বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯ |

অনন্য প্লাস্টিক: জঘন্য প্লাস্টিক!

শেখ আনোয়ার   রবিবার , ২৭ অক্টোবর ২০১৯

আধুনিক যুগ প্লাস্টিকের যুগ। বিভিন্ন রকম প্লাস্টিকের প্যাকেট, ব্যাগ, বোতল, বালতি, ক্যান, কাপ, মগ, গ্লাস, স্ট্র ইত্যাদি নানান ধরণের নিত্য ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। শুধু তাই নয়। পানির ট্যাঙ্ক, দরজা, চেয়ার, টেবিলসহ ঘর সাজাতে প্লাস্টিকের রমরমা সমাহার। সুবিধাও অনেক। দামে সস্তা, ওজনে হাল্কা, মজবুত এবং পানিতে নষ্ট হয় না। রং মিশিয়ে যেমন খুশি তেমন আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়। প্লাস্টিক পণ্য তাই এ যুগে অনন্য। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্লাস্টিক রূপান্তরিত হয়েছে নানান ডিজিটাল গ্যাজেট পণ্য।

প্লাস্টিক পণ্য, দূষণে জঘন্য!


একথা কে না জানে যে, প্লাস্টিকের পঁচাত্তর শতাংশেরও বেশি বর্জ্য হিসেবে পরিত্যক্ত হয়। পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জলবায়ু, আকাশ-বাতাস, নদ-নদী, সাগর-মহাসাগরসহ গোটা বিশ্ব প্রকৃতিকে দূষিত করে তুলছে। বিলিয়ন বিলিয়ন টন প্লাস্টিক সাগরে পড়ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মুখে, প্রসঙ্গ তাই একটাই ‘প্লাস্টিক দূষণ’। জঘন্য এই দূষণে ডুবে যাচ্ছে বিশ্বের মানব সভ্যতা। প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে তাই বড়ই চিন্তিত মানুষ। কারণ, এই দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করা সত্ত্বেও বেড়ে গেছে প্লাস্টিকের ব্যবহার।

থেমে নেই প্লাস্টিকের ব্যবহার

বিগত ৫০ বছর ধরে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার হলেও বিগত দু’দশকে যত প্লাস্টিক তৈরি হয়েছে, আগে আর কখনো হয়নি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ভাষ্য- ‘১৯৫০ সালে প্লাস্টিক উৎপন্ন হয় দুই মিলিয়ন টন। ২০১৭ সালে তা ৮.৩ বিলিয়ন টন এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে উৎপাদন ৩৫ বিলিয়ন টনে গিয়ে দাঁড়াবে। যার ওজন চার লাখ আইফেল টাওয়ারের ওজনের সমান। এর মধ্যে ছয় বিলিয়ন টন বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া হবে।’ দ্য ওয়ার্ল্ড ওয়াচ ইনস্টিটিউট’র সাম্প্রতিক এক তথ্যমতে- ‘২০০৮ সালে গোটা বিশ্বে প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয় ২৬ কোটি টন। বিশ্বে প্রতিবছর মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয় ৬০ কেজি। উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোতে প্রতিবছর মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ১শ’ কেজিরও বেশি।’ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রকাশিত গবেষণা তথ্যমতে- ‘প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় মাথাপিছু ৮ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার মাথাপিছু সাড়ে ১৭ কেজি। দেশে ২০১৪ সালে প্লাস্টিকের এই ব্যবহার ছিলো মাথাপিছু সাড়ে ৫ কেজি। কে না জানে, প্লাস্টিকের ব্যবহার যতো বেশি হবে, বর্জ্যরে পরিমাণও ততো হবে বাড় বাড়ন্ত। যে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ২০১৫ সালে ছিলো ৬.৩ বিলিয়ন টন এবং ২০৫০ সালে এটা হবে ১২ বিলিয়ন টন। ভাবা যায়? সমস্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। প্লাস্টিক আজ মানুষের গলার কাঁটা হয়ে পড়েছে। সে কাঁটা উপড়ে না ফেললে আমরা বাঁচবো কি করে? সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী করা হচ্ছে প্লাস্টিককে। তাই এ নিয়ে ভাবতে হবে সবাইকে। তার আগে জেনে নেয়া যাক প্লাস্টিক কি?

প্লাস্টিক কি?


প্লাস্টিক মানে বিষ। প্লাস্টিক উৎপন্ন হয় কার্বনের পলিমার যৌগ দিয়ে। কার্বনের পলিমার যৌগগুলো পলিথিন, পলিস্টাইরিন, পলিপ্রপিলিন ইত্যাদি নামে পরিচিত। কে না জানে, সাধারণ যেকোনো জিনিস খোলা পরিবেশে রেখে দিলে কিছুদিনের মধ্যে এর পচন ধরে। পচনের এই কাজটা করে অণুজীব। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় প্রকৃতিতে থাকা সব ধরণের পদার্থকেই ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত করতে পারে এই অণুজীব। কিন্তু প্লাস্টিকের মতো পদার্থকে ভাঙা অণুজীবের বাপেরও সাধ্যি নেই। তাই একে ‘অপচ্য পদার্থ’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। প্লাস্টিক এমন এক অপচনশীল রাসায়নিক পদার্থ যা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা নবায়ন করা গেলেও প্রচুর সময় ও খরচ লেগে যায়। বিষাক্ত কার্বনের এই পলিমার যৌগ কখনো জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশতে পারে না। তাই প্রকৃতিতে জমা হওয়া এই প্লাস্টিক বছরের পর বছর অবিকৃত থেকে পরিবেশকে বহুভাবে দূষিত করে। যেমন, মাটির নীচে প্লাস্টিকের কারণে বৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে ঢুকতে বাঁধা পায়। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ভান্ডার পূর্ণ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। মাটির ফসল উৎপাদন ক্ষমতার ব্যাঘাত ঘটে। গাছপালা, ফল-ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এক কথায়, মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা, বায়ু চলাচল ক্ষমতা, সংশক্তি-আসক্তি, আয়ন বিনিময় ক্ষমতা ইত্যাদি পরিবর্তন ঘটিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নস্ট করছে এই প্লাস্টিক।

খাবারে ঢুকছে প্লাস্টিক কণা

শহর অঞ্চলের নিকটবর্তী নিম্নাঞ্চল ভূমিতে প্রায় দেখা মেলে ছোট বড় পলিথিন টুকরো আর প্লাস্টিকের কণার পাহাড়। অনেকদিন এভাবে পড়ে থেকে পরিবেশগত তাপ, চাপসহ অন্যান্য কারণে বড় আকারের প্লাস্টিক ক্রমান্বয়ে পরিণত হচ্ছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায়। এসব অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক। পাঁচ মিলিমিটার কিংবা তারও ছোট আয়তনের এসব ছোট প্লাস্টিক কণা খালি চোখে দেখা যায় না। কণাগুলো আবহাওয়া প্রভাবিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদে ছোট ছোট টুকরো হয়ে বাতাসে বা পানিতে মিশে। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়ায় মানুষের শরীরে প্লাস্টিকের কণার প্রভাব নিরূপণে গবেষণায় সংগৃহিত মাছের নমুনায় ৮৫ শতাংশ তেলাপিয়া মাছে প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এভাবে প্লাস্টিক কণা খাবারেও ঢুকে পড়ছে। মানুষের পানযোগ্য পানিতেও প্লাস্টিক কণা পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় জলবায়ুতে এই প্লাস্টিক কণা দূষিত করায়, যুক্তরাজ্য সরকার ইতোমধ্যে ১৫ বিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগ বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

শুধু কি তাই?


ইউরোপে ট্যাপের পানিতে ৭২ শতাংশ প্লাস্টিক কণার হদিস পাওয়া গেছে। সেখানে গড়ে প্রতি লিটার পানিতে দু’টো করে প্লাস্টিক কণা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মতে- বছরে ৯ আউন্স ওজনের এক লাখ ২০ হাজার প্লাস্টিক কণা অনবরত খাচ্ছে মানুষ। এই প্লাস্টিক কণার উৎস পানি (বোতলজাত ও ট্যাপ), চিংড়ি-কাঁকড়া-কাছিম জাতীয় মাছ, বিয়ার ও লবণ। গবেষকদের মতে, এসব প্লাস্টিক কণা যেসব রাসায়নিক পদার্থ বহন করে, তা মানুষের প্রজনন ক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং জেনেটিক পরিবর্তন ও ক্যান্সার রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। বর্তমান সময়ের আ্যালার্জি, হাঁপানি, চর্মরোগ, কিডনি রোগ, থাইরয়েডের অতিরিক্ত হরমোন ক্ষরণ, এবং ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ নানান জটিল রোগের জন্য এই প্লাস্টিককে দায়ী করা হয়। এভাবে প্লাস্টিক দূষণের প্রভাবে উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষক ড. থাডা প্লানিসামি বলেন, ‘অতি সম্প্রতি এ নিয়ে মানুষের সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে। অচিরেই হয়তো এর সমাধানও খুঁজে পাওয়া যাবে।’

প্লাস্টিক বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ


বাংলাদেশে বেশি লাভের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা পলিব্যাগ তৈরি করতে নিম্নমানের রাসায়নিক দ্রব্য ও ক্ষতিকর রং যেমন: ক্যাডমিয়াম, লেড, টাইটেনিয়াম, থ্যালেট, ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার ইত্যাদি ব্যবহার করে। বাংলাদেশে কসমেটিকসসহ গৃহস্থালি এবং বাণিজ্যিক কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেশি হয়। শহরাঞ্চলগুলোতে বছরে সাড়ে ৮ লাখ টন পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পলিথিন উৎপন্ন হয়। মানুষের অসচেতনতার কারণে এসব পরিত্যক্ত পলিথিনের শেষ ঠাঁই হয় পুকুর, নর্দমা, খাল-বিল, নদী-নালা প্রভৃতি স্থানে। বছরে ২ লাখ ৮ হাজার টন প্লাস্টিক নদ-নদীর পাড়ে ও উপকুলীয় এলাকার আশপাশে পুঁতে ফেলা হয়। ফলে অপচনশীল প্লাস্টিক মাটিতে থেকে যায় বছরের পর বছর। গবেষণা মতে, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরাঞ্চলের ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ প্লাস্টিক অব্যবস্থাপনা। বর্ষায় প্রবল বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত পলিব্যাগ, প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল শহরের পানি নিষ্কাষণ পাইপ, ড্রেন ইত্যাদির মধ্যে নিরবিচ্ছিন্ন পানি সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

আর হ্যাঁ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষায় প্রবাহিত পানিতে থাকা প্রচুর পরিমাণে ভাসমান প্লাস্টিক, পলিব্যাগ, জুসের বোতল নদ-নদীর দু’পাড়ে আটকা পড়ে স্থানীয় পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। নদীগুলোতে জেলেদের জালে উঠে আসছে টন টন প্লাস্টিক। যা পরবর্তীতে পরিবেশ তথা প্রাণিজগতের জন্য ডেকে আনে মহাবিপর্যয়। যেমন, প্লাঙ্কটন সাইজের এই প্লাস্টিক কণাকে জলজ প্রাণী প্রায়ই খাদ্য মনে করে ভুল করে গিলে খায়। জলজ প্রাণী এসব খাবার হজম করতে না পেরে মারা যায়। সেসব মৃত, রোগাক্রান্ত জীবিত মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ে খাদ্য চক্রের আবর্তে আবার মানুষের পেটে চলে যায়। এভাবে নদী ও সাগরে ফেলে দেয়া টুকরো টুকরো প্লাস্টিক কণা মাছের খাবারের মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশের আশঙ্কা দিন দিন প্রবলতর হচ্ছে। ইতালিতে সাগরের পানিতে ভাসমান রাশি রাশি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান ও পলিব্যাগ, খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে শত শত ডলফিন ও কচ্ছপ মারা গেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লীতে গরু মারা গেছে পলিথিন খেয়ে। মৃত গরুর পেট থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৬৭ কেজি পলিব্যাগ। তাই ‘অ্যালেন ম্যাক আর্থার ফাউন্ডেশন’ ঠিকই আশংকা করেছে: ‘২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি হবে।’ পরিসংখ্যান মতে, প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে মৎস্য ও পর্যটন খাতে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার তিন শ’ কোটি ডলার।

প্লাস্টিক ছাড়া আর আছে কী?

প্লাস্টিকের ভয়াবহ দূষণ থেকে রক্ষা পেতে বিজ্ঞানীরা বিকল্প প্লাস্টিকের সন্ধান করছেন। বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যাগের পরিবর্তে পচনশীল পাটের ব্যাপক প্রচলনের চেষ্টা চলছে। এছাড়াও অতি সম্প্রতি সন্ধান মিলেছে প্লাস্টিকের বিকল্প জৈব প্লাস্টিক। খাদ্য-দ্রব্যের বাদ দেওয়া, পরিত্যক্ত ফেলে দেয়া অংশ থেকে জীবাণুর সাহায্যে বিয়োজিত করে, মাটিতে ও পরিবেশে মিশে যাওয়ার উপযুক্ত জৈব প্লাস্টিক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে হনলুলুর হাওয়াই ন্যাচারাল এনার্জি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী জেন ইউ। এছাড়া জিন প্রযুক্তির সাহায্যে এমন এক উদ্ভিদ জন্ম দেয়া হয়েছে যা থেকে পাওয়া যাবে এক বিশেষ ধরণের পলিমার। এই পলিমারকে উত্তাপের সাহায্যে গলিয়ে তৈরি করা হবে প্লাস্টিক। এটাই জৈব প্লাস্টিক। এই জৈব প্লাস্টিক পরিবেশ দূষিত করবে না। কাগজের মতোই পরিবেশের সঙ্গে খাপে খাপে মিশে যাবে। সেদিন বেশি দূরে নয়। যেদিন মানুষ সত্যিই দুষণমুক্ত এই প্লাস্টিক-পলিথিন ব্যবহার করতে পারবে। তবে তার আগে ভাবতে হবে এখন কী উপায়?

প্লাস্টিক নবায়ন কৌশল

ডিজিটাল যুগে প্লাস্টিক দূষণ থেকে পরিত্রাণে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পচনশীল এবং অপচনশীল দ্রব্য আলাদা করার অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বড়ই আশার কথা। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার প্লাস্টিক দূষণ সমস্যা নিয়ে সক্রিয়। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নানাবিধ কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়ে এরই মধ্যে জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘ত্রি আর’ (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল) কৌশল গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পুনর্নবীকরণ বা নবায়নে কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পুনর্নবীকরণ কাজ বড়ই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ কাজের জন্য সংগৃহীত প্লাস্টিক থেকে দূষিত পদার্থ শরীরে আসতে পারে। আবার পুনরায় ব্যবহারেও দূষণের সম্ভাবনা রয়ে যায়। কারণ, পুনর্নবীকরণে প্লাস্টিক গলানো হয়। গলানোর সময় ডায়াসিন, নাইট্রোবেঞ্জিন ইত্যাদি বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই গ্যাস কারখানার শ্রমিক ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আবার পোড়ালেও বিপদ কম নয়। পোড়ানোর ফলে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত জৈব ও অজৈব গ্যাস উৎপন্ন হয়। এ সময় পরিবেশ দূষণকারী ডাই অক্সিজেন, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, সিএফসি, সিডিএফ, সিডিডি ইত্যাদি মারাত্মক গ্যাসীয় যৌগ প্রচুর পরিমাণে বের হয়। মানুষের শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য এগুলোর যেকোন একটাই যথেষ্ট।

প্লাস্টিক দূষণ রোধে রোল মডেল বাংলাদেশ


বড়ই গর্বের বিষয়, বিশ্বে বাংলাদেশই প্রথম দেশ। যে দেশটা পরিবেশ দূষণ রোধে সবার আগে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করে রোল মডেল হিসেবে বিশ্বে অনুকরণীয়। প্লাস্টিক দূষণ থেকে পরিত্রাণে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (২০০২ সালের সংশোধিত) ৬ এর (ক) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে যে কোন প্রকার প্লাস্টিক, পলিথিন, শপিং ব্যাগ, বা পলিইথাইলিন বা পলিপ্রপাইলিনের তৈরি (অন্যকোন সামগ্রী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলে এরূপ) সামগ্রীর উৎপাদন, আমদানি বাজারজাত বা বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। দেখাদেখি পৃথিবীর অন্য অনেক দেশ অতি সম্প্রতি প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদাহরণত: মরক্কো ২০১৬ সালে ও কেনিয়া ২০১৭ সালে প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ভারতে প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ, প্লাস্টিকের বাসনপত্র, থার্মোকলের ডিশ-কাঁটা-চামচ, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অফিসে প্লাস্টিকের ফুল, ফোল্ডার, পানির বোতল, ব্যানার, প্লাস্টিকের টব ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ জারি করা হয়েছে এ বছর ২ অক্টোবর ২০১৯। মাত্র ক’দিন আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নেয় যে, ২০২১ সালের মধ্যে প্লাস্টিকের স্ট্র, চামচ, ছুরি, কটন বাড এসব নিষিদ্ধ করা হবে। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘ আহ্বান জানায়, পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে সব দেশেই প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিক দূষণ মুক্ত করতে এখন অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে উঠেছে। তারা তাদের কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বকে প্লাস্টিকমুক্ত করতে প্রচেষ্টা শুরু করেছে।

প্লাস্টিকমুক্ত বিশ্ব চাই

প্লাস্টিক আজ বিশ্ব জলবায়ু সংকটের প্রধান কারণ। প্লাস্টিক পণ্য যতই সস্তা, সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় হোক না কেন এর ব্যবহার কমাতে হবে। শিল্প-কারখানায় প্লাস্টিক ব্যবহার চরমভাবে নিরুৎসাহিত করতে আইনের সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। এছাড়া পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধী জৈব-পচনশীল পাটজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে পাটের উৎপাদনের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানোর জন্য ধান, চালসহ কয়েকটি পণ্য প্যাকেজিংয়ে পাটজাত সামগ্রী ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমান সরকারের প্লাস্টিকবিরোধী কৌশলগত পলিকল্পনার কারণে, প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সরকার, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গ, পেশাজীবি, মিডিয়া, এনজিও ও সুশীল সমাজের ঐক্যমত্য অংশ গ্রহণে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। তাই প্লাস্টিক নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের গণসচেতনতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। তবে শুধু আমাদের সচেতন হলেই চলবে না, বৈশ্বিকভাবেই এই সচেতনতা বাড়ানো জরুরী। তা না হলে এই দূষণ মানবজাতির জন্য বয়ে আনবে অনিবার্য মহাপ্রলয়। - লেখক : সাংবাদিক

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ