বুধবার , ২২ নভেম্বর ২০১৭

বিশ্ব ডাক দিবস

  সোমবার , ০৯ অক্টোবর ২০১৭

একটা সময় আমাদের দেশে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। সে সময় এটাই ছিল জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। আর চিঠিপত্র আদান-প্রদানের জন্য নির্ভর করতে হয় ডাক বিভাগের ওপর। জরুরি প্রয়োজনে অফিস-আদালত, সামাজিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ডাক বিভাগের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগের অতি প্রাচীন এই মাধ্যমটি ক্রমেই হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য। ডাক বাক্স, পোস্ট মাস্টার আর ডাক পিয়নের সেই সোনালি অতীত আর আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নেই, যদিও ডাক বিভাগ আজো তার ঐতিহ্য ও প্রয়োজনীয়তাকে ধারণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে।

৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস। প্রতিবছর ডাক দিবস পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের মধ্যে ডাক আদান-প্রদানকে অধিকতর সহজ ও সমৃদ্ধিশালী করার মধ্য দিয়ে বিশ্বজনীন পারস্পরিক যোগাযোগকে সুসংহত করার লক্ষ্যেই ইউরোপের ২২টি দেশের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে গঠিত হয় ‘জেনারেল পোস্টাল ইউনিয়ন’। পরে ১৯৬৯ সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ডাক ইউনিয়নের ১৬তম অধিবেশনে প্রতি বছরের ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ডাক ইউনিয়ন দিবস নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮৪ সালে জার্মানির হামবুর্গে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ডাক ইউনিয়নের ১৯তম অধিবেশনে বিশ্ব ডাক ইউনিয়ন দিবসের নাম বদলে বিশ্ব ডাক দিবস করা হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ওই সংস্থার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে অক্টোবরের ৯ তারিখ বিশ্ব ডাক দিবস পালন করে আসছে।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যোগাযোগ মাধ্যমের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এনালগ প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই কমছে, বাড়ছে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। কালের বিবর্তনে তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নে আধুনিক পদ্ধতির উদ্ভব হওয়ায় এখন দরকারি যোগাযোগ বা আপনজনের কোনো খবরের জন্য ডাক পিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকতে হয় না। প্রিয়জন পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাক না কেন মোবাইল, ইন্টারনেট, জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপসহ একাধিক উন্নত প্রযুক্তির বদৌলতে যে কোনো ধরনের যোগাযোগ খুবই সহজলভ্য এবং মানুষের হাতের নাগালে।

এক সময় ফ্যাক্সের মাধ্যমে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান করা হলেও বর্তমানে ই-মেইলের বহুবিধ ব্যবহারে ফ্যাক্সের ব্যবহার দিন দিন কমতির দিকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে আর্থিক লেনদেনও আর দুঃসাধ্য নয়। খুবই সহজে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এখন তা হাতের মুঠোয় বলা যায়। আগে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হতো, যা মানি অর্ডার নামে পরিচিত ছিল। ডাক বিভাগের আদলে বর্তমানে খুবই জনপ্রিয় মাধ্যম কুরিয়ার সার্ভিস। এখন এই মাধ্যমে দেশে-বিদেশে চিঠিপত্র, মালামাল পরিবহন সহজলভ্য। ডাক বিভাগেও বর্তমানে অনলাইন আদান-প্রদান ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

অতি পরিচিত ব্যক্তি ‘রানার’ আর নেই, নেই সেই জনপ্রিয়তা। ইন্টারনেট, ই-মেইলসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি মানুষের সামনে দ্রুত যোগাযোগের নতুন দিগন্ত খুলে দিলেও অফিসিয়াল বিভিন্ন ডকুমেন্টস আদান-প্রদান, সরকারি-বেসরকারি চাকরি সংক্রান্ত কাজে আজো ডাক বিভাগের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব রয়েছে। ডাক বিভাগ তার জৌলুস হারালেও আজো গণমানুষের দোরগোড়ায় তার সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। যদিও গ্রামাঞ্চলের ডাকঘরগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক।

ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন ও পাবলিক সেবার কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ সরকার ডাকসেবা সময়োপযোগী করার লক্ষ্য নিয়ে ২০০০ সালে ই-পোস্ট সার্ভিস চালু করেছে, যা সম্ভাবনাময়। কিন্তু সার্ভিসটি দীর্ঘদিন পরও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল সঙ্কট আর প্রচারণার কার্পণ্যের কারণে। বর্তমানে পোস্ট অফিসকে আধুনিকায়ন করতে লেপটপ, ফটোকপি, স্ক্যানার, ক্যামেরা, মডেমসহ ইন্টারনেট সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার সুফল তৃণমূলের জনগণ ভোগ করছে।

সূত্র মতে, সারা দেশে ডাকঘর রয়েছে ৯ হাজার ৮৮৯টি। এর মধ্যে জেনারেল পোস্ট অফিস চারটি, জেলা শহরগুলো মিলিয়ে ৬৬টি। এরপর উপজেলা, গ্রামে রয়েছে ৮২০০টি এক্সট্রা ডিপার্টমেন্টাল ডাকঘর। অনেক জেলা শহরে রয়েছে নাইট পোস্ট অফিস।

ডাক বিভাগের গুরুত্বকে অর্থবহ করতে আরো আধুনিকায়ন দরকার। তার সঙ্গে প্রয়োজন যোগ্য জনবল। ডাকবাক্সে চিঠি না ফেললেও এই ঐতিহ্যবহনকারী বাক্সগুলোকে জরাজীর্ণতা থেকে মুক্তি দিতে সংস্কার প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলের ডাকঘরগুলোর সংস্কারও জরুরি হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় পুরনো এই বিভাগের নিয়ন্ত্রিত ডাকঘরের অস্তিত্ব বিলীনের পথে। কারণ বেশির ভাগ এলাকায় ডাকঘরগুলোর নেই নিজস্ব ভূমি ও ভবন। অনেক জায়গায় ভূমির মালিকানা দখলও নেই। সরকারের প্রতি সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের দাবি, ডাকঘরের বেদখলীয় ভূমি উদ্ধার করে নিজস্ব ভবন নির্মাণ করার। ইউনিয়নের পোস্ট মাস্টারদের বেতনের বিষয়টিও ভেবে দেখার সময় এসেছে বলে মনে করে সচেতন মহল। দেশের ডাকঘরগুলো সচল হোক প্রযুক্তির ছোঁয়ায়, সেই শুভ প্রত্যাশায় বিশ্ব ডাক দিবসের সফলতা কামনা করছি।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ