সোমবার , ০৯ অক্টোবর ২০১৭

বিপ্লবী চে

  সোমবার , ০৯ অক্টোবর ২০১৭

কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক চে গুয়েভারার আজ ৫০তম মৃত্যুদিবস। বিপ্লবের অগ্নিপুরুষ হিসাবে, গেরিলা নেতা হিসাবে বিশ্বজুড়ে তার নামই ধ্বনিত হয়। ‘চে তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়/আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা/আত্মায় অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপতনের শব্দ/শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস.../বলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা/ তোমার ছিন্নভিন্ন শরীর/তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে/নেমে গেছে/শুকনো রক্তের রেখা...।’ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ এই কবিতায় সশ্রদ্ধ উচ্চারণের মত বিশ্বের লক্ষ, কোটি মানুষে চে’কে স্মরণ করে।

চে গুয়েভারা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে খ্যাতিমান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের অন্যতম। এই মহান বিপ্লবীর মৃত্যুর পর তার শৈল্পিক মুখচিত্রটি একটি সর্বজনীন বিপ্লবের মুখচ্ছবি হিসাবে বিশ্বপ্রতীকে পরিণত হয়। এই মহান বিপ্লবীর জন্ম ১৯২৮ সালের ১৪ জুন। কিউবায় ফিদেল কাস্ট্রোর সঙ্গে সফল বিপ্লবের পর চে বলিভিয়ায় গিয়েছিলেন আরেকটি বিপ্লবের প্রত্যয় নিয়ে। বলিভিয়াতে থাকার সময় তিনি সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর, বলিভিয়ার শহর লা হিগুয়েরাতে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তার মৃত্যদণ্ড কার্যকর করে। মৃত্যুর পর তিনি সমাজতন্ত্র অনুসারীদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হন। চে গুয়েভারার পুরো নাম এর্নেস্তো গেভারা দে লা সেরনা। জন্মসূত্রে চে গুয়েভারা আর্জেন্টিনার নাগরিক। পেশায় ছিলেন একজন ডাক্তার এবং ফিদেল কাস্ট্রোর দলে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অনুকরষীয় এক বিপ্লবীতে পরিণত হন।

চে গুয়েভারা একাধারে ইতিহাসের এক নন্দিত চরিত্র। বিভিন্ন জীবনী, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, তথ্যচিত্র, গান ও চলচ্চিত্রে তার চরিত্রের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তার মৃত্যুর ৫০ বছর পরেও টাইম পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় তাঁর নাম প্রকাশিত হয়। আবার গেরিলা যোদ্ধার পোশাকে ১৯৬০ সালের ৫ মার্চ ‘গেরিলেরো হেরোইকো নামে’ আলবের্তো কোর্দার তোলা চে-র বিখ্যাত ফটোগ্রাফটিকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ফটোগ্রাফ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

খুব শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায় ও দরিদ্রদের প্রতি ছিল তার ছিল গভীর মমত্ববোধ। একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে বেড়ে উঠবার কারণে খুব অল্প বয়সেই রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন চে। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা চের পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বই। যা চেকে করে তোলে সমাজ সচেতন। সে সময় তিনি কার্ল মার্কস, উইলিয়াম ফকনার, এমিলিও সরগারির বইয়ের পাশাপাশি জওহরলাল নেহরু, আলবার্ট ক্যামাস, ভ্লাদিমির লেলিন, রবার্ট ফ্রস্টের বইও পড়েছেন। কোন ধর্মে বিশ্বাসী না হয়ে এভাবেই নিজেকে একজন সমাজ সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।

যুবক বয়সে মেডিসিন বিষয়ে পড়ার সময় চে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। যা তাকে অসহায় মানুষের দুঃখ কষ্ট অনুধাবন করার সুযোগ এনে দেয়। চে বুঝতে পারেন ধনী গরিবের এই ব্যবধান ধ্বংস করে দেবার জন্য বিপ্লব ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তখন থেকেই তিনি মার্কসবাদ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং সচক্ষে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য গুয়াতেমালা ভ্রমন করেন।

এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে-র বৈপ্লবিক আদর্শ চেতনা বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তাঁর সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ট্রোর আলাপ হয়। চে তাঁদের ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন-মদদপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য সমুদ্রপথে কিউবায় প্রবেশ করেন। খুব অল্পদিনেই চে বিপ্লবী সংঘের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড পদে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং বাতিস্তা সরকারকে উত্খাত করার লক্ষ্যে দুই বছর ধরে চলা গেরিলা সংগ্রামের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কিউবার বিপ্লবের পর চে নতুন সরকারে একাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্তদের আপিল পুনর্বিবেচনা ও ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদ্ল প্রদান, শিল্পোদ্যোগ মন্ত্রী হিসেবে খামার সংস্কার আইন প্রবর্তন, কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর ইনস্ট্রাকশনাল ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন, এবং কিউবান সমাজতন্ত্রের প্রচারে বিশ্বপর্যটন করেন। এই পদাধিকারের কল্যাণে তিনি মিলিশিয়াবাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পান। এর ফলে এই বাহিনী পিগ উপসাগর আক্রমণ করে তা পুনর্দখলে সক্ষম হয়। কিউবায় সোভিয়েত পরমাণু ব্যাসিলিস্টিক মিসাইল আনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন নিবন্ধ ও বই রচনা করেন। গেরিলা যুদ্ধের উপর তিনি একটি ম্যানুয়েল রচনা করেন। পরে ১৯৬৫ সালে চে মেক্সিকো ত্যাগ করেন। তার ইচ্ছা ছিল কঙ্গো-কিনশাসা ও বলিভিয়াতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। বলিভিয়াতে থাকার সময় তিনি সি আই এ মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট বলিভিয়ার তত্কালীন সামরিক জান্তা বারিয়েন্তোসের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে চে সহযোদ্ধাদের নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। সামরিক জান্তার সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় চে গুরুতর আহত হয়ে ধরা পড়েন। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর, বলিভিয়ার শহর লা হিগুয়েরাতে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তার মৃত্যদণ্ড কার্যকর করে।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ