সোমবার , ০৯ অক্টোবর ২০১৭

রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না

  সোমবার , ০৯ অক্টোবর ২০১৭

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। কয়েক দিন ধরে আরো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তবে এরা মিয়ানমারের মংডু প্রদেশের নাগরিক। ইতোমধ্যে মিয়ানমার সরকার রাখাইন প্রদেশ রোহিঙ্গা শূন্য করেছে। এবার তারা হাত দিয়েছে বাইরের প্রদেশগুলোয়। ঠিক কতসংখ্যক মুসলিম রোহিঙ্গা এসব এলাকায় রয়েছে, আরো কতসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে তা কেউ বলতে পারছেন না। তবে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় জনশ্রুতি আছে, মিয়ানমারে ২০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের সবাই যদি বাংলাদেশে প্রবেশ করে তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা কী হবে এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘মিয়ানমারে নির্যাতন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা থাকবে।’

মিয়ানমারের দুটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) বিপুল সদস্যরাও বাংলাদেশে কিনা-এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ তাদের বিরুদ্ধে একসময় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরালো অবস্থান ছিল। অভিযোগ উঠেছে, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বড় অংশ ইয়াবা চালানের সঙ্গে জড়িত। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনেক রোহিঙ্গা ইয়াবাসহ ধরা পড়েছে। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে মিয়ানমারের যেসব রোহিঙ্গা জড়িত তারাও এখন বাংলাদেশে। বাংলাদেশে বসে যদি তারা ইয়াবা ব্যবসা চালায় তাহলে দেশের তরুণসমাজের মধ্যে মাদকের আগ্রাসন বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন অনেকে।

এদিকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নিয়ে শঙ্কিত কক্সবাজারের অধিবাসী। উখিয়া টেকনাফ থেকে শুরু করে কক্সবাজারের বিশাল এলাকায় তারা ছড়িয়ে পড়েছে। সীমান্তের প্রায় অরক্ষিত ৫০ কিলোমিটার এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে গাছপালা কেটে বাস শুরু করেছে। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে পর্যটন এলাকা কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারে কয়েকটি তল্লাশিচৌকিতে একযোগে হামলা চালায় রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠন। মূলত এরপর থেকে রাখাইনে কথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। দমন-নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গারা। পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে মিয়ানমারে সহিংসতা না থাকলেও থেমে নেই রোহিঙ্গা ঢল। আরো বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ঢল নামার আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। এতে বাংলাদেশের টেকনাফ-উখিয়ায় শুরু হয়েছে বড় সংকট।

সীমান্তের ৩৩টির বেশি পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করছেন রোহিঙ্গারা : রোহিঙ্গা পারাপারে নিয়োজিত মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের পেরাংপুরু, নারীবিল, সিকদারপাড়া, মংনিপাড়া, দংখালী, ফাতংজা, মাংগালা, ফইন্যাপাড়া, সাইরাপাড়া ও নাইক্ষ্যংদিয়া-এই ১০টি এলাকায় নৌকা নিয়ে যান বাংলাদেশি জেলেরা। সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের তুলে টেকনাফে নাফ নদীর ৫টি এবং বঙ্গোপসাগরের আটটি পয়েন্টে নৌকা ভেড়ান তারা। নাফ নদীর ৫টি পয়েন্ট হচ্ছে নাইট্যংপাড়া, নয়াপাড়া, শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া, হারিয়াখালী ও ঘোলারচর। বঙ্গোপসাগরের ৫টি পয়েন্ট হচ্ছে টেকনাফের পশ্চিমপাড়া, কাটাবনিয়া, মুন্ডার ডেইল, লেঙ্গুরবিল, জাহাজপুরা, মাথাভাঙ্গা, শীলখালী ও শামলাপুর ঘাট।

এ ছাড়া উখিয়া উপজেলার বালুখালী, রহমতেরবিল, আনজুমানপাড়া, ধামনখালী, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ধুমধুম, তুমব্রু, বাইশারীসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে আরো রোহিঙ্গা। মাঝিরা বলছেন, মংডুর নাইক্ষ্যংদিয়া থেকে টেকনাফে আসার জন্য নাফ নদীতে চার কিলোমিটার এবং বঙ্গোপসাগরে আট কিলোমিটারসহ ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ভাটার সময় এই পথ অতিক্রম করতে সময় লাগে ৬ ঘণ্টা, জোয়ারের সময় সাড়ে ৫ ঘণ্টা। নাইক্ষ্যংদিয়া ছাড়া মংডুর অন্য এলাকা থেকে আসা নৌকাগুলো শুধু নাফ নদী পাড়ি দিয়েই টেকনাফে পৌঁছাতে পারে। দূরত্ব এলাকাভেদে (মংডুর) দুই থেকে তিন কিলোমিটার। সময় লাগে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা। অন্যদিকে কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে হাজারো রোহিঙ্গার ঢল নামে। নৌকা নিয়ে তারা শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া, বাজারপাড়া, ঘোলাপাড়া, দক্ষিণপাড়া ও পশ্চিমপাড়া উপকূল দিয়ে উঠছে। তারপর হেঁটে কিংবা রিকশা ও ইজিবাইকে চড়ে আসছে টেকনাফ শহরে। সেখান থেকে যাচ্ছে উখিয়া ও টেকনাফের একাধিক রোহিঙ্গা শিবিরে। রাখাইন রাজ্যের মংগদু জেলার ঢেকিবুনিয়া, চাকমাকাটা, ফরিকরাবাজার, তুমব্রু, কুমিরখালী, বলীবাজার, টংবাজার, সাহাববাজারসহ রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত অন্তত ২৫টি গ্রাম এখন মানুষশূন্য।

ডায়রিয়া ও কলেরা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে : কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় ডায়রিয়া ও কলেরা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে পাঁচ লাখ ১৫ হাজার নতুন রোহিঙ্গা এসেছে। নতুনদের মধ্যে ৬০ শতাংশ শিশু। তাদের ৩০ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। গত সপ্তাহ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে পাঁচ হাজার ১১ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আছে প্রশাসনের কাছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভালো স্যানিটেশন, নিষ্কাশন ইত্যাদির অবকাঠামো নেই। বৃষ্টির পানি ল্যাট্রিনসহ ক্যাম্প ধুয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে ক্যাম্পগুলোয় জনঘনত্ব খুব বেশি। এসব কারণ রোগের প্রকোপ দেখা দেওয়ার ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে। ক্যাম্পের মানুষজন সম্পূর্ণরূপে শক্তিহীন এবং শিশুরা রোগবালাইয়ের ঝুঁকিতে। সেখানে পানিবাহিত তীব্র ডায়রিয়া ও কলেরার ব্যাপক ঝুঁকি আছে।

জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের কলেরার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৭ অক্টোবর মুখে খাওয়ার নয় লাখ ডোজ কলেরার টিকা বাংলাদেশে পৌঁছে। ১০ অক্টোবর থেকে শিশুদের টিকা খাওয়ানো হবে। ইউনিসেফের দুই হাজার ৬২৫টি টিউবওয়েল, ১৫ হাজার ৭৫০টি ল্যাট্রিন স্থাপনের পরিকল্পনা আছে।

রোহিঙ্গাদের হাতে ‘অনিবন্ধিত’ সিম, নিরাপত্তা ঝুঁকি : টেকনাফ শহরে রমরমা ব্যবসা চলছে মুঠোফোনের দোকানগুলোয়। ধুম পড়েছে মুঠোফোনের সিম বিক্রির। এসব নতুন সিম কার্ড কিনছেন মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পার হয়ে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকেই সঙ্গে করে ফোন সেট নিয়ে এসেছেন। আবার অনেকে এখান থেকেও নতুন ফোন কিনছেন। টেকনাফের মতো উখিয়াতেও সিম কার্ড বিক্রির রমরমা বাণিজ্য চলছে। টেকনাফে সিম বিক্রির ছোট-বড় দোকান আছে প্রায় ১৫০টি। এ ছাড়া পথের ধারে টুল নিয়েও অনেকে সিম বিক্রির কারবারে বসে গেছেন। নিয়ম অনুসারে জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া সেলফোনের সিম কেনা যায় না। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। দোকানগুলোয় এ ধরনের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করাই আছে। চাইলেই যেকোনো কোম্পানির সিম কেনা যাচ্ছে।

আবার অনেক নতুন আসা রোহিঙ্গা তাদের পরিচিত পুরোনো রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে সিম কার্ড কিনছেন। টেকনাফের লেদা, নয়াপাড়া, পুটিবুনিয়া, উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইমখালী পুরুষদের প্রায় সবার কাছে এবং নারীদের অনেকের হাতে মুঠোফোন দেখতে পাওয়া যায়। এসব ফোনে কথাও বলছেন তারা। অথচ বৈধ পদ্ধতিতে নতুন রোহিঙ্গাদের মুঠোফোনের সিম কার্ড কেনার কোনো সুযোগ নেই। টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিক বলেন, রোহিঙ্গাদের অনেকের হাতে মুঠোফোন দেখেছি। অনেককে কথা বলতেও দেখেছি। রোহিঙ্গাদের হাতে অনিবন্ধিত সিম থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

 জাতীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ