সোমবার , ২১ অক্টোবর ২০১৯ |

একদিনে ঘুরে আসুন ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লায়

মো: ইয়ামিন   বুধবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শীতকাল ভ্রমণের মৌসুম। সামনেই শীতের মৌসুম আসছে । এ সময় ভ্রমণপিয়াসী লোকজন নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। অনেকেই আছেন যাঁরা সময়স্বল্পতার কারণে ঘুরতে যেতে পারেন না। সে কারণেই দিনে গিয়ে সব দেখে আবার ওই দিনই ফিরে আসা যাবে এমন জায়গা পছন্দ অনেকের।

ঢাকা থেকে একদিনে ঘোরার জন্য অনেক জায়গাই আছে। তবে আমি এমন এক জায়গার নাম বলব, যেখানে আপনি একদিনেই অনেক কিছু দেখতে পারবেন, পাবেন ঐতিহ্য ও প্রকৃতির ছোঁয়া। সেই স্থানটি কুমিল্লা। প্রাচীনকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসেছেন সৌন্দর্যের টানে কুমিল্লায়। এখানে প্রতিবছরই শীতে প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয়। তাই কাজের ফাঁকে একটুখানি রিল্যাক্স হতে এমন জায়গা সত্যিই অতুলনীয়।

কী কী দেখবেন

কুমিল্লায় প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই আছে দেখার মতো। একেকটার সৌন্দর্য একেক রকম। যার কোনোটা দেখে আপনি বিস্মিত হবেন, কোনোটা দেখে পুলকিত হবেন আপনি।

কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী বাদুরতলার ‘ধর্মসাগর’



কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় থেকে মাত্র ৫০০ মিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। একসময় এই এলাকায় ব্যাপক পানি সংকট দেখা দেয়। তখন জনস্বার্থে ত্রিপুরা রাজ্যের অধিপতি মহারাজ ধর্মমানিক্য ১৪৫৮ সালে এটি খনন করেন। তাঁর নামানুসারেই এটির নাম রাখা হয় ধর্মসাগর। এখানকার পানি অনেক স্বচ্ছ। গোসল করতে পারেন। চাইলে ধর্মসাগরে বোট রাইডও করতে পারেন। ধর্মসাগর দেখা শেষ করেই উত্তর পাশে সবুজ অরণ্য পার্কে চলে যেতে পারেন।

ওয়ার সিমেট্রি


ওয়ার সিমেট্রি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত কমনওয়েলথ যোদ্ধাদের সমাধিস্থল। ১৯৪৫ সালে তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হেলিকপ্টারযোগে কুমিল্লায় নিয়ে আসা হয়। এখানে ৭৩৭ জন যোদ্ধার কবর রয়েছে। সুনসান নীরবতা আর অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ওয়ার সিমেট্রি কুমিল্লা ক্যান্টনম্যান্ট থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার উত্তরে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। এটি সকাল ৭টা থেকে ১১টা ৪৫ মিনিট ও দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

শালবন বিহার


এটি বৌদ্ধ যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ধারণা করা হয় যে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেব বংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিহারটির ধ্বংসাবশেষ থেকে আটটি তাম্রলিপি, প্রায় ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে। এটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে কোটবাড়িতে অবস্থিত। এখানে প্রবেশ করতে জনপ্রতি ২০ টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হবে।

শালবন


শালবন বিহারের পশ্চিম পাশেই শালবন অবস্থিত। মূলত শালবন থেকেই বিহারটির নামকরণ করা হয়েছিল শালবন বিহার। বেশি গাছপালা না থাকলেও ওপরের দিকে গাছের শাখাগুলো মিলে তৈরি করেছে বিশাল এক ছাতা। ছায়াঘেরা এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে বসে এক চা খেতে খেতে আপনি অন্য ভুবনে চলে যাবেন।

ময়নামতি জাদুঘর

শ্রীভবদের মহাবিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া, রূপবানমুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, রানীর বাংলা, ও ভোজ রাজার বাড়ি বিহার খননকালে অনেক মুল্যবান পুরাসামগ্রী খুঁজে পাওয়া যায়। এসব পুরাবস্তু সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য ১৯৬৫ সালে কুমিল্লা কোটবাড়ির শালবন বিহারের দক্ষিণ পাশে শালবনকে সামনে রেখে পশ্চিমমুখী একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়।

জাদুঘরের মূলভবনে গুরুত্বপূর্ণ পুরাবস্তু প্রদর্শনের জন্য স্থান সংকুলান না হওয়ায় ১৯৭০-৭১ সালে এর দক্ষিণ পাশ বর্ধিত করায় ভবনটি ইংরেজী ‘টি’র আকার ধারণ করে। পুরো জাদুঘর ভবনে মোট ৪২টি আধার রয়েছে। যাতে পুরাবস্তু সমূহ প্রদর্শিত হচ্ছে। জাদুঘরের প্রবেশ পথের বাম দিকে থেকে ১নং প্রদর্শনী আধার দিয়ে প্রদর্শনী আরম্ভ করে ক্রমানুসারে চারদিক ঘুরে ঘুরে প্রবেশ দ্বারের ডান দিকে ৪২নং আধারে প্রদর্শনী শেষ হয়েছে।

প্রদর্শনী আধারগুলোতে প্রত্মতাত্ত্বিক স্থান খননের উম্মোচিত স্থাপত্যসমৃদ্ধ ধ্বংসাবশেষের ভূমি-নকশা, ধাতু লিপি ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, মৃন্ময় মুদ্রক-মুদ্রিকা, পোড়া মাটির ফলক, ব্রোঞ্জ মূর্তি, পাথরের মূর্তি, লোহার পেরেক, পাথরের গুটিকা, অলংকারের অংশ এবং ঘরে ব্যবহৃত মাটির হাড়ি পাতিল প্রদর্শিত হচ্ছে।

এছাড়া আধারের ফাঁকে ফাঁকে মেঝের উপর জাদুঘর ভবনের বিভিন্নস্থানে কিছু পাথর এবং ব্রোঞ্জ মূর্তিও প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। এসব মূর্তির কয়েকটি প্রাচীন সমতটের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত। জাদুঘরে প্রদর্শনের উল্লেখযোগ্য পাথর ও ব্রোঞ্জমূর্তি হচ্ছে- বিভিন্ন ধরনের পাথরের দন্ডায়মান লোকোত্তর বুদ্ধ মূর্তি, ত্রি বিক্রম বিষ্ণুমূর্তি, তারা মূর্তি, মারীছী মূর্তি, মঞ্জুরের মূর্তি, পার্বতী মূর্তি, হরগৌরীমূর্তি, নন্দী মূর্তি, মহিষমর্দিনী মূর্তি, মনসা মূর্তি, গনেশ মূর্তি, সূর্যমূর্তি, হেরুক মূর্তি এবং ব্রোঞ্জের বজ্রসত্ত্ব মূর্তি।

এছাড়াও ব্রোঞ্জের ছোট-বড় আরও মূর্তি রয়েছে। এ জাদুঘরে রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরী বিশালাকায় একটি ঘন্টা। যার ওজন ৫শ’ কেজি। এর ব্যাস ০ দশমিক ৮৪ মিটার এর উপরের বেড়িসহ উচ্চতা ০ দশমিক ৭৪ মিটার। এ জাদুঘরের আধারে সুরক্ষিত রয়েছে ময়নামতিতে পাওয়া স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা। পোড়ামাটির ফলক। ব্রোঞ্জ ও তামার তৈরী সামগ্রী। লোহার তৈরী সামগ্রী। মাটির তৈরী বিভিন্ন প্রকারের খেলনা। কাঠের কাজের নিদর্শন। তুলট কাগজে লেখা প্রাচীন হস্তলিপির পান্ডুলিপি। বিভিন্ন নমুনার মৃৎপাত্র ইত্যাদি। এখানেও প্রবেশ করতে জনপ্রতি ২০ টাকা গুনতে হবে।

ইটাখোলা-রুপবান মুড়া


নাম মুড়া হলেও এটি আদতে কোনো মুড়া নয়। শালবন বিহারের মতোই একটি বৌদ্ধ বিহার। ধ্বংসাবশেষ খননের ফলে এখানে একটি ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায়। ইটাখোলা মুড়ার চূড়ায় উঠে আপনি পুরো কুমিল্লা শহরকে দেখতে পাবেন। এ ছাড়া দূরে ত্রিপুরার পাহাড়ও দেখতে পারবেন। এটি কোটবাড়ি বাজার থেকে সামান্য পশ্চিমে অবস্থিত এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)


কোটবাড়ি বাজারের দক্ষিণ  পাশে অবস্থিত। ১৯৫৯ সালে অধ্যক্ষ আখতার হামিদ খান এটির প্রতিষ্ঠা করেন। বার্ডের গেটটি দেখতে বেশ চমৎকার। এর ভেতরে বিশাল এক লাইব্রেরি আছে। বার্ডে ঢুকতে স্পেশাল পারমিশনের প্রয়োজন হবে। এ প্রতিষ্ঠানটি পল্লী উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা পল্লীর দারিদ্র্য বিমোচনে নিরলস সহায়তা করে যাচ্ছে। 

ব্লু ওয়াটার পার্ক


এটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত। পাহাড়ের পাদদেশে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে এই বিনোদন কেন্দ্রটি। ভেতরে ঢুকে দেখতে পারবেন কৃত্রিম ঝরনা। পাবেন পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া ওয়াটার রাইডেও চড়তে পারবেন। এখানে প্রবেশ করতে জনপ্রতি ৫০ টাকা লাগবে।

লালমাই পাহাড়

এটি কুমিল্লা বিশ্বরোড থেকে বেশ খানিকটা দক্ষিণে লালমাই বাজারের সঙ্গে অবস্থিত। এই পাহাড়টি পুরোটাই লাল মাটির। ওপরে প্রায় সমতল। পাহাড়ের ওপর থেকে চারদিকের পরিবেশটা অসম্ভব সুন্দর লাগে দেখতে। তবে এখানে ঘোরার সময় পাহাড়ের বেশি গভীরে যাবেন না। ছিনতাইয়ের শিকার হতে পারেন।


কীভাবে যাবেন

প্রতিদিন সায়েদাবাদ থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে অনেক বাস ছেড়ে যায়। আপনি যদি কুমিল্লা শহরে নামতে চান তাহলে উঠতে হবে এশিয়া লাইনে। বিশ্বরোড নামতে চাইলে এশিয়া ট্রান্সপোর্টে চড়ে বসবেন। আর যদি ক্যান্টনমেন্ট নামেন তাহলে এশিয়া লাইন বা এশিয়া ট্রান্সপোর্ট যে কোনো একটা দিয়েই আসতে পারেন। দুটি একই মালিকের বাস। সায়েদাবাদ রেলগেটের সামনে থেকে ২০ মিনিট পরপর বাস ছাড়ে। ভাড়া নেবে ২০০ টাকা। আর এসি বাসে আসতে চাইলে এশিয়ার এয়ারকন্ডিশন দিয়ে আসতে পারেন। এখন শীতকালে ২০০ টাকা নিচ্ছে ভাড়া কিন্তু গরমকালে ভাড়া ২৫০ টাকা। অথবা কমলাপুর থেকে রয়েল কোচে আসতে পারেন। ভাড়া নেবে ২৫০ টাকা। আর যাঁরা চট্টগ্রাম থেকে আসবেন, তাঁদের তিশা বা সৌদিয়ায় করে আসতে হবে। তিশায় ভাড়া নেবে ২৫০, সৌদিয়ায় ২৪০ টাকা। ফেরার সময়েও ওপরের যে কোনো স্থান থেকেই ঢাকার বাস পাবেন। আর কুমিল্লায় এসে পর্যটন স্পটগুলোতে যেতে সিএনজি, অটো, মাইক্রোবাস পাবেন।

কোথায় খাবেন

কোথায় খাবেন সেটা নির্ভর করছে আপনি লাঞ্চ টাইমে কোথায় অবস্থান করছেন তার ওপর। যদি কোটবাড়িতে থাকেন, তাহলে কোটবাড়ি বাজারে এসে ঝাল বাংলা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে পারেন। কুমিল্লা শহরে থাকলে বাংলা রেস্টুরেন্ট, ইউরো কিং রেস্টুরেন্টসহ বেশ কিছু বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট পাবেন। আপনার পছন্দমতো যে কোনো একটায় খেতে পারেন। আর যদি পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে থাকেন, তাহলে লাঞ্চ করতে হবে হোটেল নূরজাহানে। এটি দেশের প্রথম থ্রি স্টার হোটেল।

খরচ হবে কত

এত জায়গার নাম দেখে আপনি হয়তো বিশাল বাজেট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। না অত খরচ করতে হবে না। স্পট বেশি হলেও সবগুলো প্রায় পাশাপাশি অবস্থিত। এটাই কুমিল্লার সুবিধা। কম সময় ও কম খরচে অনেক কিছু দেখা যায়। যাতায়াত ও খাওয়া মিলিয়ে ৮০০-১০০০ টাকা হলেই কুমিল্লায় ঘোরা যাবে।

নিরাপত্তাব্যবস্থা

কুমিল্লার ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেক ভালো। আজ পর্যন্ত এখানে অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। প্রতিদিনই হাজার হাজার পর্যটক আসছেন এখানে। তাই কুমিল্লা এসে নিরাপত্তা নিয়ে অতটা চিন্তা না করলেও হবে।

আর হ্যাঁ, কুমিল্লা এসে প্রিয়জনদের জন্য ঐতিহ্যবাহী রসমালাই ও খাদি কাপড় নিতে ভুলবেন না। আসল খাদি পাবেন কান্দিরপাড়ের রামঘাটে। আর রসমালাই পাবেন মনোহরপুরে। রাস্তার পাশে শত শত মাতৃভাণ্ডার দেখবেন। এদের কেউ আসল নয়।

মো: ইয়ামিন
সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার
দি এশিয়ান এজ

 ফিচার থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ