বৃহস্পতিবার , ১২ অক্টোবর ২০১৭

রাখাইন থেকে বলপূর্বক বিতাড়িত মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী বসবাস ও নাকশকতায় উসকানি দিয়ে বেশ কিছু এনজিও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ত্রাণ সহায়তার আড়ালে রোহিঙ্গাদের মধ্যে উগ্রধর্মীয় মতবাদ প্রচার ও নাশকতার কাজে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এসব নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি উদ্বেগ জানিয়েছে। কমিটি এসব এনজিওর বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া, তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকারও সুপারিশ করেছে।

এদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুটি মানবিক-বিপর্যয় দাবি করে অনেক বিদেশি রাষ্ট্র তাদের পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখতে চাইছে। সংসদীয় কমিটি মনে করে, বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সাহায্যের এ প্রক্রিয়া মানবিক দিক থেকে ঠিক হলেও দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসন দেশের জন্য কল্যাণের বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এসব বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য সাহায্যের বদলে আগ্রহী রাষ্ট্রগুলো যাতে নিজ নিজ দেশে তাদের আশ্রয় দিয়ে পুনর্বাসন করে, সে বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। খবর বৈঠক সূত্রের।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত ১৬তম বৈঠকে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর বাইরে রোহিঙ্গা ইস্যুটি অনির্ধারিত আলোচনায় ওঠে। কমিটির সভাপতি ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, মুহাম্মদ ফারুক খান, গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স এবং বেগম মাহজাবিন খালেদ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, এনজিওদের নাশকতা ও বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, বেশ কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের নাশকতা পরিস্থিতি তৈরি করতে উসকানি দিচ্ছে। এসব এনজিওর মধ্যে মুসলিম এইড, ইসলামিক রিলিফ এবং ফজলুল্লাহ ফাইন্ডেশন অন্যতম। এরা রোহিঙ্গাদের এখানে স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এমনকি এনজিওগুলো রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশের বিপক্ষে কাজ করে, সে জন্য তাদের উদ্ধুদ্ধ করছে। কারণ এখানে স্থায়ী হলে এসব এনজিওর ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হবে।

তবে, সংসদীয় কমিটি উসকানি দেওয়া এনজিওদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সূত্র বলছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য কখনো কল্যাণকর কোনো কাজ করেনি। বরং নাম-পরিচয় গোপন করে এ দেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার-অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোতে গিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটিয়ে রাষ্ট্রের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। এতে অনেক রাষ্ট্র বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। নবম জাতীয় সংসদে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মনি সংসদে ফ্লোর নিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবার রোহিঙ্গা জনস্রোতে দেশ মানবিক বিবেচনায় পাশে দাঁড়ালেও তাদের স্বভূমিতে ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে মিয়ানমার সরকার এখনো তাদের ফেরত নিতে নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে।

জানতে চাইলে কমিটির সদস্য মাহজাবিন খালেদ এ প্রসঙ্গে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, কিছু এনজিও ত্রাণের বদলে রোহিঙ্গা আশ্রিত এলাকায় অন্য কিছু করতে চাচ্ছে। আমরা তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে চাই। এসব এনজিওর সাহায্য করতে হলে সরকারের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকদের কাছে ত্রাণ বুঝিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি এনজিওদের সম্পর্কে এনজিও ব্যুরোকে অবহিত করতে হবে। কারা তাদের পরিচয় (ব্যাকগ্রান্ডউ) দিতে হবে। এই সংসদ সদস্য বলেন, আমরা জেনেছি কিছু লোক ধর্মীয় প্রচারণার জন্য সেখানে গেছেন। কিন্তু ওটাতো ধর্মীয় প্রচারের জায়গা নয়। ওখানে শুধু ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিয়ে তৎপরতা থাকবে। এদিকে, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে দীর্ঘস্থায়ী সাহায্য করতে আগ্রহী উন্নত অনেক রাষ্ট্র। তবে, সংসদীয় কমিটি এটিকে সঠিক পন্থা নয় বলে মনে করছে। কমিটির মতে, বাংলাদেশ একটি জনবহুল রাষ্ট্র। সেখানে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসন করা হলে সংকট বাড়বে। বাড়বে দেশের ওপর চাপ। কমিটি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে চাইছে, তারা এসব বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ দেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাই শ্রেয়। এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে সুপারিশ করেছে কমিটি।

এ প্রসঙ্গে কমিটির সদস্য মাহজাবিন খালেদ বলেন, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্রগুলো এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে সাহায্য না করে তাদের নিজ দেশে আশ্রয় দিয়ে পুনর্বাসন করেন সেটাই ভালো। কারণ আফগানিস্তান ও সিরিয়াসহ অনেক রাষ্ট্রের শরণার্থীদের উন্নত রাষ্ট্রগুলো আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তাদের এই সহমর্মিতা দেখানো উচিত; এর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও রোহিঙ্গা নিধনে এখন পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে এ সংখ্যা পাঁচ লাখ। ইতোমধ্যে অনেকে প্রাণ হারিয়েছে।

এদিকে, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা যে এ দেশে অস্থায়ী ভিত্তিতে বসবাস করছে, এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ সময় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমার ও ভারতসহ সব প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

বৈঠকে দেশের জনগণের মধ্যে রোহিঙ্গা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দানের জন্য আমাদের পাঠ্যপুস্তকে একটি অধ্যায় সংযোজন করতে মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়াও যেসব প্রতিনিধি আইপিইউ এবং সিপিএসহ বিভিন্ন প্রতিনিধিদলে যোগদান করবেন, তারা যাতে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উত্থাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে তাদের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্তসার সরবরাহ করার সুপারিশ করা হয়।

বৈঠকে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, এ বিষয়ে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রস্তাব উত্থাপন এবং নিরাপত্তা পরিষদে এ ইস্যুতে ১৫টি দেশের মধ্যে ১২ দেশের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের বিশেষ সম্মান প্রদর্শন বাংলাদেশের কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহিদুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 জাতীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ