মঙ্গলবার , ১৫ অক্টোবর ২০১৯ |

মজলুম সুফি রুমির প্রেমতত্ত্ব!

শায়লা সিমি নূর   রবিবার , ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রুমির মতে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা যতই সার্বিক হোক না কেন, এবং যতই মানব কল্যাণের সমার্থক হোক না কেন, এর মধ্যে জ্ঞানশক্তি ছাড়া আর কিছুই নাই। বুদ্ধি সত্য সম্পর্কে চিন্তা করার সম্যক জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় এ দু’ভাবে ভাগ করে দেখা। বুদ্ধির বিচারে যা বিপরীত, প্রেমের মাঝে তা একে অন্যের পরিপূরকরূপে অবস্থান করে।

জালালউদ্দিন রুমি ছিলেন মজলুম সূফী, তিনি আল্লাহর ভালোবাসায় মশগুল ছিলেন। জালাউদ্দিন রুমির মসনবী কাব্যের মূল বিষয় ছিল “ঐশীপ্রেম”।

Dance from here to the other world,

And don’t ever stop

-RUMI

তার এই উক্তি মজলুম অভিব্যক্তির প্রকাশ! আল্লাহর ভালোবাসায় মশগুল হয়ে যাওয়া মজলুম বান্দার, আল্লাহর আলোর সঙ্গে মিশে যাবার যে ইচ্ছে তারই বহিঃপ্রকাশ তার মসনবীর মহাকাব্য।

তিনি বলেন- “প্রেম মনকে মলিনতা ও অপশক্তির প্রভাব হতে মুক্ত করে।” মানুষ আল্লাহ আলো থেকে তৈরি; আল্লাহ পাকের রূহ মানুষদের মধ্যে নির্গমণ করেছে। এই আত্মার আলো বৃহত্তর আলোর সঙ্গে মিশে নির্বাণ লাভের আশায় থাকে! প্রেমিক আত্মা সেই তাগিদ বেশি করে বোধ করে; বিশেষত যার অস্তিত্ব প্রেমের দ্বারা নির্মল ও পবিত্র হয়!

আল্লাহ বলেন- “স্মরণ কর সেই সময়ের কথা, যখন তোমার প্রভু ফেরেশতাদের বললেন, আমি মিশ্রিত পচাকাদার শুকনো মাটি দিয়ে ‘মানুষ’ সৃষ্টি করব। অতঃপর যখন আমি তার অবয়ব পূর্ণভাবে তৈরি করে ফেলব ও তাতে আমি আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদায় পড়ে যাবে” (হিজর ১৫/২৮-২৯) ।

প্রেমের স্পর্শে পর্বত সচল হয়েছে; মাটির দেহ আকাশে উত্তীর্ণ হয়েছে-

উদহারণ স্বরূপ- (মেরাজের ঘটনা বহুবার কোরানশরীফে উল্লিখিত!) নবী কারিম (সাঃ)-এর হৃদয় আল্লাহর প্রেমে পূর্ণ করে তাকে সপ্তম আসমানে আহরণের আমন্ত্রণ ও গমনের এই ঘটনা উল্লেখ করা যায়।

মসনবী শরীফ

মসনবী তার সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এ গ্রন্থ ছয় খন্ডে বিভক্ত। রাত্রিকালীন গভীর আবেগে তিনি মসনবীর শ্লোক আবৃত্তি করতেন এবং হিশামউদ্দিন তা লিখতেন। “সাহিত্য ও শিল্পের দৃষ্টিতে রুমির দিওয়ান উচ্চাঙ্গের কিন্তু, মসনবী আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অপার সমুদ্র; সুফীতত্ত্বের মধ্যমণি” -আদুল মওদুদ

মূলকথা

ইসলামী জগতের প্রাণ, সূফীকূলের শ্রেষ্ঠ সাধক, ফারসি সাহ্যিতের মহাকবি ও সৃজনশীল দার্শনিক জালালুদ্দিন রুমি পারস্যের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত বলখ নগরে ৬০৪ হিজরী (২৯শে মতান্তরে ৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মক্ষণে মসনবীতে প্রেমতত্ত্বের যে বর্ণনা রয়েছে তার উপর আলোকপাতের ছোট প্রয়াস এ লেখাটি!

ডক্টর খলিফা আবুল হাকিম (দার্শনিক) বলেন-

“রুমির মসনবী কাব্যের মধ্যে বর্ণিত প্রেম সকল যৌক্তিকতা, বিশ্লেষণ ও বর্ণনার উর্ধে।” মসনবির মর্ম কথা -প্রেম আর বিরহ- তবে মানবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যের শাশ্বত ঐক্য ও প্রেমই এর মূলকথা!

রুমি বলেন যে- “বাঁশি যেমন বাঁশবন হতে বিযুক্ত হতে কাঁদে, মানবাত্মাও তেমনি আত্মার জগৎ হতে বিচ্যুত হয়ে জোর পরিবেশের মধ্যে থেকে আত্মার জগতে প্রত্যাবর্তনের জন্য কাঁদে!”

মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিশে যাওয়ার ইচ্ছে-

সূফী মতবাদের একটাই কথা মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিশে যাওয়ার ইচ্ছে! অন্য সূফীদের মতো রুমি বিশ্বাস করেন, প্রেমই সৃষ্টির মূলতত্ত্ব। প্রেম আল্লাহর সত্তার নির্যাস, সমগ্র বিশ্ব সৃষ্টির মূল কারন! শেকড়ে ফিরে যাবার সিদ্ধি! এ মতবাদ অনুসারে- “কোনো কাজ সম্পাদনের পূর্বে সে কাজের ভালোমন্দ বিচার করা কিন্তু, প্রেমের ক্ষেত্রে লাভ ক্ষতির হিসাব নাই!”

এ প্রেম পার্থিব প্রেম হতে ভিন্ন। রুমির মতে- “প্রেমই পরম সৌন্দর্য, পরম সৌন্দর্যই প্রেম!” তিনি বলেন আল্লাহ্ পাক পরম সৌন্দর্য ও সর্বশ্রেষ্ঠ পূর্ণ সত্তা। পার্থিব জগতের সকল কিছু এ পরম সৌন্দর্যের আংশিক প্রকাশ মাত্র।

রূপের ভিতর দিয়ে অপুরূপের দিকে যাত্রা-

সূর্যের আলো জীবন রক্ষা করে, এর অভাবে প্রাণ হারাবে জীবকুল! তেমনি ঐশী সৌন্দের্যের অভাবে বিশ্বের সকল কিছু সৌন্দর্যহীন হয়। সুতারং পরমাত্মার প্রেম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বিষয়বস্তুকে সীমিত না করে ইন্দ্রিয়াতীত আধ্যাত্মিক জগতের পরম সৌন্দর্যের নিকট পৌঁছে দেয়। রুমি বলেছেন- “রূপ অপুরূপের দিকে যাত্রার পাথেয়। রূপ সাধনার শেষ কথা নয়; রূপের ভিতর দিয়ে অপরূপের দিকে যাত্রায় জীবন।”

জাগতিক প্রেম ঐশী প্রেমের সোপান-

জীবন ও শিল্পের আসল কাজ ক্রমান্বয়ে বিকাশের পথে এগিয়ে যাওয়া। যে কোনো চৈতন্যের কামনা হলো পূর্ণতাই উত্তীর্ণ হওয়া। সূফীর আত্মা কামনা করে আলো, পরমাত্মার আলো! মানবের সমগ্র সত্তা পূর্ণতার লক্ষ্যে সাদা পোকার মতো আলোর পেছনে ছুটে চলে, তার স্পর্শ পেতে চায়! এ অর্জনের ক্ষেত্রে জৈবিক জাগতিক প্রেম তুচ্ছ নয়, জাগতিক প্রেম ঐশী প্রেমের পাদপীঠ! প্রেমাবেগের ফলে প্রকৃতির সঙ্গে মানবাত্মার এক মহামিলন ঘটে।

উৎসের দিকে ধাবিত হওয়ার মিলনাকাংক্ষা-

যেহেতু প্রেমের সোপান সংখ্যাতীত, অধ্যাত্মের পর্যায়ও তাই। প্রেম ব্যতীত কোনো পর্যায়ে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। এই প্রেম মূলত পরম সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ। পরম সৌন্দর্যের প্রেম যা উৎসের দিকে প্রতিটি জীবন ধাবিত হওয়ার মিলনাকাংক্ষা।

অনস্তিত্ব অবস্থা হতে অস্তিত্ব অবস্থার আবির্ভাব-

বিশ্বের সকল জড়বস্তু প্রাণ আধ্যাত্মিক শক্তি হতে উৎপন্ন। প্রত্যেক বস্তু এক বা একাধিক প্রাণের সমাবেশ এবং প্রত্যেক বস্তু বা অণুপরমাণুর মধ্যে প্রেম আকর্ষণ শক্তি আছে- চুম্বক যেমন লৌহ আকর্ষণ করে। হাদিস কুদসিতে উল্লেখ আছে, আল্লাহপাক বলেন- “আমি ছিলাম গুপ্ত ধনভা ার, নিজেকে প্রকাশের ইচ্ছে করলাম এবং নিজেকে প্রকাশের নিমিত্তে এই বিশ্ব সৃষ্টি করলাম।”

প্রেম ও স্বজ্ঞা তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভের অন্যতম উপায়-

পরম সত্যের বাহিক্য প্রকাশই এই বিশ্ব। সকল বৈচিত্র্য ও বন্ধুত্বের মূল ঐক্য, পরম সত্তাকে উপলব্ধি ইত্যাদি সবই প্রেম দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব। প্রেম দ্বারা পরম সত্তা সার্বিকরূপে হৃদয়ের মাঝে প্রতিভাত হয় এবং আত্মা নিগূঢ় সত্তার জ্ঞান লাভ করে।

বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা সংক্ষিপ্ত প্রেম সংক্ষেপিত নয়-

রুমির মতে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা যতই সার্বিক হোক না কেন, এবং যতই মানব কল্যাণের সমার্থক হোক না কেন, এর মধ্যে জ্ঞানশক্তি ছাড়া আর কিছুই নাই। বুদ্ধি সত্য সম্পর্কে চিন্তা করার সম্যক জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় এ দু’ভাবে ভাগ করে দেখা। বুদ্ধির বিচারে যা বিপরীত, প্রেমের মাঝে তা একে অন্যের পরিপূরকরূপে অবস্থান করে।

রুমির মতে, প্রেমের পথই শুদ্ধ দৃষ্টির পথ। এ পথেই সকলকে অগ্রসর হতে হয়। প্রেমে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার পথ অসীম; রুমির মসনবিতে হযরত মুসার (আঃ) পথ বিস্তৃত হয়ে ইস্রারাঈলদের সামিরিপথ অনুসরণের ঘটনার মধ্যে তা ব্যক্ত করা হয়েছে।

পরমাত্মার প্রতি প্রেমের অর্থ যে বুঝে সে সৃষ্টি তত্ত্ব বুঝতে সক্ষম হয়। এই প্রেম আধ্যাত্মিক জীবনের সকল জটিলতার জাল ভেদ করে আত্মাকে মুক্তির পথ দেখায়। এই প্রেম মানব অন্তর আলোকিত করে সৃষ্টি সম্পর্কে দুর্বোধ্য রহস্যের পর্দা উন্মোচন করে। রুমিকে একজন অতিইন্দ্রিয়বাদী দার্শনিক হিসাবে অনেকেই রূপায়ণ করেছেন! কিন্তু, এ উক্তিতে তাদের বুদ্ধির প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়; কারণ প্রজ্ঞা যত সার্বিক হোক না কেন, আসল সত্য উন্মোচনে অপারগ। প্রজ্ঞা নয় বরং স্বজ্ঞাই তাত্ত্বিক জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য উৎস এবং সে বিচারে সার্বিক অর্থে রুমি একজন মজলুম সূফী, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবাদী দার্শনিক।

সূত্র:

দি মেটাফিজিক্স অফ রুমি, ডাক্তার খলিফা আবুল করিম

পারস্য প্রতিভা, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ

ইবনুল আরাবী ও জালালুদ্দিন রুমি, মোহাম্মদ সোলাইমান আলী সরকার।

মসনবী শরীফ, জালালুদ্দিন রুমি

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ