মঙ্গলবার , ১০ অক্টোবর ২০১৭

ঘটি-বাঙাল’ ও আমাদের ক্রিকেট

  মঙ্গলবার , ১০ অক্টোবর ২০১৭

গত বেশ কিছুদিন থেকে ‘ঘটি-বাঙাল’ শব্দদ্বয় মাথায় অস্বাভাবিক সুঁই ফোটাচ্ছে। চরকির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে শব্দ দুটি। তার জন্য অবশ্য কিছু যৌক্তিক কার্যকারণও রয়েছে। এই তো মাত্র কিছুদিন আগে সেরা বাঙালির মুকুট ছিনিয়ে আনল আমাদের ক্রিকেট লিজেন্ড মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাও আবার এদেশে নয়, ওপার বাংলার শীর্ষ দৈনিক আনন্দবাজার থেকে। ঘটা করে আয়োজিত ওই জমকালো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওপার বাংলার নামিদামি ব্যক্তিবর্গসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক তারকা।

মজার বিষয় হচ্ছে, এ আয়োজনের ফলে আমার মনে হচ্ছে ঘটি-বাঙালের চিরন্তন দ্বন্দ্বটারও স্থায়ী দফারফা হয়ে গেল। এখানে ঘটি নয় বাঙালের নিরঙ্কুশ জয় সুনিশ্চিত হলো। নয়তো আরো কয়েক বছর আগে হলেও, ওপার বাংলা নিঃসন্দেহে সেরা বাঙালি নয়, বরং সেরা ঘটির আয়োজন করত। শিরোনাম হতো-‘কে হবে সেরা ঘটি?’ কারণ, ওপার বাংলার স্থায়ী বাসিন্দারা নিজেদের কখনো বাঙাল হিসেবে পরিচয়ই দিতে চাইত না। বরং সগর্বে নিজেদের সর্বত্র ঘটি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করত। আর আমাদের উল্টো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য স্বরে বাঙাল বলে অভিহিত করত। যেন বাঙাল হওয়াটা আমাদের জন্য অসম্মানের। যদিও আমরা নিজেদের বাঙালি পরিচয়ে বরাবরই গর্ববোধ করে আসছি। শুধু তাই নয়, আমাদের যেসব ভাই-বেরাদর সেখানে গিয়ে থাকত, তাদের বাঙাল ছাড়াও কখনো কখনো রিফিউজি, উদ্বাস্তু, আবার শরণার্থী বলেও ডাকা হতো। হ্যাঁ, এটা ঠিক, শব্দগত উচ্চারণ ও কথাবার্তাতেও দু’দেশে বেশ ছিল কিছুটা বৈচিত্র্য। পশ্চিমবঙ্গবাসী বলত খেয়েচি, গিয়েচি ইত্যাদি, আর আমরা বলতাম খাইসি, পাইসি। যদিও এখনকার যুগে সব আম-দুধে-আঁটিতে একাকার হয়ে গেছে।

গোড়ার দিকে পূর্ব বাংলা থেকে যাওয়া বাঙালরা ওখানে বাড়ি ভাড়াও পেত না। ওখানকার ঘটি বাড়িওয়ালারা বলত, বাঙালদের বাড়ি ভাড়া দেব না। আর এখন ঘটিরা উল্টো নিজেদের ঘটি পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। বরং আগবাড়িয়ে ঘটিরা ঘটা করে বাঙাল উৎসব করছে। আনন্দবাজার পত্রিকা তা-ই করে দেখিয়েছে। এখন ঘটিরা প্রতিবছর বর্ষবরণ উৎসবও করছে ঘটা করে। নিজেদের বাঙাল বলে জাহির করছে। ডেকে নিয়ে সেরা বাঙালির পুরস্কার আমাদেরই হাতে তুলে দিচ্ছে। এই ক্যাটাগরিতে আমাদের আরেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুদর্শনা জয়া আহসানকেও সেরা বাঙালির পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। মোদ্দাকথা, পশ্চিম বাংলায় আর কোনো ঘটি নেই (যদিও কেউ কেউ আবার মজা করে বলছে ‘বদনা’ তো আছে), সব বাঙাল হয়ে গেছে। ওদের শুভবুদ্ধির জন্য ধন্যবাদ দিতেই হয়। আর এই আনন্দঘন উপলক্ষটা এনে দিয়েছে একমাত্র ক্রিকেট। দু’দেশের ক্রিকেটীয় আবেগ। যুগ যুগ ধরে অন্যরা যে দ্বন্দ্ব নিরসন করতে পারেনি, সেটা মিটমাট করে দিয়েছে ক্রিকেট। সেই ক্রিকেট ছাড়া জীবন চলে? হয়তো বা চলে। কিন্তু ক্রিকেটপাগল বাঙালি জাতির কতটা চলে? মোটেও চলে না। চলাটা শোভনীয়ও নয়।

বাঙালিরা এখন ক্রিকেটে মুখ দিয়ে চলে, ঘাসে নয়। ওদের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ভাত-মাছ ও তরিতরকারির মতো ওরা ক্রিকেটও খায়। ক্রিকেট নিয়ে ধ্যান-জ্ঞান করে। টিকিট নিয়ে উন্মাদনা করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিকিটের জন্য রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষা করে। গ্যালারিতে প্রিয় দলের জন্য উচ্ছ্বাস করে, গলা ফাটায়। দল জিতলেও কাঁদে, হারলেও কাঁদে। বিদেশি সাংবাদিক ও ক্রিকেট বিশ্লেষকরা এই চিত্র দেখে অবাক হয়, বিস্ময়ে চোখ কপালে তোলে। কেউ কেউ বলেই ফেলে, ‘হোয়াটস রং- হোয়াই দে আর ক্রাইং!!’

একমাত্র বাঙালি বলেই এমনটা সম্ভব। এ জন্যই বিশ্বের বুকে ক্রিকেটপাগল জাতি হিসেবে একমাত্র খেতাব বাঙালিরাই পেয়েছে, আর কেউ নয়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরাও বাঙালি সেজে সেই আবেগের অংশীদার হতে নিজেদের ঘটি পরিচয় মুছে ফেলতে চাইছে। কারণ বাঙালির ক্রিকেটীয় আবেগ-ভালোবাসা, উন্মাদনা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও দৃষ্টিকোণ অন্য সবার থেকে উচ্চমার্গীয় ও আলাদা। আর বাঙালির আতিথেয়তা সম্পর্কেও নতুন করে কিছু বলার নেই। বিশ্ব মানের, বিশ্ব নন্দিত। পৃথিবীর দ্বিতীয় আর কোনো দেশে এমন নেই। আমাদের শত বছরের বাঙালি ঐতিহ্য আছে, আরো আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত জাতীয়তা বোধ। আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশি।

বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন একটি আবেগ, জাতীয় আবেগ। বাংলাদেশ দলের কোনো খেলা থাকলে দেশের মানুষ যেন সব ভুলে যায়, পরিণত হয় ক্রিকেটপাগলে। এক সময় ফুটবল নিয়ে মাতামাতি ছিল, কিন্তু ক্রিকেট জ্বর অনেক আগেই তাকে হারিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোনো ভালো খবর পুরো জাতিকে যেমন উদ্বেলিত করে, তেমনি কোনো খারাপ খবরে মুষড়ে পড়ে দেশের মানুষ। দেশের প্রায় প্রতিটি শিশুই আজ বড় হয়ে একজন ক্রিকেটার হতে চায়, হতে চায় সাকিব অথবা তামিম। ক্রিকেটের জন্য আমাদের প্রিয় দেশটি বরাবরই নিরাপদ। যদিও সন্ত্রাসবাদ আজ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বব্যাপীই সন্ত্রাসবাদ মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা আজ কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা ভূখন্ডের সমস্যা নয়। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের জন্য আমাদের ক্রিকেটকে কখনো ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়নি। এখানে বিশ্বের অপরাপর ক্রিকেট দলগুলো রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ রাজকীয় নিরাপত্তা পেয়ে থাকে। আইসিসির সদস্যভুক্ত কোনো দেশ অপরাপর দেশে যেটা কখনো পায়নি। আমাদের আরও রয়েছে ১৭ কোটি মানুষের ৩৪ কোটি সতর্ক চোখ। এত কিছুর নিরাপত্তা ও ঘেরাটোপ টপকে এখানে কোনো প্রকার সন্ত্রাসবাদ, নাশকতা বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করা সহজ ব্যাপার নয়। দ্বিপক্ষীয়-ত্রিদেশীয় কিংবা আইসিসির চলমান ইভেন্টগুলোও আমরা সফল ও সার্থকভাবে আয়োজন করে আসছি। কিন্তু ক্রিকেট মোড়ল অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন থেকে নিরাপত্তার অজুহাতে আমাদের সঙ্গে খেলতে টালবাহানা করছিল। তারাও হাতে-কলমে দেখে গেছে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য কতটা নিরাপদ। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে গেছে। লাল-সবুজের দেশটা আরো অনেক কারণে অতুলনীয়। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সঙ্গে আগত সে দেশের সাংবাদিকদের রাতের একবেলা খাবার ফ্রি খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে আমাদের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। ক্রিকেট ইতিহাসে এমন নজির আর নেই। একমাত্র বাংলাদেশি বলেই এমনটা সম্ভব হয়েছে।

যাই হোক, অবশেষে সব শঙ্কা ও কুফাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী দুই টেস্টের সিরিজ ভালোভাবেই খেলে গেছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। এর আগে খেলে গেছে সাদা চামড়ার ব্রিটিশরা। কোনো সমস্যা পোহাতে হয়নি বাংলাদেশেকে। টেস্ট ক্রিকেটে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর গৌরবের পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র-এই চ্যালেঞ্জও জিতে গেলাম আমরা। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন নতুন পরাশক্তি। টাইগাররা নিজেদের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেট খেলে যাচ্ছে। সাকিব-তামিমরা জয়ের অভ্যাস তৈরি করেছে। ক্রিকেটের বিশ্ব মাদবরদের বোঝানো গেছে, বাংলাদেশ এখন আর আগের বাংলাদেশ নেই। বরং পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। যে শক্তিকে অগ্রাহ্য করা মানে মারাত্মক খেসারত দেওয়া, যে শক্তিকে অগ্রাহ্য করার মানেই হলো নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারা।

কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে এখনো বাংলাদেশ কুলীন ও দুর্বলতম রাষ্ট্রই রয়ে গেছে। তারা গত দুই সপ্তাহ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বাজে ক্রিকেট খেলে যাচ্ছে। ক্রিকেট ভক্ত ও অনুরাগীদের রীতিমতো আবেগের পরীক্ষা নিচ্ছে। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখনো কাক্সিক্ষত মানে যেতে পারেনি। গত দুই টেস্টে শোচনীয়ভাবে হেরে বাংলাদেশ সেটা প্রমাণ করছে। আশা করি, ওয়ানডে ক্রিকেটে কোটি কোটি ভক্ত ও অনুরাগীরা বদলে যাওয়া আগের বাংলাদেশকেই ফিরে পাবে।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ