শনিবার , ১৪ অক্টোবর ২০১৭

অব্যক্ত বেদনা

  শনিবার , ১৪ অক্টোবর ২০১৭

বড়দা আসছেন। থাকবেন কয়েক দিন। একান্নবর্তী পরিবারটিতে তাই সাজসাজ রব। রসিক মানুষ বড়দা। অল্পতে সবার মন জয় করতে পারেন। কিন্তু...

ভয় আর শঙ্কা, এই দুটোর সংমিশ্রণ যে কি হতে পারে তা এই মুহূর্তে হাসনাহেনাকে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে। এই সময় তার আশপাশে কেউ নেই। ইচ্ছে করেই নিজেকে আড়ালে রেখেছে সে। সময়টা শেষ বিকেল। বাড়ির পাশে বরই গাছটার নিচে চুপচাপ বসে আছে। দুপুরে স্কুল থেকে বাসায় ফিরে খবরটা শুনেছে হাসনাহেনা। তখন থেকেই যেন পাল্টে গেছে জীবনের সব রূপ।

হাসনাহেনা এবার জেএসসি দেবে। পড়ালেখায় বরাবরই সে ভালো। তাই তো তাকে আরো লেখাপড়া করাবে বলে বাবা জানিয়েছেন। বড় চাচাও তাতে সম্মতি দিয়েছেন।

স্কুলে আজ খুব ভালো একটা সময় কেটেছে। তারই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শায়লা ক্লাসে একটা মোবাইল ফোন নিয়ে এসেছিল। টিফিন পিরিয়ডে হাসনাহেনাকে আড়ালে নিয়ে যায় শায়লা। তারপর মোবাইলে একটা ভিডিও দেখিয়েছে। ভিডিওটা শিক্ষণীয়। তা দেখে খুব মজা পেয়েছে সে। কিন্তু সেটা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনি। প্রতিটি মানুষের জীবনে কোনো না কোনো কষ্ট থাকে। হাসনাহেনারও আছে। তার এই কষ্ট অন্য কারো সঙ্গে মেলানো যায় না। এই কষ্ট যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

হাসনাহেনা বোবা। জন্ম থেকে কথা বলতে পারে না সে। কিন্তু ইচ্ছে করে কথা বলতে। অন্য সবার মতো প্রাণখুলে হাসতে। গল্প করতে। নিজের সুখ-দুঃখ অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে। জ্ঞান হবার পর প্রথম প্রথম কষ্ট লাগত। কিন্তু ধীরে ধীরে সে কষ্ট সয়ে গেছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। একটু পর মাগরিবের আজান হবে। কিন্তু হাসনাহেনার মধ্যে ওঠার কোনো লক্ষণ নেই। চুপচাপ ভাবছে। কানের কাছে একটা কথাই বারবার বাজছে। বড়দা আসছেন। বড়দাকে সবাই পছন্দ করে। বড় চাচার বড় ছেলে। এই পরিবারের বড় সন্তান। সব ভাইবোনরা তাকে বড়দা বলেই ডাকে। কিন্তু হাসনাহেনা সেই ডাক ডাকতে পারে না। একটা সময় ছিল মনে মনে ডাকত। কিন্তু পরবর্তীতে তাও ডাকে না। বড়দা মানে যেন একটা অভিশাপের নাম। একটা আতঙ্ক। আজ হাসনাহেনার মনে যে আষাঢ়ের মেঘ জমেছে তার পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু নোংরা স্মৃতি। সেই অভিশপ্ত স্মৃতি হাসনাহেনা মনে আনতে চায় না। বড়দা ঢাকায় থাকেন। চাকরি করেন সরকারি অফিসে। ছুটির সময় কেবল বাড়িতে আসেন। গত দুই বছর ধরে বড়দা যতবার বাড়িতে এসেছেন ততবারই আতঙ্কে কেটেছে হাসনাহেনার। এই ভয় কেন, তা সে কাউকে বলতে পারে না। একে তো তার মুখে জবান নেই। দ্বিতীয়ত, কেউ বিশ্বাস করবে না। সৃষ্টি হবে পারিবারিক কলহ। তাই রাগে-দুঃখে নীরব থাকে সে।

ঘটনাটি দুই বছর আগের। হাসনাহেনা তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। মাত্র সাবালিকা হয়েছে। যেকোনো পুরুষ প্রথম দৃষ্টিতে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এটা বুঝে হাসনাহেনা। বড়দা ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। তাও এক বছর পর। হাসনাহেনাকে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। এই দৃষ্টি হাসনাহেনার কাছে তখন অপরিচিত ছিল। সবার সামনে বড়দা বললেন, আরে আমাদের হাসনু দেখি অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন তো তাকে বিয়ে দিতে হবে।

এই কথায় সবাই হেসেছে। হাসনাহেনাও লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু ঈদের দিন রাতে ঘরে একা পেয়ে বড়দা হাসনাহেনার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেন। যেমনটি কোনো বড় ভাই তার ছোট বোনের পাশে বসেন। এ কথা সে কথার পর হাসনাহেনা টের পায় বড়দার হাত হাসনাহেনার শরীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই স্পর্শ বুঝতে পারে হাসনাহেনা। তখনই সরে যেতে চায়। কিন্তু বড়দা তাকে জড়িয়ে ধরে বিভিন্ন আবেগপ্রবণ কথা বলতে থাকেন। যেন হাসনাহেনার দুঃখে বড়দার চেয়ে দুঃখী এ জগতে আর কেউ নেই। ঘরের বাইরে কারো পায়ের শব্দ পেয়ে যেন কিছুই হয়নি; এমন ভাব করে চলে যান বড়দা।

সেই যে মনে দাগ লেগেছে, তা আর কোনো দিন শুকায়নি। এরপর থেকে বড়দাকে দেখলে একটা অন্যরকম লজ্জা অনুভব করে হাসনাহেনা। সেটা কোনো সুখকর লজ্জা ছিল না। দুদিন পর যেদিন বড়দা ঢাকায় ফিরে যাবেন সেদিনও সুযোগ বুঝে হাসনাহেনার কাছে আসেন বড়দা। এ কথা সে কথার পর হাসনাহেনার কোমল বুকে হাত দিয়ে বসেন। অমনি চমকে সরে যায় হাসনাহেনা।

বড়দা তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, আরে পাগলি তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো তোর বড় ভাই। তোকে একটু আদর করে দিচ্ছি। আবার কবে না কবে দেখা হয়। এরপর আসার সময় তোর জন্য দামি জামা নিয়ে আসব। তোর কিছু লাগলে লিখে জানাস, কেমন?

এরপর বড়দা যতবার বাড়ি এসেছেন ততবার কোনো না কোনো অছিলায় গায়ে হাত দিয়েছেন। এই লজ্জার কথা হাসনাহেনা কাউকে জানাতে পারে না। তাই আজকে যখন শুনল বড়দা আসছেন। তাই মনটা খারাপ হয়ে গেছে। হাসনাহেনা বুঝতে পারে না তার সঙ্গে কেন বড়দা এমন করেন। অথচ ছোট চাচার মেয়ে রুমকি তার চেয়ে বেশি সুন্দর দেখতে। বড়দা কি রুমকির সঙ্গেও এমন করেন, নাকি শুধু তার সঙ্গে? এর উত্তর জানা নেই তার। বিষণ্ন মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে হাসনাহেনা।


হাসনাহেনা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পায়নি। হঠাৎ ঘুম ভাঙে তার। অন্ধকার। নিচ থেকে তখনো কথাবার্তার শব্দ আসছে। অর্থাৎ এখনো কেউ ঘুমায়নি। পাশে একটা নিঃশ্বাসের শব্দ। পরক্ষণে টের পায়একটা শক্ত হাত তার কোমল দুটি বুক পিষে ফেলছে। হাতটি তার জামা ও ব্রার ভেতর দিয়ে একেবারে মাংসপিণ্ডে গিয়ে স্পর্শ করেছে


নির্দিষ্ট দিনে বাড়ি আসলেন বড়দা। হাসনাহেনার বাবারা তিন ভাই। বড় চাচার পাঁচ ছেলেমেয়ে। হাসনাহেনারা তিন ভাইবোন। আর ছোট চাচার চার ছেলেমেয়ে। তারা মোট ১২ জন চাচাতো ভাইবোন। বড়দা আসাতে সবার মধ্যে একটা উৎসব ভাব চলে এসেছে। আনন্দে মেতেছে সবাই। বাড়িতে ভালো রান্নাবান্না হয়েছে। মফস্বলে হাসনাহেনার বাবাদের মোটামুটি অবস্থা ভালো। বিশাল বাড়িতে সবাই একসঙ্গে থাকে। বাড়ির বাউন্ডারির ভেতর বিভিন্ন ফলের গাছ। বড়-ছোট, পিঠাপিঠি বিভিন্ন বয়সের ভাইবোনদের মধ্যে ভালোই মিল। শুধু হাসনাহেনার ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। কারণ, সে কথা বলতে পারে না, তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখে। একা থাকতে পছন্দ করে।

রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই আড্ডায় মেতে ওঠে। কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে আড্ডা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে হাসনাহেনা। বড়দাই সেই আড্ডার মধ্যমণি। বাড়ি এসে বড়দা হাসনাহেনাকে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। সেই দৃষ্টিতে লালসা দেখতে পেয়েছিল হাসনাহেনা। বড়দা বলেছেন, হাসনু, তুই আরো বড় হয়েছিস, দেখতে আরো বেশি সুন্দর হয়েছিস।

তারপর গলাটা একটু নামিয়ে বলেন, সবকিছুই বড় হয়ে গেছে। কথাটা বলার সময় বড়দার চোখ হাসনাহেনার বুকের ওপর সীমাবদ্ধ ছিল টের পেয়েছে সে। ধক করে উঠেছিল বুকের ভেতর। এই প্রশংসায় মোটেও খুশি হতে পারেনি সে। তাই নিজেকে দূরে দূরে রাখছে।

রাতে হাসনাহেনার সঙ্গে ঘুমায় চাচাতো বোন হিমি। বয়সে দুই বছরের ছোট। আজ হিমিও আড্ডায় শামিল। ওদের আড্ডা কখন শেষ হবে কে জানে। অনেক দিন পর বড়দাকে পেয়ে সবাই মেতেছে। দোতলা বাড়ির উপরে নিজেদের শোবার ঘরে হাসনাহেনা একা একা শুয়ে পড়ে। নিচ থেকে হই-হুল্লোড়ে শব্দ আসছে।

হাসনাহেনা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পায়নি। হঠাৎ ঘুম ভাঙে তার। অন্ধকার। নিচ থেকে তখনো কথাবার্তার শব্দ আসছে। অর্থাৎ এখনো কেউ ঘুমায়নি। পাশে একটা নিঃশ্বাসের শব্দ। পরক্ষণে টের পায় একটা শক্ত হাত তার কোমল দুটি বুক পিষে ফেলছে। হাতটি তার জামা ও ব্রার ভেতর দিয়ে একেবারে মাংসপিণ্ডে গিয়ে স্পর্শ করেছে।

হাসনাহেনা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু অন্য হাতটি তাকে আঁকড়ে ধরে। বিপদ টের পায় হাসনাহেনা। ডাক দিতে গিয়েও বিফল হয়। সে যে বাকপ্রতিবন্ধী। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে আজ তার নারীত্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি লুটে নিচ্ছে।

নিঃশ্বাসটি তার কানের কাছে আসে। ফিসফিস করে বলে, হাসনু, তুই চিন্তা করিস না। তোকে আমি বিয়ে করব। তোর শরীরে যে এত সুখ লুকিয়ে ছিল তা আগে বুঝিনি। আমাকে বাধা দিস না লক্ষ্মীসোনা।

শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় হাসনাহেনা। যখনই তার সালোয়ার খুলে নিয়েছেন বড়দা তখন যেন সে অবশ হয়ে যায়। তারপর কিছু মুহূর্ত। হাসনাহেনা নিঃস্ব হয়ে যায়। তাকে সর্বস্বান্ত করে বিজয়দর্পে বড়দা ঘর থেকে বের হয়ে যায়। কোনো শক্তিশালী সাইক্লোন লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায় হাসনাহেনার শরীরটাকে।

হাসনাহেনা কাঁদে। কিন্তু কোনো শব্দ হয় না। ঘরে কেউ আসে না। এই ভয়টাই সে পেয়েছিল এতদিন। নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টাও ছিল তার মধ্যে। কিন্তু সে ব্যর্থ। এখন সে কী করবে? এই অভিশপ্ত জীবনে কীভাবে বেঁচে থাকবে সে। সে যে প্রচণ্ড অভিমানী। এতদিন অভিমান ছিল সে কেন কথা বলতে পারে না। আজ তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ছদ্মবেশী এক অমানুষের। যে তার মহামূল্যবান সম্পদ নারীত্ব কেড়ে নিয়েছে। এরপর?

হাসনাহেনা আর ভাবতে পারে না। ভাবনায় কিছু আসে না। উঠে কাপড় ঠিক করে। তারপর বাতি জ্বালিয়ে টেবিলে বসে কাগজ-কলম টেনে নেয়। মাত্র আধঘণ্টা সময় নেয়। এরইমধ্যে সে লিখে এতদিনের না বলা কথা। জানায় তার সব কষ্টের কথা। বড়দাকেই অভিযুক্ত করে। হাসনাহেনার মন কাঁদে। কিন্তু অশ্রু বের হয় না।

ঠিক এক ঘণ্টা পর হিমির আর্তচিৎকার বাড়ির সবাইকে এই ঘরে টেনে নিয়ে আসে। সবাই দেখে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো হাসনাহেনার মরদেহ ঝুলছে। মুহূর্তে বাড়িতে এক অনরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বুকফাটা চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে। তার কিছুক্ষণ পর থেকে বড়দাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

 ফিচার থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ