বৃহস্পতিবার , ১২ অক্টোবর ২০১৭

তৎপরতার শুরুতেই ধরাশায়ী জামায়াত

  বৃহস্পতিবার , ১২ অক্টোবর ২০১৭

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত বিভিন্নভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছিল। বিএনপির সহায়ক শক্তি হিসেবে দলটি রাজপথে আবার অরাজকতা সৃষ্টি করতে প্রস্তুতি মিটিং ডাকে রাজধানীর উত্তরার এক বাসায়। শীর্ষনেতারা গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন—গোয়েন্দাদের এমন খবরের ভিত্তিতে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারিসহ কেন্দ্রীয় ছয় নেতাকে আটক করে। দলটির সাবেক শীর্ষনেতাদের ফাঁসির পর, আলোচিত ৫ জানিুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার পর কোণঠাসা জামায়াত নতুন করে সংগঠিত হওয়ার আগেই এই গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। শীর্ষ সব নেতা আটকে দলটি নতুন করে নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে জামায়াতকে প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ না দিতেই এমন আটক বলে দাবি করা হয়েছে জামায়াতের পক্ষ থেকে।

জানা যায়, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ভেতর ভেতর ঘর গোছানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠে জামায়াত। ধীরে ধীরে গুছিয়ে উঠার চেষ্টাও চলে দলটিতে। বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা আগামী নির্বাচনে নিজেদের মতো করে এলাকায় যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিগত নির্বাচনগুলোতে যেসব আসনে জামায়াত ভালো অবস্থান ধরে রেখেছিল, সেই আসনগুলো ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরপাকড় না হওয়ায় নেতারাও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেওয়ার আড়ালে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয় জামায়াত। বিশেষ করে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক জামায়াত নেতারা প্রায় প্রতিদিনই তাদের খবরাখবর নিচ্ছিলেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জামায়াতের ‘সম্পর্ক’ পুরনো। সেই সম্পর্ক নেতারা গড়ে তুলেছিলেন। গোয়েন্দাদের হাতে এ ধরনের নানা খবর আসতে থাকায় দলটির প্রতি কঠোর হয় সরকার। সর্বশেষ গত পরশু দলটির কেন্দ্রীয় ছয় নেতাকে উত্তরার এক বাসা থেকে আটক করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম বড় দল জামায়াত। মাঠপর্যায়ে জামায়াতের যোগাযোগ বাড়তে থাকায় মনোবল ভাঙা কর্মী-সমর্থকরা আবারও চাঙা হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে আগামী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ধীরে ধীরে জামায়াত নেতারাও মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছিলেন। শীর্ষনেতাদের আটকের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে আগের সেই ভীতিই আবার ফিরে আসে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আটক নেতাদের অধিকাংশই ফেরারি আসামি। যাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। তাছাড়া নতুন করে তারা আবার দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। এমন তথ্যের ভিত্তিতেই গোয়েন্দা নজরদারি করে তাদের আটক করা হয়।

গত দুই বছর থেকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করা থেকে বিরত রয়েছে জামায়াত। তবে ভেতর ভেতর কর্মী যোগাযোগ ঠিকই রক্ষা করছিলেন দলটির তৃর্ণমূল নেতারা। নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলে সময়মতো আবারও মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছিল দলটি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, জামায়াত প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি না দিলেও ভেতরে ভেতরে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির ছক কষছিল। চট্টগ্রামের জামায়াত নেতা সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী গত ৩ অক্টোবর দলটির আমির মকবুল আহমাদকে ৩৫ পৃষ্ঠার একটি চিঠি লেখেন। নেতাদের আটকের সময় ওই চিঠি উত্তরার বাসা থেকে জব্দ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘জামায়াতের সারা দেশের নেতাকর্মীরা ঝিমিয়ে পড়েছে। তাদের উজ্জীবিত করা দরকার।’ রাজপথে কর্মসূচি দিয়ে রাস্তায় নামতে আমিরের দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়েছে চিঠিতে। এ ছাড়া সাংগঠনিকভাবে দলটির নানা ধরনের দুর্বলতা ও আগামীর পরিকল্পনার ব্যাপারে বিশদ বর্ণনা রয়েছে শাহজাহান চৌধুরীর চিঠিতে।

উত্তরায় অভিযানের পরপরই জামায়াতের পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, দলীয় কর্মসূচি পরিচালনায় তারা দেশের আইন, সংবিধান ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে চলে। দলের আমিরের নেতৃত্বে একটি ঘরোয়া বৈঠক চলার সময় সেখান থেকে নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে দলটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতে ইসলামীকে তার ভাষায় নেতৃত্বশূন্য করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় জামায়াত নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারকে সরকারের নতুন খেলা বলে মনে করে বিএনপি। দলটির বেশ কয়েকজন নেতা বলছেন, সরকার ২০ দলীয় জোটকে আন্দোলনের মাঠে নামাতে নানা ফন্দিফিকির করছে। জামায়াতের শীর্ষনেতাদের গ্রেফতার করে দলটিকে আবারও রাজপথে নামাতেই এমন কাজ করা হয়েছে। সরকার নতুন করে বিএনপি জোটকে মাঠে নামাতে চায়। মাঠে থাকলে জ্বালাও-পোড়াওয়ের মামলা পুনরায় সচল করে নেতাদের জেলে ভরার চিন্তা করছে। ২০১৪ সালের মতো করেই আরেকটি নির্বাচনের পথে হাঁটছে সরকার। তারা কোনোভাবেই চায় না বিএনপিজোট নির্বাচনে আসুক। এজন্য সারা দেশে নেতাদের নতুন করে হয়রানি করা শুরু করেছে। সরকারের এমন ফাঁদে দলগুলো পড়বে না জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার দুর্বল হয়ে গেছ। তাদের ক্ষমতায় থাকার দিন শেষ হয়ে আসছে। তাই শেষবেলায় মরণ কামড় দেবে-এটাই স্বাভাবিক। জামায়াত নেতাদের আটকও তার একটি অংশ বলে মনে করেন তিনি।

আজ হরতাল : জামায়াতের আমির মকবুল আহমাদ, নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানসহ ছয়জনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আজ সারা দেশে হরতাল ডেকেছে জামায়াত। সকাল-সন্ধ্যা এ হরতাল পালনের আহ্বান জানান দলের নতুন ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

 রাজনীতি থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ