বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯ |

এসো বই পড়ি, আলোকিত জীবন গড়ি

  বুধবার , ১৬ অক্টোবর ২০১৯

আরিফ ইকবাল নূর

একটি সুন্দর বই হচ্ছে একটি রহস্যময় সুন্দর ভুবনের দরজা। প্রতিটি পৃষ্ঠা মানুষকে সাহায্য করে রহস্যের জট খুলে কাহিনীর গভীরতায় টুকতে, শেখায় জীবনবোধ, সংগ্রাম, অনুপ্রেরণা। বই মানুষকে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে এবং টাইম মেশিন ছাড়াই হাজার হাজার বছর সামনের ভবিষ্যতে। বইয়ের মাধ্যমে সে অতীত পূর্বপুরুষের কাছাকাছি চলে যেতে সক্ষম হয়। তাদের জীবন-যাপন, আচার-আচরণ, ইতিহাস, সংগ্রাম ইত্যাদি বিষয় সম্পকে ধারণা লাভ করতে পারে। আর বই শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জনের জন্য অথবা তথ্য আহোরণের উপায় তা কিন্তু নয়, একটা ভালো গল্পের বই বা উপন্যাস মানুষকে হাসাতেও পারে আবার কাদাঁতেও পারে। মোটকথা একটা চমৎকার বই মানুষের অনুভূতিগুলো নিয়ে দারুনভাবে খেলা করতে পারে।

"ভালো খাদ্য পেট ভরে কিন্তু ভালো বই মানুষের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে", স্পিনোজারের এই বিখ্যাত উক্তির মর্মার্থ তারাই বুঝতে পারে যারা নিয়মিত বই পড়ে। সূরা আলাকে আল্লাহ তায়ালা বলেন, পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা কোরআনের আরেক জায়গায় বলেন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? বই পাঠের গুরুত্ব বোঝাতে বিভিন্ন দেশের দার্শনিক মনীষীগণ অনেক মূল্যবান উক্তি করেছেন। ওমর খৈয়াম বলেন, 'রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু একটি বই অনন্ত যৌবনা- যদি তেমন বই হয়। সিইও জিগি জর্জ বলেন, "মানুষ যখন বই পড়ে তখন সে তার উন্নয়নটা চোখের সামনে দেখতে পায় না। কিন্তু অনেকটা ভিডিও চিত্রের মতো অনেক কিছুই মানুষের মনে গেথেঁ বসে যায়। আর সেটাই তার মনের বিকাশে সহায়তা করে"। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যোগে আমরা দিন দিন বই পড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমরা যারা শিক্ষার্থী আমাদের তো বই পড়ার সামান্য সময়টুকুও থাকে না। আমাদের বইয়ের সাথে গভীর সর্ম্পক গড়ে তুলা প্রয়োজন। নেপোলিয়নের একটা উক্তি আমাকে সবসময় নাড়া দিতে থাকে। তিনি বলেছিলেন, "অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে জীবন অচল"। আমরা এখন একটু চিন্তা করে দেখি আমাদের কার কতটা বই সঙ্গে রয়েছে।

দের্কাতে বলেছিলেন, "ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষের সাথে কথা বলা"। অতীতে যারা সফলতার শিখরে পৌছতে সক্ষম হয়েছিল, আমরাও তাদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সফলতার শিখরে আরোহণ করতে পারি।আরেকজন বিখ্যাত মনীষী জন মেকলের উক্তি মনে পড়লে শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, "প্রচুর বই নিয়ে গরীব অনাহারে চিলোকোঠায় থাকবো, তবুও এমন রাজা হতে চাইনা যে বই পড়তে ভালোবাসে না।

বিশিষ্ট ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বই পড়ার প্রতি এত বেশি আসক্ত ছিলেন যে, লাইব্রেরি কক্ষে কর্মচারীরা তার নির্বিষ্ট পাঠক মনের উপস্থিতি পর্যন্ত টের পেত না। তাই বহুবার তিনি লাইব্রেরি কক্ষে তালাবন্দি হয়েছেন। Warren Buffett তাঁর পেশা জীবনের শুরুতে প্রতিদিন ৬০০-১০০০ পৃষ্ঠা নিয়মিত পড়তেন। প্রতিবছর ৫০ টি বই পড়ে শেষ করেন। হাজ্বী ইমদাদুল্লাহ (রহঃ) জীবনে কত বই পড়েছেন তার কোন পরিসংখ্যান নেই। তিনি এমন বইপ্রেমিক ছিলেন যে, বই পড়তে পড়তে লাইব্রেরিতেই মৃত্যুবরণ করেন। Elon Mask রকেট সায়েন্স এর বিদ্যা বই পড়ার মাধ্যমেই অর্জন করেছেন| Mark Cuban প্রতিদিন ৩ ঘণ্টার বেশি বই পড়েন। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন বলেন, বই-ই জ্ঞানের প্রতীক, বই আনন্দের প্রতীক। বিশিষ্ট সুসাহিত্যিক আল্লামা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) ছোটবেলা থেকেই বই পাঠে খুবই আগ্রহী ছিলেন। কোন বই হাতের নাগালে পেলে পড়ে শেষ করার পূর্বে বসা থেকে উঠতেন না। তিনি  ছোটবেলায় কিছু টাকা জমিয়ে বই কেনার জন্য বাজারে রওয়ানা দিলেন। ওষুধের দোকানে গিয়ে বললেন আমাকে একটা বই দিন। এমন ছোট ছিলেন যে, তিনি জানতেন না সব কিছুর দোকান ভিন্ন ভিন্ন। ওষুধের দোকাধে ওষুধ বিক্রি হয়, আর লাইব্রেরিতে বই বিক্রি হয়। এ কথা তিনি জানতেন না। ফলে ডাক্তার একটা ওষুধের লিস্ট তাঁর হাতে দিয়ে অপর হাতে টাকা দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। বিখ্যাত ফার্সি কবি শেখ সাদী (রাহ) বলেন, সমস্ত জীবন জ্ঞানের ওপর লেখা-পড়া করে বুঝেছি যে, জ্ঞানের বাতাস গায়ে লেগেছে মাত্র। প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারি নাই। পড়ার কোন শেষ নেই।

বিল গেস্ট বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই আমার অনেক স্বপ্ন। আর সেসব স্বপ্ন আমি পেয়েছিলাম সম্ভবত বই থেকে। ছোটবেলা থেকেই আমি প্রচুর বই পড়ি। তোমার যদি আমার অফিসে যাও, দেখবে বই। যদি আমার বাড়িতে যাও, দেখবে আমার সঙ্গে বই আছে। আমি যখন ট্রেনে উঠি, আমার সঙ্গে তখনও বই থাকে। আমি যখন গাড়ি, প্লেনে চড়ি তখনো আমার সঙ্গে বই থাকে। নর্মান মেলর বলেন, আমি চাই যে, বই পাঠরত অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়। টলস্টয় বলেন, 'জীবনে তিনটি জিনিস খুবই প্রয়োজন, তা হল বই, বই এবং বই। অ্যামেরিকান বিখ্যাত অভিনেতা Will Rogers বলেছেন, A man only learns in two ways, one by reading and the other by association with smarter people.

সৈয়দ মুজতবার আলীর বই প্রীতির কথা আমরা সবাই জানি। তাইতো সহজেই তিনি বলতে পেড়েছেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। বই পড়ার গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি তাঁর 'বইকেনা' গল্পে একজন রাজা ও হেকিমের গল্প বলেছিলেন। "এক রাজা তাঁর হেকিমের একখানা বই কিছুতেই নিতে না পেরে তাঁকে খুন করেন। বই হস্তগত হল। রাজা বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে বইখানা পড়ছেন। কিন্তু পাতায় পাতায় এমনি জুড়ে গিয়েছে যে, রাজা বার বার আঙুল দিয়ে মুখ থেকে থুথু নিয়ে জোড়া ছাড়িয়ে পাতা উল্টোচ্ছেন। এদিকে হেকিম আপন মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিলেন বলে প্রতিশোধের ব্যবস্থাও করে গিয়েছিলেন। তিনি পাতায় পাতায় কোণের দিকে মাখিয়ে রেখেছিলেন মারাত্মক বিষ। রাজার আঙুল সেই বিষ মেখে নিয়ে যাচ্ছে মুখে। রাজাকে এই প্রতিহিংসার খবরটিও হেকিম রেখে গিয়েছিলেন বইয়ের শেষ পাতায়। সেইটে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজা বিষবাণের ঘায়ে ঢলে পড়লেন।" একটা সভ্যতাকে, একটা শতাব্দীকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য মহা কোন পরিকল্পনা করার দরকার নেই। ঐ সভ্যতার সবগুলো বইও পুড়ে গেলার কোন প্রয়োজন নাই। শুধু মানুষকে বই পড়া থেকে বিরত রাখতে পারলেই তা হয়ে যাবে। তাইতো অ্যামেরিকান লেখক Ray Bradbury বলেছেন, You don't have to burn books to destroy a culture. Just get people to stop reading them. এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ফ্রাঞ্জ কাফকা বলেছেন, আমাদের আত্মার মাঝে যে জমাট বাধা সমুদ্র সেই সমুদ্রের বরফ ভাঙার কুঠার হলো বই।

Books and friends should be chosen and few. এটা একটি শত বছর সগৌরবে বেচেঁ থাকার মত কথা। যে বইটি তিনবার পড়তে ইচ্ছা করবে না, সে বইটি ক্রয় করবেন না, বা পড়বেন না। আমার ছোটবেলা শিরোনামে ড:শহিদুল্লার একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। তিনি বলেছেন, আমার ছোটবেলা থেকে বটতলার বাজে উপন্যাস পড়তে ইচ্ছা করত না। কারণ বটতলার বাজে উপন্যাস বা বই মানুষের কোন উপকার সাধন হয় না। বর্তমানেও অনেক বটতলার বাজে বই রয়েছে যা পড়লে পাঠকের মনের অনুভূতির বিকাশ ঘটায় না। তাই ভালো বই পড়া দরকার।

বই পড়লে জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনার কি জানা আছে শরীর সুস্থ রাখতেও বই পড়ার অভ্যাস দারুণভাবে সাহায্য করে।তাই তো চিকিৎসক নিয়মিত ১ঘন্টা বই পড়তে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, আজকের যুগে যেসব রোগে নতুন প্রজন্ম বেশি মাত্রায় ভুগছে তার বেশিরভাগ এর সাথে মানসিক চাপের সরাসরি যোগ রয়েছে। আর বই পড়ার অভ্যাস এমন ধরনের সমস্যাকে দূর করতে সহায়তা করে। সেই সাথে হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস, স্ট্রোক প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হওয়োর আশাষ্কাও হ্রাস করে। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস করলে ব্রেনের কর্মক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবে মস্তিস্কের একটি বিশাল অংশের ক্ষমতা এটতা বৃদ্ধি পায় যে বুদ্ধির ধারও বাড়তে শুরু করে। বই পড়লে লেখার দক্ষতা বাড়ে, মনোযোগ বাড়ে, মানসিক চাপ কমায়, স্বরণশক্তি বৃদ্ধি পায়, শদ্ব ভান্ডার বৃদ্ধি পায়, ভালো ঘুম হয়, সৃজনশীলতা বাড়ে, সজাগতা বৃদ্ধি পায়, মাংসপেশীয় মিথিলায়ন, উদ্বেগ ও স্নায়ুবিক চাপ হ্রাস ইত্যাদি অনেক উপকারিতা রয়েছে। বই পড়া অসম্ভব সুন্দর আর প্রশংসনীয় একটি কাজ। মানুষ বই পড়লে কেবল সামাজিকভাবে উন্নত হয় না, মানসিকভাবেও হয়। তাই আনন্দের সাথে বই পড়ুন, আলোকিত মানুষ হয়ে বাঁচুন।

লেখক শিক্ষার্থী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ