বৃহস্পতিবার , ১২ অক্টোবর ২০১৭

রোহিঙ্গা আশ্রয় : অঞ্চল ভাগ করে রাখার পরামর্শ

  বৃহস্পতিবার , ১২ অক্টোবর ২০১৭

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সব রোহিঙ্গাকে এক জায়গায় রাখতে চায় সরকার। এরমধ্যে অস্থায়ীভাবে রাখতে কক্সবাজারের কুতুপালং এলাকায় বড় আকারের শিবির তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। আর স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের জন্য ভাসানচর দ্বীপকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ভাসানচরে আশ্রয়স্থল তৈরিতে দ্বীপটির প্রায় ১৩ হাজার একর জমির অবকাঠামো উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করেছে সরকার। এটি সম্পন্ন হলে ৯ থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে এক জায়গায় রাখা সম্ভব হবে। এরআগে অস্থায়ীভাবে রাখতে কুতুপালংয়ে ইতোমধ্যেই ২৪টি সাব-ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। নতুন এসব ক্যাম্পে থাকতে পারবে ৭ লাখ রোহিঙ্গা। সবাইকে কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে অস্থায়ীভাবে রেখে অন্যান্য ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখনো রোহিঙ্গারা আসছে। ২৫ আগস্ট থেকে গতকাল পর্যন্ত ৫ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। এর বাইরে ২০০৫ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময় এসেছে আরো ২ লাখের বেশি। সব মিলে এই মুহূর্তে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মোট ৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৩১ জনে। পাশাপাশি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) জানায়, গত সোম ও মঙ্গলবার মিলে নতুন করে ১১ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে।

এদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত থাকায় এখনো রোহিঙ্গারা আসছেই। মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও মিয়ানমারের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন ও নতুন চুক্তির ব্যাপারে গত এক সপ্তাহের বেশি সময়েও মিয়ানমার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি অব্যাহত থাকা আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং সংকট সমাধানে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া ও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকারকে স্থায়ী সমাধানের পথেই যেতে হবে। শুধু ফিরিয়ে নিলেই হবে না, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থাও করতে হবে। ফলে সরকারকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে একটি স্থায়ী ব্যবস্থার কথাও ভাবতে হবে।

তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এবং ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পে না রেখে সব রোহিঙ্গাকে কয়েকটি স্থানে নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে ভাগ করে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্থায়ী বা অস্থায়ী যেভাবেই রাখা হোক না কেন, এসব রোহিঙ্গাকে অন্তত ৮ থেকে ১০টি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভাগ করে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখায় শ্রেয় হবে। এতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকানো যাবে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয় থাকবে না। বিশেষ করে সরকার রোহিঙ্গাদের ঘিরে যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা ভাবছে, অঞ্চলভিত্তিক আশ্রয় পেলে সে শঙ্কা থাকবে না। কারণ, তখন তাদের ওপর সুস্পষ্ট নজরদারি রাখা সম্ভব হবে।

এ ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে রোহিঙ্গাদের একই স্থানে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সবাইকে কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে অস্থায়ীভাবে রেখে অন্যান্য ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হবে। ক্যাম্পের ভেতরে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, খাদ্য সরবরাহ, স্যানিটেশন, রেজিস্ট্রেশন ও চিকিৎসা দেওয়াসহ সব কাজ সুচারুভাবে করার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রী আরো জানান, কুতুপালং ক্যাম্পের বাইরে যেসব ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা থাকছে ক্রমান্বয়ে তা গুটিয়ে আনা হবে। ইতোমধ্যে ক্যাম্পের বাইরে পাহাড়ি এলাকায় ও অন্যান্য স্থানে যেসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তাদের ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে।

এর জন্য কুতুপালং ক্যাম্পকে ২০টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেক ব্লকের জন্য একটি প্রশাসনিক ও পরিসেবা ইউনিট এবং একটি গোডাউন স্থাপন করা হচ্ছে। এতে সব ধরনের সেবা দেওয়া সহজ হবে। পরবর্তী সময়ে ব্লকগুলো ক্যাম্পে রূপান্তর করা হবে। ব্লকের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য একজন করে কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে বলেও জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি দীর্ঘদিন হয়ে গেলে নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী। এ বিষয়ে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে মন্ত্রী জানান।

তবে সরকারকে রোহিঙ্গাদের রাখার ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সুনির্দিষ্ট ধারণা থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা সবাই একটি জায়গায় না রেখে দক্ষিণ চট্টগ্রাম বা চট্টগ্রামের কয়েকটি স্থানে সমানসংখ্যক ভাগ করে বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে রোহিঙ্গাদের রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হক বলেন, আশ্রিত রোহিঙ্গারা যে বিশাল জনগোষ্ঠীতে রূপ নিয়েছে, তাতে তাদের যেভাবেই রাখা হোক না কেন কিছুটা পরিবেশ বিপর্যয় হবেই। জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে কীভাবে ও কোথায় রাখলে এই বিপর্যয়ের পরিমাণ কিছুটা হলেও কমবে, সেটি ভাবতে হবে। তাৎক্ষণিক ভাবনা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট ধারণা নিয়েই ক্যাম্প বা আশ্রয়স্থল করতে হবে।

এই পরিবেশবিদ বলেন, এটি ঠিক, এসব রোহিঙ্গা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলে পরিবেশসহ অন্যান্য হুমকি মাথাচাড়া দেবে। নানা সামাজিক বিরূপ প্রভাব পড়বে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইডস রোগী রয়েছে। এসব রোগব্যাধির বিস্তার বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। আমরাও নানামুখী বিপদের মধ্যে পড়তে পারি। তাই এমন জায়গায় রাখতে হবে যেন তারা কিছুতেই সাধারণ মানুষ বা সমাজে মিশে যেতে না পারে। এরা হতদরিদ্র। নানা ধরনের প্ররোচনায় পড়তে পারে। তাই এমন নিরাপত্তা দিতে হবে ও নজরদারি রাখতে হবে যাতে তারা জঙ্গিসহ কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বা নেতিবাচক রাজনীতিতে ব্যবহার হতে না পারে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় যদি রাখতে চাই তাহলে পরিবেশ বিপর্যয় বেশি হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারচেয়ে ৮-১০টি অঞ্চলে নির্দিষ্ট ক্যাম্প বা আশ্রয়স্থল করে ভাগ করে রাখা যেতে পারে। শুধু কুতুপালং বা ভাসানচরের কথা না ভেবে অন্যান্য সমতল ভূমির কথাও ভাবতে পারি। সংখ্যায় বেশি না করে একটি সহনীয়সংখ্যক রোহিঙ্গাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হবে।

অধ্যাপক আবদুল হক আরো বলেন, চট্টগ্রামের মধ্যেই ৮-১০টি এলাকায় নিরাপদ বলয়ে রাখা যেতে পারে। এতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকানো যাবে। শুধু কুতুপালং হলে বন-পাহাড় রক্ষা করা যাবে না। এর জন্য তাৎক্ষণিক ধারণা থেকে না করে সুনির্দিষ্ট ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে আশ্রয়স্থল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক ও রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক জাকির হোসেনও অনুরূপ মত দেন। তিনি বলেন, সরকার রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় নিতে চাইছে যাতে এসব রোহিঙ্গাকে কেউ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে না পারে, সে ভয় থেকে। কিন্তু এই বিশালসংখ্যক রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় রাখলেও তাদের মধ্যেও রাজনৈতিকভাবে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হতে পারে। স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও বেশি। কুতুপালংয়েই যদি রাখা হয়, তাহলেও এক জায়গায় এই ৬-৭ লাখ রোহিঙ্গাকে এক জায়গায় রাখা ঠিক হবে না। বরং ৫০ হাজার করে ১০-১২টি জায়গায় নির্দিষ্ট ক্যাম্প করে রাখাই শ্রেয় হবে। যদি এক জায়গায় এত রোহিঙ্গাকে রাখা হয় তাহলে অভ্যন্তরীণ কলহ ও সংঘর্ষ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা থেকে যায়।

‘এমনকি একটি ক্যাম্প বা আশ্রয়স্থল থেকে আরেকটি ক্যাম্প বা আশ্রয়স্থলের মধ্যে দূরত্ব রাখতে হবে। এক ক্যাম্পের লোক অন্য ক্যাম্পে যেতে পারবে না’ বলেও মত দেন এই গবেষক। তিনি বলেন, শুধু কক্সবাজারে না রেখে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে রাখার কথাও ভাবা যেতে পারে। কারণ দিনে দিনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যেভাবে বাড়ছে, তাতে পর্যটন কেন্দ্র তো দূরেই থাক, সাধারণ বসবাসের উপযোগীও থাকবে না এই এলাকা। এক সময় কক্সবাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্য নিজেদের জোগান মিটিয়ে এক থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন রফতানি করা যেত। কিন্তু এখন এই পরিমাণ খাদ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। অতিরিক্ত মানুষ যেখানে থাকবে, সেখানে পরিবেশ বিপর্যয় হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য এখন কক্সবাজারে সে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এসব রোহিঙ্গার জন্য স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান নষ্ট হচ্ছে। পর্যটন এলাকা হিসেবে কক্সবাজার গুরুত্ব হারাচ্ছে। আর এসবই হচ্ছে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য।

একইভাবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, সীমান্ত এলাকাগুলোয় না রাখাই ভালো। কারণ, সীমান্ত এলাকায় বাস করায় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি ও অপরাধীরা এদের অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানে ব্যবহার করছে। এদের মাধ্যমে সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এসব চোরাচালান চালাচ্ছে। মিয়ানমারে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী দল আছে, তারাও এসব রোহিঙ্গাকে ব্যবহার করছে। সুতরাং কিছুতেই সীমান্ত এলাকায় রাখা যাবে না। অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে। এরা এখানে থাকলে স্থানীয় শান্তি বিঘ্নিত হবে।

 জাতীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ