বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯ |

ক্যাসিনো রম্য, অপার অগম্য

অরুণ কুমার বিশ্বাস   শনিবার , ২৬ অক্টোবর ২০১৯

ক্যাসিনো কাণ্ড নিয়ে মেলা টক শো, সুইট শো হয়েছে। জ্ঞানী ও গুণীজন টিভির পর্দায় কত কী টল-টক করছেন। কেউ কেউ এমন ভাব ধরেছিলেন যে, তিনি ক্যাসিনোর আব্বা নন, দাদাঠাকুর। কোনো কোনো পাপীতাপীরা আবার ক্যাসিনোর পক্ষে সাফাই গাইবারও চেষ্টা করেছেন। পরে অবশ্য নিজের পাছার তলার মাদুরখানা হড়কে যাচ্ছে দেখে বয়ান বদলেছেন। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। মানে ঝড়ের ডিরেকশন বুঝে ছাতি ধরেছেন আর কি! এর নাম গিরগিটিবিদ্যা। যারা জানে তারা আরামসে বেশ বেঁচেবর্তে থাকে। আর যারা জানে না বা বোঝে না, তারা চিরকাল শিল-নোড়ার নিচে শুকনো লঙ্কার মতোন ঘষটাতেই থাকে।

আমি এ বিষয়ে মোটেও পণ্ডিত নই, টুকটাক রম্য লিখি, তাই জুয়াড়িদের নিয়ে কিঞ্চিত রস সৃষ্টি না করে পারছি না। বস্তুত, বিষয়টি রসালো বটে। শুরুতে বলতে হয়, বেশি লোভ আর বরাতের উপর যাদের ব্যাপক আস্থা, তারা মূলত ক্যাসিনো কাণ্ডে বিশ্বাসী। দুটো বাড়তি টাকা কামাবার লোভে চোখ বুজে মেশিনের স্লটে টাকা ঢালে। অনেকটা সেই মাছের চারে ছিপ ফেলে বসে থাকবার মতো। অ্যাংগলিং বা বড়শি দিয়ে মাছ ধরার ক্ষেত্রে অবশ্য খুব বেশি লসের সম্ভাবনা থাকে না, স্রেফ সময়টুকু ছাড়া।

যারা ক্যাসিনোপিয়াসী তারা ধরেই নেয় যে, দুবার হারলেও তিনবার জিতবো। আদতে ফল হয় উল্টো। ক্যাসিনো খেলায় ‘বিগিনার্স লাক’ বলে একটা কথা আছে। অর্থাৎ এমনভাবে খেলাখানার মুসবিদা করা হয়েছে যে, শুরুতে তুমি দু’একদান জিতবেই। এ যেন বাচ্চাদের মতো ভুলিয়েভালিয়ে খেলুড়েদের ক্যাসিনোতে ঢুকিয়ে দেয়া আর কি! পাঁচ হাজার যখন দশ হাজার হয়, তখন ন্যাচারালি লোভীরা সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। দশ থেকে আবার হয়তো পেয়ে যায় পঞ্চাশ হাজার। বিনিময়ে স্রেফ বরাতের উপর আস্থা রাখতে হয়, গায়েগতরে খাটতে হয় না। এই যে কড়কড়ে নোটের লোভে পেয়ে বসলো, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা লোভী মানুষের পক্ষে তো নয়ই, শোনা যায় মহা বুদ্ধিমানও আর ছেড়ে আসতে পারে না। তামার বিষ পেয়ে বসে অমনি। অক্টোপাসের মতোন চারদিকে শিকড়বাকড় গজিয়ে যায়, কিছুতেই আর নিজেকে ছাড়াতে পারে না।

জুয়াড়ি বলি আর যাই বলি, বহির্বিশ্বে এই জিনিস কিন্তু নিষিদ্ধ কিছু নয়। আদতে কিছু মানুষের জন্মই হয় নিঃস্ব হবার জন্যে। সর্বহারাদের হারানোর কিছু থাকে না, ওরা শেষমেশ নিজের বউঅব্দি ক্যাসিনোতে তুলে নেয়। কে নাকি শুনেছি নিজের মেয়েকেও ক্যাসিনোকাণ্ডে খুইয়েছে।

আমার এই রসরচনার উদ্দেশ্য কিন্তু জুয়াড়িদের নিছক নিন্দেমন্দ করা নয়, আবার কাউকে সাবধান করারও কোনো ইচ্ছেও আমার নেই। মানুষ সৃষ্টির ‘ছেঁড়া’ জীব। নিজেকেই তার ভালমন্দ বুঝতে দিন। আপনি আমি কোথাকার কোন হরিদাস পাল যে তারা আমাদের কথা শুনবে! একটু ভেবে দেখুন, আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু খানিকটা ক্যাসিনো বিশ্বাসী। বঙ্গদেশে এমন লোক অপ্রতুল নয়, যে বা যারা ভাগ্য বদলাতে একের পর এক বিবাহকার্য সম্পন্ন করছেন। তাদের মতে, বউভাগ্য দিয়েই নাকি সৌভাগ্যের শুভ সূচনা হয়। কী জানি, হলেও হতে পারে। কারণ বউয়ের সাথে উপরি হিসেবে শালি থাকে। আবার থাকে খাট-পালংক, ঘড়ি-বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদি যৌতুকও।


মানে কী দাঁড়ালো! শর্টকাটে ভাগ্যের শিকে যারা ছিঁড়তে চান, তারাই মূলত ক্যাসিনোতে যান। গায়েগতরে না খেটে যদি বেশুমার টাকা কামানো যায় তো তাহলে ক্যাসিনো যেতে আপত্তি কী! আবার ওটা যদি রূপকার্থে নিই তাহলে দেখবেন, আপনি আমি প্রত্যেকেই একেকজন জুয়াড়ি। চাকরি করছেন, সেখানে কি ক্যাসিনোকাণ্ড নেই! আপনার সুন্দরী কলিগ চুলের বদলে উইগ পরে এসে বসের মন জয় করে নিলেন। তারপর ধমাধম প্রমোশন। অথচ আপনি পারেননি, কারণ আপনি খেলাটা জানেন না। বসের মন ভেজানো- এও একরকম জুয়াখেলা বৈকি!

এই তো সেদিন এক মর্মান্তিক গল্প শুনলাম। আমার এক বসের বউ নাকি তার জুনিয়রের সঙ্গে ভেগেছে। জুনিয়র কাজটা ঠিক করেনি মানছি, কিন্তু বসও কি কাজটা খুব ভালো করেছেন! যে তার বউকে খুশি রাখতে পারে না সে আবার পুরুষ নাকি! এমন লোক ক্যাসিনো খেলা দূর কি বাৎ, ডাংগুলিও খেলতে পারবে না।

আপনি হয়তো বলবেন, এর পরও কি আর জুনিয়রের চাকরিটা থাকে! ব্যাটা মর্কট! থাকে মানে, আলবাত থাকে। আগের চেয়ে আরো ভালো চাকরি করছে জুনিয়র। অফিসে না গিয়েও মাসমাইনে ঢুকে যাচ্ছে তার ব্যাংকে। কী করে সম্ভব! বসের বউভাগানো ছোকরা ক্যাসিনো খেলাটা খুব মন দিয়ে শিখেছিল তাই। বসের বোধপত্তি বা যোগ্যতা না থাক, ইজ্জত বলে তো তার কিছু ছিল। ওটাকেই ‘এনক্যাশ’ করছে জুনিয়র। তার বউয়ের সঙ্গে ইন্টুপিন্টুর ছবিখানা মাঝে মাঝে বসকে ওয়াটসআপ করে। তাতেই বস সিধে। বলে, বাবা তুই আমার বউ নিয়েছিল নে, কিন্তু দয়া করে আমার পাতলুন ধরে টানিস না বাবা। তাহলে একেবারে ধনেপ্রাণে মারা যাবো যে!

এই ঘটনা থেকে দুনিয়ার তাবৎ বস কী শিখলেন? নিছক উপরি কামাই আর ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে বসে থাকবেন না, বউয়ের দিকেও একটুখানি নজর দিন। নইলে ও জিনিস অন্যের ভোগে চলে যাবে। আপনার বউ নিয়ে অপরে ক্যাসিনো খেলবে! ইদানীং দুধের বাচ্চারাও বাবা-মায়ের সাথে ক্যাসিনো খেলে। দেখবেন কিছু দুষ্টু আছে, যারা কিনা বই খোলার আগেই শর্ত জুড়ে দেয়। মিমি চকলেট না দিলে সে বই পড়বে না। ছড়া শিখবে না। একটা দিলে বলবে দুটো না দিলে ভূগোল পড়বো না। ভূগোলে বেজায় গোল বাঁধে। বলতে পারেন এ একরকম জিম্মি করা। একদল আছে যারা কি না কালোচিঠি পাঠায়, বা ব্ল্যাকমেল করে। বলে, এটা কিনে না দিলে কিন্তু পাপা এলে বলে দেবো মাম্মি খালি ফোনে কথা বলে আর হাসে। মায়ের একটা নতুন বন্ধু জুটেছে।

ব্যস, আপনি আটকে গেলেন কালোচিঠির খামে। আবার সোজাপথে চলাতেও বহুত ঝামেলা। কথায় বলে, যে গাছ সোজা উঠে যায়, সেটাই সবার আগে কাটা পড়ে। মানে হল এই, সরলসোজা লোক বিপদে পড়ে বেশি। যেকোনো ক্যাঁচালে তাকেই সবাই বলির পাঁঠা বানায়। তাই টুকটাক ক্যাসিনো জানলে ক্ষতি কী! ক্ষতি আছে বৈকি। কারণ আমরা থামতে জানি না। আমরা খেলি না, উল্টো ক্যাসিনো আমাদের খেলিয়ে নিয়ে বেড়ায়। দুই দান জিতলে টাকার লোভ আরো বাড়ে। আপনি আরো টাকা লগ্নি করেন। আর খেলাটাই এমন, শেষঅব্দি আপনাকে ন্যাংটো করে বাড়ি পাঠাবে। চাই কি, ঘরের বউটাকেও কেড়ে নেবে।

পরিশেষে একটা জোকস দিয়ে শেষ করি। কৌতুক নয়, ঘটনা সত্যি। আমেরিকার এক ভদ্রলোক নিয়মিত ক্যাসিনো জেতেন। ওটা ছিল তার নেশার মতোন। মদে তার নেশা হয় না, কিন্তু জুয়োতে হয়। হারতে হারতে একসময় তার আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু তাও তার খেলা চাই। শেষে তিনি এক অদ্ভুত বাজি ধরে বসলেন। বললেন যে, এবার হারলে তিনি আর কাউকে নিজের মুখ দেখাবেন না।

শেষে কী হল! তিনি সেবারেও হারলেন। ফলে তার আর কাউকে মুখ দেখানোর জো রইলো না। কিন্তু বাসাবাড়ি বা রাস্তায় নামলে কেউ না কেউ তার মুখ তো দেখবেই। শেষে তিনি বাজির শর্ত অনুসারে অদ্ভুত এক কাজ করে বসলেন। নিজের ঘরের নিচে এক বড়সড় গর্ত খুঁড়লেন। সেখানেই তিনি বাকি জীবন কাটিয়ে দিলেন। সবাই ভাবলো তিনি মারা গেছেন। কেউ আর তার খোঁজ নিল না। অর্থাৎ ক্যাসিনো মানুষকে শুধু নিঃস্ব করে না, গর্তজীবীও বানায়।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অতিরিক্ত কমিশনার, বাংলাদেশ কাস্টমস ।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ