বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯ |

মুছবে তো বিসিবি-ক্রিকেটার দ্বন্দ্বের রেখা?

অঘোর মন্ডল   রবিবার , ২৭ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ক্রিকেটারদের ধর্মঘট নতুন কিছু নয়। তবে এবারের আন্দোলন-ধর্মঘট যেভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে ক্রিকেট বোর্ডকে; দেশজ ক্রিকেট ইতিহাসে সেটা বেনজির। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। পেশাদার ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক সংস্থা- ফিকার দ্রুত বিবৃতি, সব মিলিয়ে নড়েজড়ে ওঠে ক্রিকেটবিশ্ব। শেষপর্যন্ত বোর্ডকর্তারা গেলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। ক্রিকেটাররা ১১ দফা দাবি বাড়িয়ে ১৩ দফা তুলে ধরলেন আবার গণমাধ্যমে। সেটাও পেশাদার আইনজীবীকে তাদের মুখপাত্র বানিয়ে। কিন্তু তারপর হেমন্তে জমা ক্রিকেটাঙ্গনের বরফ গলতে সময় লাগল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। স্বস্তি ফিরল দেশের ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ মানুষের মনে।

কিন্তু অস্বস্তির কোনো কাঁটা কি থেকে গেল ক্রিকেটার আর বোর্ডকর্তাদের মনে? স্যাটেলাইট টেলিভিশনের পর্দায় বিসিবি-ক্রিকেটারদের আলোচনাসভা শেষে যে দৃশ্য দেখা গেল; সাদাচোখে মনে হচ্ছে সবই তো ঠিকঠাক হয়ে গেছে। কিন্তু বিসিবি সভাপতি আর বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের শারীরিক ভাষা এবং অভিব্যক্তির মাঝে সংশয়ের একটা খচখচানি থেকে যায়। কারণ সাকিবের শেষ বাক্যটা ‘সবকিছু বাস্তবায়ন হলে আমরা সবাই খুশি হব’।


সংশয় কি তা হলে বাংলাদেশ অধিনায়কের মনেও! সাংবাদিকের মনে হাজার প্রশ্ন জাগতে পারে, তার পেশাদারিত্বের কারণে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে কোনো প্রশ্ন না থাকলেই ভালো। কিন্তু ড্রয়িংরুম থেকে রেস্তোরাঁ, রাজৈনিতক অঙ্গন থেকে ক্রীড়াঙ্গন, বাংলাদেশ থেকে বহির্বিশ্ব; সব জায়গায় এখনও একটা প্রশ্ন, সব ঠিক হয়ে গেছে তো!

দৃশ্যত ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু আন্দোলনের সময় বিসিবি সভাপতি যেভাবে হুংকার দিয়েছেন, পরে আবার বেশি নরম সুরে অনেক উদারভারে দাবি মেনে নেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন- তাতে একটা সন্দেহ থেকে যায়, সত্যি কি সব ঠিক হয়ে গেছে? ক্রিকেটার আর বিসিবি কর্তাদের মাঝে সব দূরত্ব মুছে গেছে রুদ্ধদ্বার বৈঠকেই! আমরা মনে করতে চাই সেটাই। মুছে গেছে সব দূরত্ব। মুছে যাওয়া উচিত। সেটা দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে। কারণ ক্রিকেট না থাকলে ক্রিকেট বোর্ডের কোনো দরকার পড়বে না। আবার ক্রিকেট বোর্ড না থাকলে ক্রিকেট প্রশাসন চালাবেন কারা? ক্রিকেটাররা নিজেদের দাবি-দাওয়ার কথাই বা জানাবেন কার কাছে?

তবে ক্রিকেটার আব ক্রিকেট বোর্ডকর্তাদের মাঝে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে কোনো কিছুই ঠিক থাকে না। আমাদের সমাজে ‘স্বার্থ-দ্বন্দ্ব’ বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বলে কোনো কিছু আছে বলে মনে করতেই চান না কেউ। সমাজ-রাষ্ট্র সব জায়গায় স্বার্থ-দ্বন্দ্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলতে চান সবাই। সেখানে ক্রিকেটে স্বার্থ-দ্বন্দ্ব থাকবে না সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে বোর্ড সভাপতি বিষয়টা একেবারে অস্বীকার করেছেন তাও মনে হলো না। অন্তত তার প্রথম দিনের ম্যারাথন সংবাদ ব্রিফিংয়ে।

স্বার্থ-দ্বন্দ্ব, কিংবা ক্রিকেটার-বিসিবি দ্বন্দ্ব বিষয়টাকে আমরা হয়তো একটু অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছি। যে কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম; সব জায়গায় একটা রিংটোনের মতো বেজে চলেছে। ভারত সফরে পারফরম্যান্স খারাপ হলেই একহাত নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন বোর্ডকর্তারা। কারণ এদেশের মানুষকে আবেগের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে বলা যাবে দেখলেন তো ‘ওরা নিজেদের টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না! ওদের সবকিছু মেনে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের একটা দাবি ভালো পারফরম্যান্স। সেটাই তারা করে দেখাতে পারলেন না। তার মূল কারণ, সিরিজের আগে ওদের আন্দোলন!’ মানুষও ভাবতে শুরু করবে তাই তো। ওদের সবকিছু মেনে নেয়া হলো। কিন্তু পারফরম্যান্স কোথায়?

তার আগে গোটা দুয়েক বিষয় ভেবে দেখা উচিত। ভারতের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা কী হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়। আর সেখানে বাংলাদেশ। যারা আন্দোলনের আগে নিজেদের দেশেই তিন টেস্ট খেলা আফগানিস্তানের বিপক্ষে হেরেছে। এ বছর টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের টেস্ট পারফরম্যান্সও মোটেও ভালো ছিল না। তাই ভারত সফরে গিয়ে বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু করবে চ্যাম্পিয়নের মতো, সেটা আশা করা বাড়াবাড়ি। আর টি-টোয়েন্টিতে কবেই বা ভালো করেছে বাংলাদেশ?

করেনি। তবে করবে না; সেটাই বা ভাবছি কেন? ক্রিকেটারদের আন্দোলনে বিসিবি আর ক্রিকেটাররা মুখোমুখি দাঁড়ানোর কারণে! ইতিহাসের কাছে না গেলেও ফিরে যেতে হচ্ছে এক ইতিহাসবিদের কাছে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ টয়েনবি বলেছেন, ‘ইতিহাসে দ্বন্দ্ব থেকেই প্রগতি আসে। কারণ দ্বন্দ্ব থেকে আসে চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ থাকলে জবাব দিতে হয়।‘

ভারত সফর সত্যি-ই ক্রিকেটারদের জন্য একটু নতুন চ্যালেঞ্জ। ভারতের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজ (কোনো ওয়ানডে নেই)। সেটা আন্দোলন-ধর্মঘট না করলেও ক্রিকেটারদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আর বিসিবির জন্য চ্যালেঞ্জ- ক্রিকেটারদের দাবিগুলো যে মেনে নেয়া হয়েছে, সেটা দৃশ্যমান করা। শুধু টাকা বাড়ানো তাদের দাবি ছিল না। বাকি দাবিগুলো মেনে নেয়া হয়েছে, সেটা কিন্তু আপাতত অলিখিত প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি লিখিত হলে বোর্ডকর্তা এবং ক্রিকেটারদের মধ্যে আর কোনো দ্বন্দ্ব খোঁজার সুযোগ পেতেন না সমালোচকরা।

তবে দ্বন্দের রেখা মুছে যাক সবার মন থেকে। কারণ ক্রিাকেটার, বিসিবি কর্মকর্তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দেশজ ক্রিকেটের উন্নতি হবে না।

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ