বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯ |

দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও বিদেশী শ্রমবাজার

ওসমান গনি   বুধবার , ৩০ অক্টোবর ২০১৯

জনশক্তি রপ্তানিটাই ছিল আমাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নমূলক খাতের একটা বড় অংশ। বর্তমানে আমাদের দেশের জনসংখ্যা রপ্তানি খাতটা আগেকার যেকোন সময়ের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে। রাজনীতিতে সমন্বয়হীনতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা সহ আরও আর বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অস্থিরতার কারনে বিশ্বের শ্রম বাজারে আজ আমাদের বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। আগে বিশ্বের প্রায় দেশে বাংলাদেশের মানুষের যথেষ্ট চাহিদা বা কদর ছিল। কিন্তু আজ আমাদের দেশের মানুষ সামান্য কয়েকটি দেশ ছাড়া কোন দেশে যেতে পারছে না। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে বর্হিবিশ্বে জনশক্তি রপ্তানি করার জন্য তেমন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকার কারনে আজ আমাদের ধরাশায়ী অবস্থা। আর যারা বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত আছে তারাও নানাহ কষ্ট আর সীমাহীন যন্ত্রণার মধ্যে আছে। তাদের বিসা পতাকা থাকা অবস্থায়ও ধরে ধরে দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তার বাস্তব উদাহরণ হলো সউদী আরব। গেল কিছুদিন আগে সউদী আরব আমাদের দেশের বহু লোককে ধরে দেশে পাঠিয়ে দিল। আজ তাদের পরিবারের অবস্থা শোচনীয়। খবর নেয় কেউ তাদের।         

বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির বাজারে যেন অন্ধকার নেমে আসছে। নতুন শ্রমবাজার খুলছে না। বরং পুরনো শ্রমবাজারই একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, লেবাননসহ কয়েকটি দেশে জনশক্তির বাজার এখন প্রায় বন্ধ আছে। আর ওমান, কাতার, জর্দানের মতো শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর হার এখন তলানিতে। এ অবস্থায় কর্মী যাওয়ার পুরো চাপ সউদী আরব, ওমান ও কাতারে। কিন্তু এই তিনটি দেশ আগের মতো শ্রমিক নিতে পারছে না। লাখ লাখ টাকা খরচ করে সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়াসহ নানা কারণে অনেকেই খালি হাতে দেশে ফিরছে। বিগত ৯ মাসে শুধু সউদী আরব থেকেই দেশে ফিরেছে প্রায় ১৬ হাজার প্রবাসী নারী গৃহকর্মী ও পুরুষ কর্মী। গত ২৬ অক্টোবর১৯ সউদী আরব থেকে সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে (এসভি ৮০৪) প্রায় ২০০ প্রবাসী কর্মী খালি হাতে দেশে ফিরেছে। তবে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে কল্যাণ ডেস্কের কর্মকর্তা তানভীর আহমদ ঐ ফ্লাইটটিতে ১৩৭ জন কর্মী ফেরার কথা স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সউদী থেকে ১৩০ জন এবং মরিশাস থেকে ৮০ জন কর্মী খালি হাতে দেশে ফিরেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভুগতে হচ্ছে। সম্প্রতি যেসব কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গেছে, তারা কাজ না থাকা, ফ্রি ভিসার নামে প্রতারণা, আকামা না দেওয়া, প্রতারণাসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। সউদী আরব ও মালয়েশিয়াতেই পাঁচ লাখের বেশি শ্রমিক অবৈধ হয়ে অমানবিক জীবন যাপন করছে। ভুক্তভোগি প্রবাসীদের দেয়া তথ্য মতে, সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার সউদী আরবে এখন চলছে ব্যাপক পুলিশী ধরপাকড়। সউদী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অনেককেই খালি হাতে দেশে ফিরতে হচ্ছে। বৈধ আকামাধারী প্রবাসী কর্মীদেরও দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন দিকে গড়াচ্ছে যে এসব দেখার কেউ নেই। সউদীতে পুলিশী হয়রানি বন্ধ এবং বৈধ আকামাধারী কর্মীদের আইনী সহায়তা দিতে না পারলে জনশক্তি রফতানিতে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

গ্রেফতাকৃত প্রবাসী কর্মীর কারো কারো বৈধ আকামা থাকার পড়েও সউদী পুলিশ তাদের ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এসব অসহায় প্রবাসীদের আইনী সহায়তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। আকামাধারী প্রবাসী কর্মীদের আউট পাস ইস্যু করে দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে দূতাবাস। দেশটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ে রিয়াদস্থ দূতাবাস কূটনৈতিক তৎপরাত চালাতে সক্ষম হচ্ছে না।

রাজকীয় সউদী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষিত ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির অধীনে শ্রমবাজারে শতভাগ স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সউদী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ওপর অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কমানোরও উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। সউদী অর্থনীতির এ পালাবদলের চোরাবালিতে আটকা পড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। প্রতিদিনই কাজ হারাচ্ছেন শতশত প্রবাসী কর্মীরা। নিয়োগকর্তার দেয়া অনুমতিপত্র বা আকামা হারিয়ে অনেকেই অবৈধ হচ্ছে দেশটিতে। এরপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে অনেকে খালি হাতে দেশে ফিরছে।

জ্বালানি খাতকেন্দ্রিক ও অভিবাসী শ্রমনির্ভও অর্থনীতির চাকা হঠাৎ ঘুরাতে গিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে সউদী আরবের বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান খাত। বিশেষত নির্মাণ খাতের সউদী কোম্পানিগুলো পড়েছে আর্থিক বিপর্যয়ে। সউদী বিন লাদেন গ্রুপ, সউদী ওগেরসহ অনেক বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে।

নির্মাণ ও সরবরাহ খাতের ছোটখাটো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও একই কৌশল নিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি। বৈধভাবে দেশটিতে গেলেও নিয়োগকর্তা আকামা নবায়ন না করায় তারা অবৈধ হয়ে পড়ছেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক এড়াতে অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আকামা সমস্যা সমাধানে প্রতিদিনই সউদীর বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রবাসী কর্মীরা অভিযোগ করছে। দূতাবাস থেকে এ বিষয়ে ঢাকায় লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এসব সমস্যা দূতাবাসের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য সউদী সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে যারা আকামা জটিলতায় পড়েছে, কোম্পানি থেকে তাদের আকামা করে দেয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ কোম্পানি সেটি করছে না। তবে বিষয়টি সমাধানে দূতাবাস কাজ করছে বলে দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার ২৬৫ জন কর্মী। এর মধ্যে শুধু সউদী আরবেই গেছে ৪৭ হাজার ২৮৩ জন মহিলা গৃহকর্মীসহ মোট ২ লাখ ৬৮ হাজার ১১২ জন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছে মাত্র ২ হাজার ৪০৩ জন। কুয়েতে গেছে ৮ হাজার ৬০৩ জন। ওমানে গেছে ৫৩ হাজার ৯৮১জন। কাতারে গেছে ৪৪ হাজার ৬৮৪ জন। মরিশাসে গেছে ৫ হাজার ৬১০ জন।

মালয়শিয়াতে কর্মী নেয়ার ব্যাপারে আগামী কিছুদিনের মধ্যে দুদেশ আলোচনায় বসতে পারে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।   কর্মী নিয়োগে এবার মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে কর্মীদের কম অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানো, কোম্পানি পরিবর্তন না করা, মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসা, যোগ্য সকল রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো ও মেডিকেলসহ অন্য বিষয়গুলো মালয়েশিয়ার পদ্ধতিতে পরিচালনা করা।

সউদী পুলিশ অবৈধ কর্মীদের আটক করে দেশে পাঠাতে পারেন। কিন্ত বৈধ আকামাধারী বাংলাদেশি কর্মীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। সউদী দূতাবাসে ওয়েজ আর্নার্স তহবিলের প্রচুর অর্থ জমা রয়েছে। সে থেকে গ্রেফতারকৃত আকামাধারী কর্মীদের আইনী সহায়তা দানে দূতাবাসকে আন্তরিক হতে হবে। সউদীর শ্রমবাজার ধরে রাখতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর প্রয়োজন।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট






 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ