বুধবার , ১৩ নভেম্বর ২০১৯ |

জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নজর হাইড্রোজেনে

অনলাইন ডেস্ক   সোমবার , ২৮ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ বর্জ্য জমে, সেখান থেকে ১৮.২২ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা, যার আর্থিক মূল্য হতে পারে ৫৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

আর সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রামে গত দুই বছর ধরে কাজ করে চলেছেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের হাইড্রোজেন এনার্জি ল্যাবের বিজ্ঞানীরা। প্রকল্প পরিচালক আব্দুস সালাম বলছেন, বাংলাদেশের তিনটি বড় সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে এই হাইড্রোজেন এনার্জির মধ্যে।

প্রথমত, বাণিজ্যিক উৎপাদন সফল হলে মিথেন বা এলএনজির বিকল্প হিসেবে যানবাহন, বাসাবাড়ি ও কারখানায় হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করা যাবে, উৎপাদন করা যাবে বিদ্যুৎ। তাতে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে একটি ভালো বিকল্প হাতে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশকে এখন ৬১ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, সেই খরচ অনেকটা কমিয়ে আনা যাবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি বর্জ্য জমে, যা নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগকে হিমশিম খেতে হয়। সেই বর্জ্যকেই কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি হবে হাইড্রোজেন গ্যাস।

আর তৃতীয় বিষয়টি হল দূষণ রোধ। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে প্রতি বছর বায়ু দূষণের কারণে পুরো বিশ্বে যে ক্ষতি হয়, তার অর্থমূল্য ২.৪২ বিলিয়ন ডলারের মত। জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে হাইড্রোজেন গ্যাসের ব্যবহার বাড়লে দূষণের সেই ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব।

ওয়ার্ল্ড হাইড্রোজেন কাউন্সিল বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে জ্বালানি চাহিদার ২০ শতাংশ পূরণ হতে পারে হাইড্রোজেন গ্যাস থেকে। দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, জাপান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশগুলো দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে কাজ শুরু করেছে আগেই। আর বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি গ্রহণ করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ২০১৭ সালে, হাইড্রোজেন এনার্জি ল্যাব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই পাইলট প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামে ১৪ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর হাইড্রোজেন গবেষণাগার ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে হচ্ছে হাইড্রোজেন পাওয়ার প্ল্যান্ট। ২০২০ সালের জুনে প্রাথমিকভাবে উৎপাদনে যাবে হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট। শুরুতে প্রতিদিন ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রকল্প পরিচালক আব্দুস সালাম বলছেন, প্রাথমিকভাবে ওই বিদ্যুৎ দিয়ে তারা প্রকল্পের চাহিদা মেটাবেন। তারপর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহারে বাণিজ্যিক সফলতা পেলে এটা ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্প হতে পারে বলেও আভাস দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান।

তিনি বলেন, “সারা পৃথিবী এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জন্য বিকল্প উৎস খুঁজছে। আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? পাইলট প্রকল্প হিসেবে আমরা হাইড্রোজেন গবেষণা শুরু করছি। ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির কথা চিন্তা করে বাংলাদেশেও আমরা নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও আত্মীকরণ করব।”

যেভাবে উৎপাদন হবে

বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি বর্জ্য উৎপাদন হয়। সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খেতে হয় স্থানীয় সরকার বিভাগকে। পলিথিনের ব্যবহারও নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে পরিবেশবিদদের।

হাইড্রোজেন ল্যাবের বিজ্ঞানীরা বলছেন, পলি বর্জ্য, গৃহস্থালী বর্জ্য বা পড়ে থাকা গাছের ডাল, লতাপাতা আর প্রাকৃতিক পানি থেকেই হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্ভব। এই ল্যাবে শহরবাসীর বর্জ্য বা বায়োমাস থেকে গ্যাসিফিকেশনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহ করা পানির ফটোক্যাটালাইসিসের মাধ্যমে গ্যাসীয় ও তরল হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদন করা হবে।

প্রকল্প পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, এক কেজি হাইড্রোজেন উৎপাদনে সর্বোচ্চ খরচ পড়বে সাড়ে ৩ ইউএস ডলারের মত। সে হিসেবে ১৮.২২ মিলিয়ন মেট্রিকটন হাইড্রোজেনের উৎপাদন খরচ হয় ৬৩৭ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা।

“বিশ্বের এনার্জি কনজাম্পশনে আমরা দেখতে পাই, ১৯৭৪ সালে ফসিল ফুয়েলের চাহিদা ছিল খুব বেশি। ২০৭৪ সালে তা একেবারেই কমে যাবে, বাড়বে হাইড্রোজেনের চাহিদা।”

আব্দুস সালাম জানান, প্রতি কেজি বর্জ্য বা বায়োমাস থেকে ০.০৮ কেজি হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদন সম্ভব। তাতে প্রতি কেজি হাইড্রোজেনের (গ্যাস বা তরল) উৎপাদন খরচ পড়বে সাড়ে ৩ ডলারের মত। আর প্রতি লিটার পানি থেকে ফটোক্যাটালাইসিস প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করা যাবে ০.১০ কেজি হাইড্রোজেন। তাতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়বে ২ থেকে ৮ ডলার।

চট্টগ্রামের হাইড্রোজেন ল্যাবে এখন পরীক্ষামূলকভাবে উড চিপস বা পড়ে থাকা গাছের ডাল ও কাণ্ড পুড়িয়ে হাইড্রোজেন উৎপাদন শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে উপজাত হিসেবে যে অক্সিজেন পাওয়া যাবে, তাও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে।

 হাইড্রোজেন কেন ভালো ?

পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে এখন ৬১ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকার পরিশোধিত, অপরিশোধিত ও লুব বেইজড অয়েল আমদানি করতে হয়।

যার ৪৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ব্যবহার করছে যানবাহন, ২৬ দশমিক ৯২ শতাংশ ব্যবহার করছে শিল্প কারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। আব্দুস সালাম বলেন, “হাইড্রোজেন জ্বালানির ব্যবহার শুরু হলে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে ক্রমেই। দাম কিছুটা বেশি হলেও হাইড্রোজেন জ্বালানি তিন গুণ বেশি সার্ভিস দেবে।”

কীভাবে তা হবে? ল্যাবের গবেষকরা বলছেন, প্রতি কেজি ডিজেল পুড়িয়ে পাওয়া যায় ৪৪ মেগাজুল শক্তি, আর মিথেন (প্রাকৃতিক গ্যাস) পুড়িয়ে পাওয়া যায় ৫৫ কিলোজুল। সেখানে হাইড্রোজেন ব্যবহারে প্রতি কেজিতে ১৪২ কিলোজুল শক্তি পাওয়া সম্ভব।

যেখানে ১ কেজি পেট্রোল ব্যবহার করে একটি গাড়ি যেখানে ১৬ কিলোমিটার চলে, সেখানে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল কার ১ কেজি হাইড্রোজেন দিয়ে চলতে পারে ১০০ থেকে ১৩১ কিলোমিটার।

সাধারণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে তেল পুড়িয়ে যে তাপ পাওয়া যায়, তার ৬০ শতাংশ পরিবেশে পরিবাহিত হয়, বাকি ৪০ শতাংশ থেকে উৎপাদন হয় বিদ্যুৎ। আর হাইড্রোজেন এনার্জি প্ল্যান্টে মাত্র ২০ শতাংশ তাপ বাইরে পরিবাহিত হবে। বাকিটা কাজে লাগবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

আব্দুস সালাম জানান, যানবাহনের প্রচলিত সিলিন্ডার ট্যাংক দিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করা যাবে না, ম্যাগনেশিয়ামের স্তরযুক্ত আলাদা ধরনের ট্যাংক লাগবে। তবে সেটার দাম প্রচলিত সিলিন্ডারের চেয়ে খুব বেশি হবে না। ট্যাংকের গাস থেকে শক্তি উৎপাদন করবে ফুয়েল সেল। আর তা যান্ত্রিক শক্তি হিসেবে চালাবে গাড়ি।

যানবাহনে হাইড্রোজেন রিফিলের জন্য এখনই আলাদা স্টেশন লাগবে না। এখনকার সিএনজি স্টেশনগুলোই আলাদা একটি ইউনিট বসিয়ে কাজ চালানো যাবে। পরে বড় আকারে বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হলে আলাদা স্টেশন স্থাপনের কথাও ভাবা যাবে।

আব্দুস সালাম বলেন, “২০৭৪ সালে যখন বিশ্বে কয়লার মজুদ একদম ফুরিয়ে আসবে, তখন হাইড্রোজেন জ্বালানির বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া অন্যান্য গ্যাসের তুলনায় হাইড্রোজেন পরিবেশসম্মত ও নিরাপদ। সিএনজি ব্যবহার করলে বিস্ফোরণের যতটা আশঙ্কা থাকে, হাইড্রোজেন গ্যাস বা জ্বালানিতে সে শঙ্কা অনেকটাই কম।”

হাইড্রোজেন গ্যাস কতটা চাপে সিলিন্ডারে রিফিল করা হবে, সে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে। ইতোমধ্যে মেটাল ট্যাংকও বাজারে এসেছে। এ ধরনের ট্যাংকে করেই বাসা-বাড়িতে তরল হাইড্রোজেন গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। সেই গ্যাসে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে তৈরি হবে শক্তি। সেই শক্তি যাবে সার্কিট ব্রেকারে। তখন তা মেটাবে বাড়ির বিদ্যুতের চাহিদা।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, “ক্রেতা বা গ্রাহক যখন ট্যাংক বা সিলিন্ডার নেবেন, তখন প্রেসার কতটুকু রাখতে হবে সে বিষয়ে বলে দেওয়া হবে। সেফটি মেজারস নিয়ে আমরা আরও গবেষণা করছি। কিছুটা সফলতাও পেয়েছি। বাকিটা পরে জানাব।”

হাইড্রোজেনেই ভবিষ্যত?

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের অর্থ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ শওকত আলী বলেন, হাইড্রোজেন ল্যাব স্থাপনের মূল উদ্দেশ্যই হল, জাতীয় গ্রিডে যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়, সেই পর্যায়ে পৌঁছানো।

“উন্নত দেশগুলো ফসিল জ্বালানি থেকে সরে গিয়ে এখন নতুন সব প্রযুক্তির কথা ভাবছে। ভবিষ্যতে আমরা সাশ্রয়ী উৎপাদনের কথা ভাবছি। কার্বন নিঃসরণ নিয়ে গোটা বিশ্বে এখন আলোচনা। এই হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট আমাদের বিকল্প জ্বালানি দেবে। একইসঙ্গে তা পরিবেশ বিপর্যয়ের আর্থিক ক্ষতি থেকেও বাঁচাবে, বাঁচাবে জ্বালানি খরচ।”

সরকারের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ২.৯০ শতাংশ পূরণ হয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। এটাকে ১০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিকল্প জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন ব্যবহার করা গেলে চাপ কমবে কয়লার ওপর। উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে আমাদের দক্ষিণে কখনও কখনও ভোল্টেজ কমিয়ে দিতে হয়। যদি সেখানে হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করে আমরা বিদ্যুৎ দিতে পারি, তবে সেটা আমাদের জন্যই ভালো। “আমরা এখন গ্রিন এনার্জির কথা বলছি। হাইড্রোজেন সহজে পোর্টেবল। আমি হাইড্রোজেনে জ্বালানির ভবিষ্যৎ দেখছি।” - সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

 অর্থ-বাণিজ্য থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ