মঙ্গলবার , ১৫ অক্টোবর ২০১৯ |

পূজার মনোবৃত্তি

  শুক্রবার , ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অঞ্জন কুমার দাস

মা ডাকছে, ঘুম থেকে উঠার জন্য চোখদুটি মেলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। সকাল হলে যেন দু'চোখে রাজ্যের ঘুম চলে আসে। মার ঘুম ভাঙ্গার ডাক যেন ঘুম ভাঙ্গতেই চায় না। মা বারবার বলছে, বাবা উঠ, হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বস অথবা বলছে তোর বাবা আসছে তাড়াতাড়ি উঠ, ঘুম থেকে উঠার পর মা হয়তো বা বলবে, তোর কাকার বাড়ি থেকে পূজার জন্য ফুল নিয়ে আয়। এ টা কর, সে কাজটা কর। এসব কাজ আর পড়ার ভয়ে আরও ঘুম থেকে উঠতে মন চায় না।  সব সময় ঘুম থেকে উঠতে মন চায় না। আজব ব্যাপার হল, সব সময় ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলেও আশ্বীন মাসটা যেন একটু অন্য রকম। চারপাশে মনে হয় এক অন্যরকম পরিবেশ বিরাজ করে। মন যেন এক অদ্ভুত শব্দ আনন্দে আন্দলিত থাকে। এ মাসে মার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে ঠিক এমনটা না। প্রকৃতি থেকে যেন কিছু একটা বুঝা যায়। গাছ-পালার শব্দ, পশু-পাখির কোলাহল থেকেও বুঝা যায়। আশ্বীন মাস যেন একটা বিশেষ ইঙ্গিত নিয়ে আসছে। কেন এমন হয়?

যা দেবি শক্তি রুপেন সংস্থিতা
নমস্তস্যই নমস্তস্যই নমো: নমহা।

দেবী-দূর্গা আসছে, এটায় কি তাহলে সেই আগমন বার্তা ? দেবী-দূর্গা আসবে, আর রোগ, শোক জীর্নতা ঝেরে ফেলে, শস্য ভান্ডারে ভরপুর করে দিবে। স¤প্রদায়ীকতা ভুলে সবাই একটা লাইনে এসে দাড়াবে এটায় মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। একারনের মার আগমন বার্তায় মন আনন্দে ভরে উঠে। সবার ভিতরে এক আনন্দের স্পন্দন নাড়া দেয়। শক্তিময়ী, করুনাময়ী মায়ের চরণে ভক্তিভরে প্রনাম জানাই।

এদিকে মা তার গৃহাস্থলী কাজে ব্যস্ত, বাবাও চলে যাবে উনার কাজে। আর আমি বসে বসে চিন্তা করছি, কিভাবে পূজা উপভোগ করব, পূজায় নতুন পোশাক কি নিব, এলাকায় কয়টা পূজা হবে বা কার বাড়িতে কি ডেকোরেশন করা হবে ইত্যাদি। এভাবে চিন্তা করতে করতে কতদিন পার করে দিতাম তা নিজেও বলতে পারবো না।

পূজার প্রত্যেকটা দিন কিভাবে কাটাবো তা মনের কোনে আগেই নকশা করে রাখতাম। পূজার আগের কয়েকটা দিন বাবার কাছে হাজারটা বায়না রাখতাম। কিছু পেতাম, কিছু হয়তোবা স্বপ্নেই হারিয়ে ফেলতাম। বাবা বিভিন্ন উপায়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তখন তো আর বুঝতাম না কি জন্য বাবা এমন করে। মধ্যনিম্ন বৃত্ত পরিবারের যা হয় আর কি? পাওয়া না পাওয়ার বেদনার মধ্যদিয়ে কখন যে পূজার দিনগুলো চলে আসে তা নিজেও বলতে পারি না। আমার মত আমাদের গ্রামটাও মধ্য-নিম্নবৃত্ত হওয়ার কারনে আমাদের গ্রামে কোন পূজা হয় না। পূজার আনন্দ খুব কাছ থেকে নিব বলে মাকে নিয়ে মামার বাড়িতে চলে আসি। মামার বাড়ির পাশেই একটা পূজা হয়। মামার বাড়ি বলতে মামার বাড়ি না মন পড়ে থাকত মায়ের মন্দিরে। কখন মামার বাড়িতে যাব আর কখন মায়ের মন্দিরে যাব। মামার বাড়িতে পৌছে মন্দিরে চলে আসলাম আর পিছন দিক থেকে কে যেন বলছে, ‘‘বাবা এখন যাবি না, পরে যাবি কে শুনে কার কথা”। সারাদিন মন্দিরের সামনে থাকতাম। সবকিছু নিজ চোখে দেখতাম আর পূজার মহিমায় সব বন্ধুদেও নিয়ে মেতে থাকতাম। পূজা মন্ডবে চলছে শেষ মুহুর্তের রং তুলির কাজ। শিল্পী তার আপন মহিমায় প্রতিমার উপর আচড় কাটছে। এক-একটা আচড় যেন কোন অর্থ প্রকাশ করছে। আর অন্যদিকে চলছে, প্যান্ডেল, লাইটিং এবং ডেকোরেশনের সম্বলিত কাজের শেষ মহড়া। রাত শেষ হলেই যেন সব একসাথে নেচে উঠবে এক আপন মহিমায়। আমি মুগ্ধ হয়ে সব দেখছি আর নিজের মনে এক স্বপ্ন আকছি।

যদা যদা হি ধর্মস্য গøানিভর্বতি ভারত
অভ্যুথানম ধমর্স্য তদাত্মনং সৃজাম্যহম।
পরিত্রানাম সাধুনাং বিনাশায় চ দুস্কৃতাম
ধর্মসংস্থাপনায় সম্ভবামি যুগেযুগে।
(গীতা ৪/৭-৭)

যখনই ধর্মের গøানি বা পতন ঘটে যখন অধর্মের অভ্যূথান হয়। তখন আমি নিজেকে সৃষ্টি করি সাধুদের পরিত্রানের জন্য। দুস্কৃতিদের বিনাশের জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগেযুগে অবতীর্ন হয়। যখনই বিপদে পড়িব, তখনই মা আসবে। মা বিপদ থেকে সবাইকে উদ্ধার করিবে এবং ধর্মের পথকে প্রসারিত করবে।

ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পূজার আগমন বার্তা। সুষ্ঠভাবে পূজা পালন করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার সংকল্প করা হয়। সন্ধার সময় বেলতলায় বোধন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পূজার দিন গুলোতে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে গ্রামের বাড়িগুলো থেকে ফুলচুরি করা যেন এক অন্যরকম আনন্দের রূপ নিত। মার পূজার জন্য ফুল আনা এটাকে চুরি বলব কিনা বুঝতে পারছি না। আজ সপ্তমী পূজা, সবার ভিতর এক অন্যরকম ব্যস্ততা পূজার আয়োজন নিয়ে। সবাই নতুন কাপড় পড়ে পূজার মন্ডবে পূজার কাজে ব্যস্ত। একটু  পর পর ঢাক ঢোলের শব্দে মন যেন আনন্দে আত্মহারা। যাই হোক সবার মত আমার ভিতরেও একটা তাড়াছিল কখন নতুন কাপড় পড়ে পূজায় যাবো। একটা কষ্ট হয়তোবা ছিল নতুন কাপড়ের জন্য কিন্তু পূজার ভিড়ে কষ্টটা একসময় হারিয়ে গেল। সপ্তমীর পর মহা অষ্টমী পূজা ও কুমারী পূজা। কুমারী পূজা নিয়ে আরেক আকষর্ণ। নারীকে মার্তরূপে ঈশ্বররূপে ভাবনা। কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে দেবী দূর্গারই পূজা করা হয়। পরদিন মহা সমারোহে নবমী পূজার আয়োজন। সকাল থেকেই নবমী পূজার এবং সন্ধি পূজার ব্যস্ততা। পূজা শেষে মায়ের চরণে অঞ্জলী দেওয়া এবং মাকে প্রণামমন্ত্রে প্রণাম করা-

‘‘ওঁ সর্বমঙ্গল্য শিবে সর্বার্থসাধিকে।
 শরণ্যে ত্র্যম্বক গৌরি নারায়ণি নমোহস্তুতে”
(শ্রী শ্রী চন্ডী ১১/১০/১১)

হে দেবী সর্বমঙ্গলা শিবা সর্বার্থসাধিকা, শরণযোগ্য গৌরি, ত্রিনয়না নারায়ণি- তোমাকে নমস্কার।
পূজা শেষে প্রসাদ নেওয়া, মধ্য রাত পর্যন্ত ভক্ত সমাগম এবং ভক্তদের প্রসাদ দেওয়া তা যেন আনন্দেও আরেক রূপ। নবমীর রাতের সাংস্কৃতিক ও আরতি প্রতিযোগীতা আর প্রতিযোগীতায় পুরস্কার নেওয়া সত্যিই এক অপার আনন্দ। মার সামনে আরতি দেওয়া, মাকে সন্তুষ্টি করা, মার কৃপা পাওয়া এটায়তো কাম্য।

একটা দিন শেষ হচ্ছে, মনের কোনে যেন আনন্দ থেকে যেন বিষন্নতার ছাপ পড়ছে। কেন এমন হচ্ছে? সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঘট বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মার বিদায়ী বার্তা এসে পৌছাতে লাগল। মা কি তাইলে আজ বাবার বাড়ি ছেড়ে ছেলেমেয়েদেও নিয়ে কৈলাস ভবনে যাত্রা করবেন। আজ বিজয়া দশমীতে, মা-বোনদের সিধূঁর খেলা, দেবী কে সিধুঁর পরানো, এক নারী অরেক নারীকে সিধুঁর পরিয়ে দেওয়া এবং দীর্ঘায়ু কামনা করা। আমাদের বই, খাতা নিয়ে মায়ের চরণে দিয়ে প্রণাম করা, দেবী দূর্গার আর্শীবাদ নেওয়া সবই যেন আস্তে আস্তে শেষ হচ্ছে। আর কিছুক্ষন পরেই হবে দেবী দূর্গার বির্সজন। তা যেন ভিতরে এসে এক প্রচন্ডভাবে নাড়া দিতে লাগল। আর আমি ব্যথিত মনে দেবী দূর্গা কে প্রণাম করে উনার ১০৮ টা নাম বলতে থাকলাম।

সতী,  সাধ্বী, ভবপ্রীতা, ভবানী, ভবমোচনী, আর্য্যা, দূর্ঘা, জয়া, আদ্যা, ত্রিনেত্রা, শূলধারিণী, পিনাকধারিণী, চিত্রা, চন্দ্রঘণ্টা, মহাতপা, মনঃ, বুদ্ধি, অহঙ্কারা, চিত্তরূপা, চিতা, চিতি, সর্বমন্ত্রময়ী, নিত্যা, সত্যানন্দস্বরূপিণী, অনন্তা, ভাবিনী, ভাব্যা, ভব্যা, অভব্যা,সদাগতি, শাম্ভবী, দেবমাতা, চিন্তা, রতœপ্রিয়া, সর্ববিদ্যা, দক্ষকন্যা, দক্ষযজ্ঞবিনাশিনী, অপর্ণা, অনেকবর্ণা, পাটলা, পাটলাবতী, পট্টাম্বরপরিধানা, কলমঞ্জীররঞ্জিনী, অমেয়বিক্রমা, ক্রূরা, সুন্দরী, সুরসুন্দরী, বনদূর্গা, মাতঙ্গী, মতঙ্গমুনিপূজিতা, ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী, ঐন্দ্রী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, চামুন্ডা, বারাহী, ল²ী, পুরুষাকৃতি, বিমলা, উৎকর্ষিণী, জ্ঞানা, ক্রিয়া, সত্যা, বুদ্ধিদা, বহুলা, বহুলপ্রেমা, সর্ববাহনবাহনা, নিশুম্ভনিশুম্ভহননী, মহিষাসুরমর্দিনী, মধুকৈটভহন্ত্রী, চন্ডমুন্ডবিনাশিনী, সর্বাসুরবিনাশা, সর্বদানবঘাতিনী, সর্বশাস্ত্রময়ী, সত্যা, সর্বাস্ত্রধারিণী, অনেকশস্ত্রহস্তা, অনেকাস্ত্রধারিণী, কুমারী, কন্যা, কৈশোরী, যুবতী, যতি, অপ্রৌঢা, প্রৌঢা, বৃদ্ধমাতা, বলপ্রদা, মহোদরী, মুক্তকেশী, ঘোররূপা, মহাবলা, অগ্নিজ্বালা, রৌদ্রমুখী, কালরাত্রি, তপস্বিনী, নারায়ণী, ভদ্রকালী, বিষ্ণুমায়া, জলোদরী, শিবদূতী, করালী, অনন্তা, পরমেশ্বরী, কাত্যয়নী, সাবিত্রী, প্রত্যক্ষা এবং ব্রহ্মবাদিনী ।
হঠাৎ মার ডাকে ঘুম ভাঙ্গল। বুঝলাম এতক্ষন স্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু যাই দেখি ভিতওে যেন একটা ক্ষত হয়ে গেল... দেবী রূপে মাতো এভাবেই চলে যাবে আমাদেরকে একা করে।


দি এশয়িান এজ

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ