মঙ্গলবার , ১৫ অক্টোবর ২০১৯ |

প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন

  শুক্রবার , ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশে বাঙালির ঘরে জন্ম নিয়ে শিশুরা বাংলা অক্ষর চেনে না, বাংলা পড়তে পারে না এটা কি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়? তবে হ্যাঁ এটাই বাস্তবতা। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের জরিপে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্ব ব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে না। আবার কিছু শিশু শিক্ষার্থী আছে, যারা ঠিকমতো অক্ষরই চিনে না। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা তার চেয়ে বেশি।

বিষয়টা যদি সত্যই হয়, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এই বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থার জন্য দায় কার? শিক্ষকদের? অভিভাবকদের? নাকি প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের? দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, স্কুলবিমুখতার হার কমে গেছে অনেক। অনেক শিশুরা এখন সাগ্রহে স্কুলমুখী হচ্ছে। স্কুলে ভর্তির এই হার অভিভাবকদের সচেতনাকে আরো একধাপ স্পষ্ট করেছে। অভিভাবকরা সচেতন না হলে গাঁও-গেরামের শিশুরা সাধারণত স্কুলমুখী হয় না। আর যা-ই হোক ৯৮ শতাংশ শিশু শিক্ষার্থীকে স্কুলমুখী করা একধরনের বড় সাফল্য।

বাচ্চারা বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকদের নির্দেশনা মতো পাঠাভ্যাস করার পর বাড়িতে গিয়ে তা সকাল-সন্ধ্যা চর্চা করবে, পরদিন আবার ক্লাস চলাকালে আগের দেয়া পাঠ শিক্ষকদের পড়ে শোনাবে। এভাবে শিশুরা হাতে-কলমে লিখে-পড়ে অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠবে। তার পর প্রথম শ্রেণী, দ্বিতীয় শ্রেণী করতে করতে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্কে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। অতীতে কখনো কি শোনা গেছে শিশুরা পড়াশোনা না পেরে ২০-৩০ শতাংশ ঝরে পড়ে অশিক্ষিত ফিরে গেছে। বরং মা-হারা, বাবা-হারা, অভিভাবকহীন দরিদ্র বাচ্চারা শিশু শ্রমে চলে গেছে পেটের দায়ে, পড়াশোনা ছেড়ে। প্রাথমিক শিক্ষায় সংকট এসব ক্ষেত্রে হতে পারে। কয়েক দশক আগে যখন নানা সীমাবদ্ধতা ছিল, মানুষের মাথাপিছু আয় কম ছিল, দরিদ্রতা ছিল ঘরে ঘরে, শিক্ষা খাতে এত ব্যয়-বরাদ্দ ছিল না, তখনও প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে এমন ঘোরতর নেতিকবাচক প্রশ্ন ওঠেনি।

এখন সরকার শিক্ষা নিয়ে নতুন নতুন পরিকল্পনা করছে, শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে ‘মিড মে মিল’র প্রচলন করতে যাচ্ছে, সে সঙ্গে প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়াতে স্কুলগুলোয় ল্যাপটপসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্কুল সরকারিকরণ করা হয়েছে, বছর বছর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের একটি জরিপ হতবাক করেছে মানুষকে। শিক্ষার মান বৃদ্ধির বিষয়ে শিক্ষকদের আরো মনোযোগী হওয়া দরকার। অনেক শিক্ষক পাঠদানে যথেষ্ট অনিময় করেন। যাদের অনেকের উপস্থিতির হার কম হলেও ম্যানেজ করে চলার সংস্কৃতি এখন বর্তমান। এই ধররে প্রবণতা কিছুটা হলে শিক্ষাদানে প্রভাব পড়ে। প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রবর্তন করা হলেও এখন পর্যন্ত তার অগ্রগতি নেই। এজন্য ব্যয়বরাদ্দের অভাবকে প্রধান কারণ মনে করা হচ্ছে। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে জিডিপির হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সবচেয়ে কম। এই খাতে বিনিয়োগ না করলে, শিক্ষকদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করা যাবে না, শিক্ষার মান নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়ে বড় পরিসরে উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া দরকার। এজন্য সবার আগে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। স্কুলগুলোর শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবাইকে প্রাথমিক শিক্ষার মান তদারকি করতে হবে। তাহলেই বাড়তে পারে প্রাথমিক শিক্ষার মান।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ