বুধবার , ১৩ নভেম্বর ২০১৯ |

বারবার আবরার: বন্ধ হোক ছাত্ররাজনীতির অপধারা

অজয় দাশগুপ্ত   শুক্রবার , ১১ অক্টোবর ২০১৯

অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ । যেখানে যাচ্ছি মুখে মুখে এক কথা। এভাবে কী চলে? একটার পর একটা ঘটনা আর দুর্ঘটনায় দেশ বারবার এমন এক জায়গায় চলে যায় , মনে হয় সংকটের সমাধান নাই। উত্তাল হয়ে ওঠে পরিবেশ। তারপর কিছুদিন উত্তেজনা আর হৈচৈ। আবার সব ভুলে যায় মানুষ।

জীবনযাপন যেখানে জরুরী সেখানে কোন বিপদই বড় না। এবার বুয়েট নিয়ে চরম উত্তেজনায় দেশ। আবরার নামের যে ছেলেটিকে খুন করা হয়েছে তা নিয়ে যে চরম অস্থিরতা আর তার ভেতর নানা বিপদ ওৎ পেতে আছে। এটা মানতেই হবে এমন মৃত্যু হত্যা ছাড়া আর কিছু না। এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত। ভিডিও ফুটেজসহ নানা প্রমাণে এটা পরিষ্কার হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল একদল ছাত্র। যারা তার সহপাঠী। যারা তার সিনিয়র কিংবা সতীর্থ। এটা ভয়াবহ।

আবরার কে কেন হত্যা করা হয়েছে তার একটা মোটামুটি ছবি পাওয়া গেছে। বাহ্যত  ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস  দেয়ার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও মানতে হবে একমাত্র কারণ এটা হতে পারে না। বোঝা যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ আর খুনের নেশা এখন একাকার।  বুয়েটসহ দেশের সব বিদ্যাপিঠে র‍্যাগিং, মারামারি খুনোখুনি নিত্য নৈমের্ত্তিক। যার বিহিত করা প্রশাসনের দায়িত্বের পর্যায়ে পড়লেও তা করা হয় না। সবাই এসব জানেন। এগুলো না বলে আমরা বরং ছাত্র রাজনীতি নিয়ে কথা বললেই সমাধানের দিকে এগোতে পারবো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না বলা পর্যন্ত কোন কাজ হয় না। এমন এক পরিবেশ কাকে কয়দিনের রিমান্ডে নেয়া হবে বা কাকে জামিন দেয়া হবে না হবে সে জন্য ও তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা হয়! এটা কেমন রীতি? তিনি কেন সব বিষয়ে বলবেন? তার কি সে সময় বা সুযোগ আছে? আজ বাংলাদেশ যে জায়গায় সেখানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিধি নীতি, বাণিজ্য এগুলো ঠিক করাই যেখানে মুখ্য- সেখানে দেশের ভেতরকার ছোট ছোট সমস্যাও শেখ হাসিনার নির্দেশ ছাড়া সমাধান বা নিস্পত্তির মুখ দেখে না। এই নির্ভরতা কী প্রমাণ করে? গণতন্ত্র কি তা বলে? না গণতন্ত্রের প্রমাণ আছে  এতে? এটা তো তার ওপর বাড়তি দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি যে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন তার কোনও তুলনা নাই। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘কিসের ছাত্রলীগ ? কিসের দল?’ এমন করে এদেশে কোন প্রধানমন্ত্রী কবে বলতে পেরেছেন? এটা তার উদারতা। কিন্তু আমরা এদেশে জন্ম নেয়া বড় হওয়া মানুষ। সব দেখেছি। এর আগের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বেলায়ও এমন ছিল। সব একপেশে। পার্থক্য এই তিনি এমন কঠিন আত্মসমালোচনা করতে জানতেন না। তারপরও দেখছি এক ধরনের রাজনীতির মূল টার্গেট শেখ হাসিনা ও তার রাজনীতি। সে কথা বিশদ বলার আগে ছাত্র রাজনীতির কথা বলি।

ছাত্র রাজনীতির গর্ব বা অহংকার নামের যা যা ছিল তা আজ কাহিনী। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত, না অনুচিত এ নিয়ে যারা তর্ক করেন তাদের বলি, একাত্তর আর আজকের বাংলাদেশ এক ? একটি পরাধীন জাতির ছাত্রসমাজ ও স্বাধীন দেশের ছাত্র সমাজ এক? কোনটাই মিলবে না। সে সময়ও কি ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িতরা আসলেই ছাত্র ছিলেন? না তাদের বয়স সীমা ঠিক ছিল? সবচেয়ে বড় কথা যদি আমরা মনে করি গাছের নাম তার ফলে বা ফলের পরিচয়ে, তাহলে একটা প্রশ্ন করা যৌক্তিক। আ স ম রব, সিরাজুল আলম খান, শাহজাহান সিরাজ, মাহমুদুর রহমান মান্না কোন বৃক্ষের  ফল? কেন তাদের নিয়ে আজ আমাদের শংকা আর চিন্তায় থাকতে হয়? আওয়ামী ছাত্রলীগের প্রডাক্টও কী উদাহরণ যোগ্য কিছু? ছাত্র রাজনীতি কেবল মাত্র ঝলসে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে, এমনকি যুদ্ধের সময়ও তাদের ভূমিকা ছিল তর্কময়। যে কারণে এদেশের নীতিবান নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে পড়তে হয়েছিল বিপদে। আমরা এসব ভুলে যাই। ভুলে যাই এদেশে সামরিক সরকার এসে প্রথম ছাত্রদের বারোটা বাজানোর জন্য হিজবুল বাহারে প্রমোদ ভ্রমনে পাঠিয়েছিল। আদর্শ আর ন্যায়ের পায়ে কুড়াল মারার শুরু জেনারেল জিয়ার আমলে। তারপর এরশাদ আমলে শুরু হয়েছিল কেনা-বেচা। নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের অভি, নীরু, বাবলুকে আপনি কিভাবে ভুলে যাবেন? কিভাবে ভুলবেন ঢাকায় একের পর এক হত্যা দেশব্যাপী ছাত্রদের চরিত্র ধ্বংসের অপরাজনীতি?

আজ যে ছাত্রলীগ তার সাথে ছাত্রদলের হুবহু মিল। যারা এখন তাদের চরিত্র হনন করছে তারাই আবার সুযোগ পেলে অন্য দলের হয়ে এমনটা করবে। তবে এখন সবকিছু ছাপিয়ে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য মানুষকে অসহায় আর অনিরাপদ করে ফেলেছে। নামধারী হোক আর যাই হোক, লাশ ফেলার রাজনীতি করে তারা মাহমুদুর রহমান মান্না ও খোকার এজেন্ডাকেই সামনে নিয়ে আসছে। দেশের আর সব জায়গায় যখন তিলে তিলে মানুষ উন্নতি আর ভালো থাকার সংগ্রাম করছে, তখন ছাত্র রাজনীতির নামে চলছে মহা লুটপাট। সে অমিত সাহা হোক, আর যেই হোক তাদের লোভ-লালসা নিয়ম না মানার কারণেই এই পরিবেশ। এই নারকীয় বাস্তবতা।

তোপের মুখে থাকা ভিসিকে নিয়ে মজা লোটা যায় কিন্তু সমাধান পাওয়া যাবে না। ভিসি নাম বা পদবী এখন ঘৃণার পর্যায়ে চলে গেছে। কেন? কারণ এই পদে এখন মেধা বা যোগ্যতা আসল বিষয় না। চাই লবিং। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এদিকে নজর দিতেই হবে। সিন্ডিকেটমুখী অধ্যাপক সাদা দল- নীল দল থাকলে শিক্ষার্থীরা কেন নানা দলে বিভক্ত হবে না?  আবরার হত্যাকাণ্ডে কতগুলো বিষয় পরিষ্কার। সরকার প্রধান পপুলার হলেও সরকার না। এরপর আছে মন্ত্রী নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা। তারা কি পুতুল?  তারা সব বিষয়ে হয়তো নিরব নয়তো লাগামছাড়া। এবারের ঘটনায় এটাও প্রমাণিত দেশে এমন এক শক্তি বড় হয়ে গেছে যাদের মোকাবেলা করা না গেলে বাংলাদেশের মূল পরিচয় ও অর্জন মাথা নিচু করে পালাতে বাধ্য হবে। আপনি যদি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিবাদের ভাষা খেয়াল করেন  বুঝবেন, তারা কাদের দ্বারা পরিচালিত। মূল ঘটনা থেকে সরিয়ে তাদের হাতে যে প্ল্যাকার্ড ধরিয়ে দেয়া হয়েছে তা ভয়ংকর। তাদের ভাষা কেন বলবে এদেশে শুধু একজনের বাবার হত্যার বিচার হয়েছে, আর কারো বাবা বিচার পায় না? এটা কী সত্য?

আমি বারবার বলি আওয়ামী লীগের অর্জন নষ্ট করার জন্য দুশমনের দরকার পড়ে না।মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর যে কৌশল তা সহজেই লুফে নিতে পারে অন্যরা। ভারত, হিন্দু, পাকিস্তান ও মুক্তিযুদ্ধ এই বিষয়গুলো আগুন নিয়ে খেলার মতো ভয়ংকর। আর তা করার জন্য এখন বাঙালি মুসলমানের দরকার পড়ে না। ভট্টাচার্য বাবুরাই আছেন মাঠে।

আবরার হত্যার বিচার না হলে আগের ঘটনাগুলো যেমন বুদবুদ আকারে ফিরে আসবে, তেমনি  বারবার নতুন ‘আবরার ঘটনা’ রোধ করা যাবে না। বলবো, দায়ী ছাত্রলীগসহ সব রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ড আপাতত বন্ধ করা হোক। জাতির সব রাজনৈতিক ধারাকে একত্রিত করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে রূপরেখা ঠিক হোক। তারপর খুলে দেয়া যেতে পারে ছাত্র রাজনীতি। যা টেন্ডার দালালী, গুন্ডামি, মাস্তানি, হত্যা, র‍্যাগিং ছাড়া আর কিছু ই দিতে পারেনা তাকে জিইয়ে রেখে যাদের লাভ তারাই- ‘গড ফাদার’। জনগণ ফুঁসছে। নাগ-নাগিনীরা ফেলছে বিষাক্ত নি:শ্বাস। শান্তির ললিত বাণীতে কাজ হবেনা। চাই সঠিক ব্যবস্থা। আর একটি মৃত্যুও নয়।


অজয় দাশগুপ্ত কলামিস্ট।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ