বৃহস্পতিবার , ০৫ অক্টোবর ২০১৭

প্রবীণরা মূল্যবান মানবসম্পদ

  বৃহস্পতিবার , ০৫ অক্টোবর ২০১৭

ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার।/মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার।/নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি।/ সবচাইতে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি।/ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম,/আমার এ ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।’ যিনি এ দেশে সর্বপ্রথম বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করেছেন, তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আর যেন কেউ দ্বিতীয়টি তৈরি না করে। কেননা এটা সভ্যসমাজের তথা মানবতার জন্য এক কলঙ্কচিহ্ন। আমাদের সমাজের বৃদ্ধ মানুষরা চরম অবহেলিত। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ আজ চোখে খুব কম দেখে, কানে অল্প শোনে, বেশিক্ষণ কথা মনে রাখতে পারে না। আজ অনেক কিছুর ঘাটতি হয়েছে, কিন্তু কমতি হয়নি সন্তানের প্রতি চির অমলিন ভালোবাসার।

ছেলে টগবগে যুবক। পরিপাটি পোশাক পরিধান করে ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় বাবা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাবা কোথায় যাচ্ছ এবং কখন ফিরবে?’ ছেলে একটু আগে উত্তর দিয়েছিল, কিন্তু বাবা দুর্ভাগ্যবশত শুনতে বা বুঝতে পারেননি। দ্বিতীয়বার বাবা একই প্রশ্ন করলে ছেলে রাগত স্বরে বা ধমকের সুরে বলল, ‘বললাম তো কাজে যাচ্ছি।’ বাবা খুবই মন খারাপ করলেন এবং ছেলেকে বললেন, ‘বাবা তুমি যখন খুবই ছোট্ট ছিলে তখন জ্যোৎস্না ভরা রাতে তোমাকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বাইরে বের হলে তুমি চাঁদকে দেখে বলতে, বাবা এটা কি? আমি বলতাম চাঁদ। আবার দুই-এক মিনিট পর পুনরায় জিজ্ঞাসা করলে আমি একই উত্তর দিতাম। কখনো বিরক্ত না হয়ে যতবার জিজ্ঞাসা করতে, ‘আমি ততবার উত্তর দিতাম।’ বাবারে! আজ তোমাকে মাত্র দুইবার জিজ্ঞাসা করেছি আর তাতে তুমি রাগ করছ বা বিরক্ত বোধ করছ। ঠিক আছে আমারই ভুল হয়েছে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করা। এই বলে আফসোস করে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন।

এই সমাজে অকৃতজ্ঞ ছেলেও যেমন আছে আবার কৃতজ্ঞ ছেলেও আছে। এমনি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করছি। নবাব আলীবর্দী ছিলেন উড়িষ্যার অধিপতি। তিনি বাংলাদেশ জয়ের জন্য সৈন্যবাহিনী নিয়ে নিজেই অগ্রসর হলেন। এ সময় বাংলার শাসক ছিলেন সরফরাজ খাঁ। নবাব সরফরাজ খাঁর সুযোগ্য ও দক্ষ সেনাপতি ছিলেন বিজয় সিংহ। বিজয় সিংহ বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন নবাব আলীবর্দীর সেনাবাহিনীর সঙ্গে। উভয় বাহিনী মুুখোমুখি হয় গঙ্গার তীরে গিরিয়া ময়দানে। সাহসী এবং দেশপ্রেমিক বিজয় সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছিল তার বারো বছরের কিশোর পুত্র জালিম সিংহ। যুদ্ধ করতে করতে বিজয় সিংহ এক সময় শত্রুর বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন। মর্মান্তিক এ দৃশ্য দেখে জালিম সিংহ তার বাবার মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে হাতের তলোয়ার সাঁই সাঁই করে চারদিকে ঘোরাতে লাগলেন। উদ্দেশ্য লাশের কাছে কাউকে আসতে না দেওয়া। শত্রুপক্ষের সৈন্যরা বালকের কান্ড দেখে কেউ কেউ তাকে ঘিরে ধরল এবং একজন সৈন্য বন্দুক উঁচু করল তাকে গুলি করার জন্য। এ দৃশ্য দেখে নবাব ছুটে এসে বন্দুক নামাতে বললেন এবং বালকের সাহস দেখে নবাব নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলেন সে কী চায়? বালকটি বলল, ‘আমি আমার বাবার পবিত্র দেহ রক্ষা করে, হিন্দুমতে সৎকার করতে চাই।’

মহত্ত্ব ও উদারতা দেখিয়ে নবাব আলীবর্দী বীর বালকের শুধু অনুরোধই রক্ষা করলেন না, তার সাহস, সততা, দেশপ্রেম ও পিতৃভক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের নাম গিরিয়ার পরিবর্তে ‘জালিম সিংহের মাঠ’ নাম রেখে দিলেন। আজ জালিম সিংহ ও নবাব আলীবর্দী খাঁ কেউই বেঁচে নেই। কিন্তু পিতৃভক্তি বা শ্রদ্ধার কারণে কাহিনিটা বাংলার ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

১ অক্টোবর ছিল আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এবারের এ দিবসের প্রতিপাদ্য-Stepping into the Future. Tapping the Talents, Contributions and Participation of the older Persons in Society. ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (৪০/৮৬ নম্বর সিদ্ধান্ত) প্রবীণ সংক্রান্ত ভিয়েনা আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরই আলোকে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাধারণ সভার ৪৫/১০৬ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালন করা হয়। প্রবীণদের মানবিক ও সম্মানজনক অধিকার সংরক্ষণসহ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব গড়ে তোলা দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য।

প্রবীণদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানব জীবনের শেষ অধ্যায়ে উপনীতদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বিশ্বে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস সবার প্রতি এ বোধ সৃষ্টির অনুপ্রেরণার নিবেদিত একটি কৃতজ্ঞতাময় দিবস। ভবিষ্যৎ নাগরিকদের কল্যাণে সামর্থ্য থাকাকালীন সময়ে কঠোর শ্রম দিয়েছেন যারা-বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতি যদি সদাচরণ করা না হয়, তাহলে পৃথিবীতে কৃতজ্ঞতা বোধ বলে কিছুই থাকবে না। মানব জীবন বড় বিচিত্রময়। জীবনের নিয়মে সব মানুষই একসময় প্রবীণ অর্থাৎ বুড়ো হয় আর বুড়ো বয়সে শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে সংসারে মানুষ নানা রকম সমস্যা বা অসুবিধার সম্মুখীন হয়।

এই সমস্যা পারিবারিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক। উপার্জন করার সামর্থ্য না থাকায় অনেক সময় পরিবারে বুড়ো মানুষের গুরুত্ব কমে যায়। তারা নানা রকম অবহেলা বা উপেক্ষার শিকার হন। আয়ের অভাবে জীবনধারণ, নিজের আশ্রয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে বা তাদের কাছে হাতপাততে হয়। এটা তাদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে রাষ্ট্র বা সরকার প্রবীণদের জন্য নানা রকম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে। আমাদের দেশেও বর্তমানে প্রবীণদের সমস্যা ও তাদের অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমাদের সবারই পরিবারে কিংবা আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ না কেউ প্রবীণ আছেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে অথবা রাস্তায় বেরুলেও আমরা অনেক প্রবীণ লোককে দেখতে পাই। চলাফেরায়, রাস্তায় পেরুতে, যানবাহনে উঠতে তাদের অসুবিধাগুলো আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারি। এই প্রবীণরা সবসময় প্রবীণ ছিলেন না।

একসময় তারা পরিবার ও সমাজের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আজ বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতিও সমাজের কিছু দায়িত্ব¡ বা কর্তব্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরাও যে একদিন বৃদ্ধ হব সে কথাটাও মনে রাখা দরকার। বয়স বা অসুখ-বিসুখের কারণে কাজ করার সামর্থ্য কমে এলেও প্রবীণরা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারেন। সেদিক থেকে তারা অন্য যেকোনো বয়সের মানুষের মতোই সমাজের সম্পদ। অর্থাৎ মূল্যবান মানব সম্পদ।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও ৬০ বা ৬৫ বছরের বয়সের পর একজন মানুষকে প্রবীণ বা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ গণ্য করা হয়। সমাজে তাদের বিশেষ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। জাতিসংঘ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কতিপয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘ প্রবীণদের অধিকার ও তাদের প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রতিটি দেশে কাজ করে যাচ্ছে। প্রবীণ শুধু পিতা নয়, মাতাও হন। তাই পিতৃ ও মাতৃঋণের কাছে চিরদায়বদ্ধ পৃথিবীর সব সন্তান। সন্তান এবং পিতামাতা একে অপরের পরিপূরক বা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সময়ের বিবর্তনে একে অপরের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। পরিশেষে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে চিরকৃতজ্ঞ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং অকৃতজ্ঞ সন্তানদের পুনরায় প্রবীণদের (পিতা-মাতা) ব্যাপারে ভেবে দেখার বিনীত অনুরোধ রইল।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ