মঙ্গলবার , ১৫ অক্টোবর ২০১৯ |

বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করতে জানে: শেখ হাসিনা

অনলাইন ডেস্ক   শনিবার , ০৫ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশ কীভাবে ‘উন্নয়নের বিস্ময়’ হয়ে উঠল, সেই গল্প তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চ্যালেঞ্জকে কীভাবে সুযোগে পরিণত করতে হয়, তা বাংলাদেশ জানে।  ‘ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিট’ উপলক্ষে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওয়েবসাইটে শুক্রবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য আসে।

‘বাংলাদেশ ইজ বুমিং- অ্যান্ড হেয়ার ইজ হোয়াই’ শিরোনামে ওই নিবন্ধের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, অনেকেই বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের ও সচ্ছল তিন কোটি মানুষের ‘বাজার’ ও ‘উন্নয়নের বিস্ময়’ হিসেবে দেখলেও তার বিচারে এ দেশের মানুষের মূল শক্তির জায়গাটি হল সামাজিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের চেতনায় তাদের আস্থা।

“সেইসঙ্গে সমৃদ্ধির জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষা, তাদের সহনশীলতা এবং নেতৃত্বের প্রতি তাদের অবিচল আস্থাও আমাদের শক্তি।” তিনি লিখেছেন, “আমার বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সোনার বাংলা, একটি শোষণমুক্ত ও ন্যায়পরায়ণ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সেই স্বপ্ন আমাদের ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে চলার আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছে।”

নিবন্ধে বলা হয়, পোশাক উৎপাদনের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ দ্রুত একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ হয়ে ওঠার পথে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় ১২টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশে নির্মিত চারটি জাহাজ এসেছে ভারতে। ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্স সম্প্রতি বাংলাদেশে তৈরি বিপুল পরিমাণ রেফ্রিজারেটর কিনেছে। বাংলাদেশের আছে ছয় লাখ আইটি ফ্রিল্যান্সার, এটাই এখন সবচেয়ে বড় ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটি।

“এই সব কিছু এক নীরব বিপ্লবের কথা বলে, যেখানে মানুষ উদ্ভাবনী চেতনা আর প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে ঝুঁকি নিচ্ছে, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। আর বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে ভারতীয় উদ্যোক্তাদের প্রথাগত খাতগুলোর বাইরে এসে বাংলাদেশের শিক্ষা, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোটিভ শিল্প ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মত খাতে বিনিয়োগ করার এটাই সময়।”

বাংলাদেশে নগরায়ণের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ এ দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ বসবাস করবে শহর অঞ্চলে। আর এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ হবে বয়সে তরুণ, কর্মোদ্যমে ভরপুর, ডিজিটাল যোগাযোগে দক্ষ।  “তারা হবে চটপটে, নতুন ধারণা গ্রহণ করতে সক্ষম, সম্পদ অর্জনের নতুন পথ তারা খুঁজে বের করবে। আসলে ১১ কোটির বেশি সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বাংলাদেশে এরইমধ্যে এটা ঘটতে শুরু করেছে।”

তিনি লিখেছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা হবে মোট জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার ফলে দ্রুত নগরায়ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির তিন কোটি নাগরিক বাস্তবিক অর্থেই একটি বিশাল বাজার। “কেউ কেউ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে ঝুঁকির কথা ভাবেন। হ্যাঁ, অন্য অনেক দেশের মত আমাদেরও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু আমরা জানি, চ্যালেঞ্জকে কীভাবে সুযোগে পরিণত করতে হয়।”

বাংলাদেশ যে এ বছর রেকর্ড ৮ দশমিক ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, সে কথা উল্লেখ করে নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, “আমরা দুই অংকের প্রবৃদ্ধির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বেড়েছে ১৮৮ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।”

শেখ হাসিনা লিখেছেন, কৃষিতে বাংলাদেশ এখন আর কেবল নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য উৎপাদন করছে না। স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদক, দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদক, আম উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে পঞ্চম এবং মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধান শস্য ও ফলের জিন বিন্যাসও বাংলাদেশ উন্মোচন করে চলেছে।

২০০৯ সালে বাংলাদেশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ রূপান্তরের কাজ শুরু করার পর সরকার ইতোমধ্যে তৃণমূল পর্যন্ত শতভাগ মানুষের তথ্যপ্রযুক্তি সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে জানিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, “সাধারণ মানুষের উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য আমরা কাজ করছি। আর সে কারণেই বাংলাদেশ এখন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পঞ্চম বৃহত্তম ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর দেশ। কাগুজে মুদ্রাবিহীন একটি দেশ হওয়ার জন্য দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। গত বছর আমাদের ই-কমার্স লেনদেনের পরিমাণ ২৬ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, বিদেশি বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা, অর্থনৈতিক প্রণোদনার সুবিধা, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড়, লভ্যাংশ ও পুঁজি সহজে স্থানান্তরের সুযোগ বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশই এখন ‘সবচেয়ে উদার’।

বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশে যে ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, এর মধ্যে ১২টি অঞ্চলে ইতোমধ্য কাজ শুরু হয়েছে, দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেবল ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য এরইমধ্যে বেশ কয়েকটি হাই টেক পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে- সেসব তথ্যও প্রধানমন্ত্রী তার নিবন্ধে তুলে ধরেছেন।

তিনি লিখেছেন, ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝামাঝি এলাকায় ভৌগলিক অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। “আমরা এ অঞ্চলে একটি অর্থনৈতিক হাব হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারি। নিজেদের ১৬ কোটি ২০ লাখ মানুষের বাইরেও এ অঞ্চলের প্রায় তিনশো কোটি মানুষের বাণিজ্য যোগাযোগের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ।”

গত বছর এইচএসবিসির এক পূর্বাভাসে বলা হয়, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। সে বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, “এখানে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি- আমাদের মুক্ত সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রীতি, উদার মূল্যবোধ এবং ধর্ম নিরপেক্ষ সাংস্কৃতি। আর অন্যটি হল- আমাদের মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশই তরুণ। তাদের অধিকাংশের বয়স ২৫ বছরের কম। তাদের দ্রুত দক্ষ করে তোলা, প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করা এবং প্রতিযোগিতামূলক শ্রমমূল্যে কাজে লাগানো সম্ভব।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আত্মবিশ্বাসী জনগোষ্ঠী এবং সক্ষম নেতৃত্ব ও শাসনযন্ত্র’ সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের পথে এই অভিযাত্রায় বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত শিখছে। “আমরা আপনাদের সামনে একটি স্থিতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্র উপস্থাপন করছি, যার নেতৃত্ব দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল, সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত, মুক্ত ও বাস্তবভিত্তিক বাজার বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম এবং যে রাষ্ট্র একটি শান্তিকামী ও প্রগতিশীল দেশের উদাহরণ। - বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

 জাতীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ