যাগ থেকে শিশুটি উদ্ধার করে। একটি নিরপরাধ নিষ্পাপ শিশুকে হত্যার মানসে ফেলে দেওয়ার ঘটনা কি মানুষের নিষ্ঠুর শিকারি মানসিকতা বা আচরণে অব্যস্ত হওয়ার পরিণতি নয়!

ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখে ভাবলাম, মানুষের শিকারিপ্রবণতার প্রমাণ আছে এই কথাগুলোতে। দেখা যাক মেলে কি না—‘মুচি চায় আপনার জুতো দ্রুতই ছিঁড়ে যাক। ডাক্তার চায় আপনি ঘন ঘন অসুখে পড়ুন। পুলিশ চায় আপনি বেআইনি কাজ করুন অথবা ফাঁদে পড়ুন। উকিল চায় আপনি মামলায় জড়িয়ে যান। আপনার বাড়ির ওয়্যারিং, লাইট, ফ্যান, ফ্রিজ, টিভি নষ্ট হোক এমনটি চায় ইলেকট্রিশিয়ান। বাড়িওয়ালারা চায় জীবনে যেন আপনি বাড়ির মালিক না হতে পারেন। ব্যাংকার চায় আপনি টাকা লোন নিয়ে ঋণগ্রস্ত হোন। গৃহশিক্ষক চায় আপনার সন্তান বইয়ের পড়া কম বুঝুক। মানুষের এসব ফাঁদচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে মূলত মানুষই। যেমন—যে ব্যক্তি কার্বাইড দিয়ে কলা পাকায়, সেই ব্যক্তি বিষাক্ত ওষুধ দিয়ে পাকানো অন্য ফল বা ফরমালিনযুক্ত মাছ কিনে খায়। আবার যে ব্যক্তি ফরমালিন মিশিয়ে মাছ বিক্রি করে, সেই ব্যক্তি অতিরিক্ত কীটনাশকযুক্ত ফলমূল, সবজি নিয়ে পরিবারসহ ঠিকই খাচ্ছে। ভেবে দেখলে সহজ হয়ে যায় ব্যাপারটি। কোনো প্রকার ফাঁদ পেতে অন্যকে শিকার করলেও নিজের জন্যও অনেক অনেক ফাঁদ পাতা আছে এই মানব সমাজে। এ থেকে বাঁচার কি কোনো উপায় নেই?

মানুষের শিকারিপ্রবণতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! কবর থেকে লাশ তুলে কঙ্কাল বিক্রি করা হচ্ছে। জীবন্ত মানুষের কিডনি কেটে নিয়ে লাশ ফেলা হয় নদীতে। রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে কিডনি পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। সারা দেশে অর্ধশতাধিক কিডনি পাচারকারী চক্র রয়েছে। গ্রেফতারকৃদের তথ্যে জানা যায়, ভারতের কয়েকটি হাসপাতালে এসব কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। তাদের সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের কিছু চিকিৎসকের যোগাযোগ রয়েছে। রোগীদের টার্গেট করে তাদের কাছে এসব কিডনি বিক্রি করা হতো। ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে কলকাতার একটি হাসপাতালে গিয়ে এসব কিডনি প্রতিস্থাপন করা হতো। গোয়েন্দা মুখপাত্রের ব্রিফিং অনুযায়ী, এই চক্র খুবই ভয়ঙ্কর। যারা কিডনি দিতে অস্বীকার করে তাদের অজ্ঞান করে কিডনি নেওয়া হতো। বিদেশি টিভি সিরিয়াল দেখে প্রভাবিত হয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে নাটোরে তানভীর হোসেন নামে এক মাদরাসাছাত্রকে হত্যা করেছে তার তিন সহপাঠী। ঘটনাটি ঘটেছে শহরের আলাইপুর এলাকার আশরাফুল উলুম মাদরাসায়। অপহৃত ওই মাদরাসাছাত্রের লাশ সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পুলিশ ৩১ আগস্ট রাতে তানভীরের সহপাঠী হুসাইদ হোসেন, বাইজিদ হাসান ও নাঈমকে আটক করে। বিদেশি সিরিয়াল দেখে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত হয় বলে স্বীকার করেছে তিন হত্যাকারী। চরম, নির্মম ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে। বংশদ্বন্দ্বে চার শিশুকে খুন করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে! এটা কি মানুষের শিকারিপ্রবণতার প্রতিফলন নয়। সভ্যতার নামে আমরা কি আদিম নৃশংসতার যুগে চলে যাচ্ছি না। কেন এমন ঘটছে, এর বহুবিদ ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান, মূল্যবোধ, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদিসহ নানা ব্যাখ্যা তুলে ধরা যেতে পারে। মানুষের মাঝে এত হিংস্রতা আধুনিক সভ্যতায় ইতোপূর্বে আর দেখা যায়নি। কেন জানি মনে হচ্ছে, মানুষজাতি আবারও আদিম বর্বরতার খোলসের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে, যা কখনই আমাদের প্রত্যাশা হতে পারে না।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ