বৃহস্পতিবার , ১২ অক্টোবর ২০১৭

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাফাইকর্মীরা

  বৃহস্পতিবার , ১২ অক্টোবর ২০১৭

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন রাজধানীর বর্জ্য সংগ্রহকর্মীরা। তারা বর্জ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে মারাত্মক রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এরইমধ্যে শরীরে খোসপাঁচড়া, চুলকানিসহ নানা চর্মরোগে ভুগছেন। অথচ এ কাজের জন্য বর্জ্য কর্মীদের শুধু অ্যাপ্রোন দেয় সিটি করপোরেশন।

দীর্ঘ আট বছর ধরে বাসাবাড়ির ময়লা অপসারণ করেন সোহেল। ছোটবেলা থেকে এ কাজ করেন তিনি। ইজারাদারের মাধ্যমে প্রতিদিন সকাল ৮ থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ করে সিটি করপোরেশনের কনটেইনার পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ আট বছরে অনেকবার বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছি। অনেক টাকা চিকিৎসা বাবদ খরচ করেছি। দুই বছর আগে একবার হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের জীবাণু ধরা পড়েছিল। এখনো সেই রোগের চিকিৎসা চলছে।’

শুধু সোহেল নয়। রাজধানীতে সোহেলের মতো অনেকেই আছেন এমন রোগে আক্রান্ত। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহস্থালি বর্জ্যরে পাশাপাশি হাসপাতালের বর্জ্য নিয়েও কাজ করেন তারা। এই বর্জ্যগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়ছে হেপাটাইটিস ‘বি’, হেপাটাইটিস ‘সি’, যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়াসহ মারাত্মক রোগ। এছাড়া বিভিন্ন সংক্রামক রোগ যেমন টাইফয়েড, জন্ডিস ও শ্বাসকষ্ট, চোখ এবং ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, এ কাজে জড়িতরা সাধারণত সংক্রামক রোগ ভুগে থাকেন। খোসপাঁচড়া, চুলকানি তো আছেই। অ্যাজমা রোগীরা এ কাজ করলে তাদের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। কাজের সময় যদি হ্যান্ডগ্লাভস, গামবুট, ক্যাপ ও জীবাণুনাশক সাবান স্যাভলনসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করে কিছুটা রোগব্যাধি মুক্ত থাকতে পারেন তারা। তবে বর্জ্য সংগ্রহকারীদের মধ্যে সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার কওে বোঝাতে হবে, যাতে তারা নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. জাহাঙ্গীর হোসেনে বলেন, হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে যেসব বর্জ্য তৈরি হয়, তাতে নানারকম জীবাণু থাকে। এ রকম বর্জ্য আলাদাভাবেই ব্যবস্থাপনা করা উচিত। কারণ হাসপাতাল গেট পেরোলেই সরাসরি সিটি করপোরেশনের কর্মীরা যুক্ত। আলাদাভাবে কাজটি করলে বর্জ্য সংগ্রহকর্মীরা কিছুটা নিরাপদ থাকবেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৬টি ও উত্তরে ৩৬টি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কাজ এবং গৃহস্থালি ময়লা অপসারণে সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রায় সাত হাজার শ্রমিক নিয়োজিত আছেন। আবার বাসাবাড়ি কিংবা শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত বর্জ্য রাখার জন্য রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় ৬০টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) স্থাপন করেছে। ইজারা নিয়ে একশ্রেণির লোক ব্যবসা খুলে বসেছেন। বেসরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মুজরি ও স্বাস্থ্যসচেতনতায় সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানালেন ভিন্ন কথা, কর্মীদের অ্যাপ্রোন ও নিরাপত্তা গ্লাভস দিলেও তারা সেটি ব্যবহার করছেন না। ব্যক্তিমালিকানায় অর্থাৎ ইজারাদারদের ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য সংগ্রহকারীদের কিছুই দেওয়া হয় না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ময়লা সংগ্রহের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের হাতে থাকলেও বর্জ্য সংগ্রহকারী শ্রমিকরা কাজ করেন মূলত স্থানীয় ইজারাদারদের অধীনে। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা বেশ কিছু উপকরণ পেলেও বেসরকারিভাবে নিয়োজিত কর্মীরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ আছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে শ্রমিকদের।

বর্জ্য অপসারণকর্মীরা জানান, প্রতিদিন তিন-চার ভ্যান ময়লা সংগ্রহ করতে হয় তাদের। ময়লা বাছাইয়ের সময় মাঝেমধ্যে হাত-পা কেটে যায়। অনেকেই খোসপাঁচড়া, চুলকানি, কাঁশিমত রোগে ভুগছেন। পচাবাসি বর্জ্যরে দুর্গন্ধে কাজে মনোযোগ দেওয়া য়ায় না। মালিকের কাছে অনেকবার বুট, মার্কস ও গ্লাভস চাইলেও দিতে রাজি হন না। এ কাজে অনেক রোগবালাই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তা জেনেও টাকার জন্য কাজ করেন বলে জানান তারা।

কারওয়ান বাজারের বর্জ্য সংগ্রহকর্মী আলমগীর জানান, প্রতিদিন ১০০ বাড়ির বর্জ্য নেন তিনি। কাজ শেষ করতে কোনো কোনো দিন রাত হয়ে যায় তার। এ কাজের জন্য তিনি দিনে পান মাত্র ২২০ টাকা।

বর্জ্য শ্রমিদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ড. আবদুল মতিন বলেন, সরকারিভাবে দুই সিটি করপোরেশনে বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থায় কর্মীদেরর তেমন সুবিধা নেই। রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হয়; যা পরিচ্ছন্নকর্মীরা পরিষ্কার করছেন। অথচ তাদের স্বাস্থ্যসচেতনতায় কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ নেই। পাশাপাশি একই লাইন দিয়ে হাউসহোল্ডের বর্জ্য ও সুয়ারেজ লাইন গেছে, যেটা সহজেই পরিবেশকে দূষিত করছে বলে জানান তিনি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, নব্বইয়ের দশকে রাজধানীতে ময়লা-আবর্জনা রাখার জন্য ডাস্টবিনের ব্যবস্থা ছিল। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা বর্জ্য অপসারণে কাজ করতেন। তারপর ২০০০ সাল থেকে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা ওয়েস্ট কালেকশন ফাউন্ডেশনকে। কিছুদিন ভালো চললেও গত কয়েক বছরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বর্তমানে ডিএনসিসিতে দুই হাজার চারজন পরিচ্ছন্নকর্মী রয়েছেন। তাদের অ্যাপ্রোন দেওয়া হয়েছে। বেসরকারিভাবে ইজারাদারদের তত্ত্বাবধানে এক হাজার ৭৫ জন কর্মী কাজ করছেন। তাদের কোনো নিরাপত্তা উপকরণ দেওয়া হয় না।

তিনি আরো বলেন, এ ব্যাপারে একটি খসড়া নীতিমালার কাজ চলছে। যেখানে পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য প্রতিবছর অ্যাপ্রোন, রেইনকোর্ট, ওয়ার্ক শু, হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক ও চশমাসহ মোট ১২টি নিরাপত্তার উপকরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব শ্রমিকের জন্য সেটির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।

 রাজধানী থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ