শনিবার , ১৪ অক্টোবর ২০১৭

সুস্থ ও সবলভাবে বাঁচার জন্য ডিম

  শনিবার , ১৪ অক্টোবর ২০১৭

আজ বিশ্ব ডিম দিবস। ডিম নিয়ে ভালো-মন্দ গবেষণার অন্ত নেই। তবে আজ একটি ভালো খবর দিয়েই শুরু করব লেখাটি। ভালো খবরটি হলো, জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইন্ডাস্ট্রিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এআইএসটি) গবেষকরা জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে বিশেষভাবে তৈরি মুরগির ডিম দিয়ে ক্যানসারের ওষুধ বানানোর চেষ্টা করছেন। নতুন এই ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হলে তা চিকিৎসার খরচ নাটকীয় হারে কমে যাবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সকালে-বিকেলে নাশতায়, দুপুর ও রাতের টেবিলে ডিম এখন জনপ্রিয় খাদ্যতালিকায়। অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ, স্বাস্থ্যকর এই ডিম সহজে রান্না, ভাজি, ভয়েল, পোজসহ রকমারি নাশতা তৈরির অন্যতম উপাদান।

দিনে কটা ডিম খাওয়া যাবে—এমন প্রশ্ন অনেকেরই। জেনে রাখুন আপনি রোজ কটি ডিম খেতে পারবেন তা সম্পূর্ণই নির্ভর করে সারা দিন গ্রহণ করা আপনার অন্যান্য খাবারের ওপর। দ্য স্মল চেঞ্জ ডায়েট নামের বইটিতে পুষ্টিবিদ কেরি গানস বলেছেন, এক সপ্তাহে এক ডজন ডিম একজন ব্যক্তির জন্য যথাযথ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দিনে দুটি ডিম খাওয়া যেতে পারে, তবে খেয়াল রাখতে হবে তার খাদ্যতালিকার দিকেও। একটু অলিভ অয়েলে লবণ, গোলমরিচ দিয়ে ডিম ভেজে খাওয়া হয়, সেক্ষেত্রে দিনে দুটি ডিম খাওয়া যেতেই পারে। অপরপক্ষে ডিম, পনির, মাংস একই দিনে থাকে, তাহলে কিন্তু দুটি ডিম একদিনে খাওয়া মোটেও ভালো হবে না।

প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ ও স্বাস্থ্যবান এবং মেধাবী জাতি গঠনের লক্ষ্যে ডিমের গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ডিম দিবস। পোল্ট্রি সংশ্লিষ্ট সাতটি অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতর যৌথভাবে দিবসটি উদ্যাপন করে। ডিম হলো প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। সাধারণত ৫০ গ্রাম ওজনের একটি ডিমে প্রোটিন থাকে প্রায় ৬ থেকে ৬.৫০ গ্রাম। এ ছাড়াও ডিমে থাকে ভিটামিন, খনিজ উপাদান, রঞ্জক পদার্থ ও সামান্য ক্যালরি। ডিমের কুসুমে থাকে চর্বি, যার ভেতরে বিদ্যমান কোলেস্টেরল। আগে মনে করা হতো ডিমের কোলেস্টেরল মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকর এবং তা হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ডিমের কোলেস্টেরল পরিপাক ও শোষণের পর রক্ত বা রক্তরস পর্যন্ত পৌঁছায় না।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, প্রতিবছর দেশে অসংখ্য শিশু এবং গর্ভবতী মা পুষ্টিহীনতার শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। আধুনিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, সুস্থ ও সবলভাবে বাঁচার জন্য ডিম একটি পরিপূর্ণ খাদ্য। ডিম উচ্চরক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। ডিম দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। ডায়াবেটিস, স্তন ক্যানসার এবং মাইগ্রেনের ঝুঁকি কমায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, সুস্থ থাকার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বছরে গড়ে ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে মাত্র ৪৫-৫০টি। তবে আশার খবর হলো ডিম শুধু পুষ্টি উপাদেয় খাবার হিসেবে অসুখ-অসুস্থতায় অথবা অতিথি আপ্যায়নে নয়; প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিমের গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়েছে। পিতা-মাতারা সন্তানদের সুস্বাস্থ্য ও মেধাবিকাশের জন্য ডিম দিচ্ছেন নিত্যদিন। নিজেদের সুস্থতায় সকালের নাশতায় ডিম খাচ্ছেন অনেকে। ডিনারে বা লাঞ্চেও ডিমের মুখরোচক রন্ধনশৈলী জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বয়স্ক ও সন্তানসম্ভবা মায়েদেরও ডিম খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এভাবে দেশের মানুষের মাঝে ডিম সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।

ডিম বেশি খাওয়া কি ক্ষতিকর? সাদা অংশ ছাড়া কুসুম খাওয়া যাবে না? কারণ, কোলেস্টেরল, প্রেসার, ডায়াবেটিক—কী করব এমন অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়। তবে এসব প্রশ্নের উত্তরে নতুন তত্ত্ব দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের গবেষকরা বলেছেন, যদি সম্পৃক্ত চর্বি খাওয়া কমিয়ে দিতে পারেন তবে সপ্তাহে ছয়টি ডিম খাওয়া খারাপ কিছু নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর খাবার তালিকায় ডিম হতে পারে নতুন সদস্য। ডিমে আছে উপকারী ওমেগা ৩ চর্বি, যা উল্টো রক্তনালি ও হৃদযন্ত্রের জন্য ভালো। তাই পুষ্টি উপাদানহীন খাবার বাদ দিয়ে বরং ডিম খাওয়া ভালো। ডিমে প্রায় ১১ ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান আছে, যা শরীরের জন্য দরকারি। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভিটামিন ডি, যা বেশির ভাগ খাবারে অনুপস্থিত। ডিমে বায়োটিন নামের পদার্থও আছে, যা আজকাল অনেকে চুল পড়া কমাতে ক্যাপসুল হিসেবে কিনে খান। ডিম আছে আমিষেরও চমৎকার মিশেল। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, চর্বি একেবারে খাওয়া ভালো নয়, কথাটা সঠিক নয়। যা ভালো নয়, তা হলো সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্সফ্যাট। গরু, খাসির মাংসের জমাট চর্বি, ঘি, মাখন, ক্রিম, পেস্ট্রি ও ডিপ ফ্রাই খাবারে আছে এ ধরনের ক্ষতিকর চর্বি। বাদ দিতে হলে এগুলো বাদ দিন। আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানে কেবল অস্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দেওয়া নয়।

আমরা জানি, প্রাণিজ প্রোটিনের মধ্যে ডিম অন্যতম। ডিমে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদরোগসহ অনেক রোগের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী। সাধারণ হিসেবে ১০০ গ্রাম খাসির মাংস থেকে যে প্রোটিন পাওয়া যায়, সেই একই পরিমাণ প্রোটিন মেলে চারটি ডিম থেকে। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নারীদের আ্যডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবর্তীকালে সপ্তাহে কমপক্ষে ছয়টি ডিম খেলে ব্রেস্ট ক্যানসারের সম্ভাবনা প্রায় ৪৪ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডিমের কুসুমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘কে’ আছে। এটি হাড় শক্ত ও মজবুত করে এবং প্রজনন অক্ষমতা দূর করতে সহায়তা করে। ডায়াবেটিক তাড়াতে ডিম দারুণ কার্যকরী। সপ্তাহে চারটি ডিম খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিকসের ঝুঁকি ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। শিশুর হাড় গড়নে ও মেধাবিকাশে ডিম খুবই কার্যকর। ডিমে আছে ভিটামিন এ; যা দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে। ডিম অর্ধসেদ্ধ নাকি পুরোপুরি সিদ্ধ : হাফবয়েল ডিম খেলে নাকি ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে পেটের পীড়া হতে পারে, বিষয়টি কতটুকু সত্য? ডিমের খোলায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। ডিম বেরোয় পাখির পায়ুপথ দিয়ে। এ সময় পায়ুছিদ্র দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ডিমে ঢুকে পড়ে, তাই ডিম কখনোই কাঁচা বা অর্ধসেদ্ধ খাওয়া উচিত নয়। অনেকেই ধারণা করেন, হাঁসের ডিমের চেয়ে মুরগির ডিম ভালো। পুষ্টিমূল্যের বিবেচনায় হাঁস ও মুরগির ডিম প্রায় একই মানের বলা যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী হাঁসের ডিমে রয়েছে ১৮১ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি। আর মুরগির ডিমে আছে ১৭৩ কিলোক্যালরি। হাঁসের ডিমে আমিষ ১৩ দশমিক ৫ গ্রাম আর মুরগির ডিমে ১৩ দশমিক ৩ গ্রাম এবং হাঁসের ডিমের চর্বি ১৩ দশমিক ৭ গ্রাম, মুরগির ডিমে চর্বি ১৩ দশমিক ৩ গ্রাম। হাঁসের ডিমে ক্যালসিয়াম ৭০ মিলিগ্রাম, লৌহ ৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ২৬৯ মাইক্রোগ্রাম। অন্যদিকে মুরগির ডিমে ক্যালসিয়াম ৬০ মিলিগ্রাম, লৌহ ২ দশমিক ১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ২৯৯ মাইক্রোগ্রাম। তুলনামূলক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, হাঁসের ডিমে খাদ্যশক্তি, আমিষ, চর্বি, শর্করা, লৌহ ও ক্যালসিয়ামে মুরগির ডিমের তুলনায় সামান্য বেশি। অপরপক্ষে মুরগির ডিম হাঁসের ডিমের তুলনায় ভিটামিন এ এবং ভিটামিন বি ২ সামান্য বেশি থাকে। চুলচেরা বিচারে হাঁসের ডিমকেই বেশি পুষ্টিমান বলা যেতে পারে।

জেনে রাখুন, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ডিম খাওয়া বন্ধ না করে ধূমপান পরিহার করার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। ডিমে যে কোলেস্টেরল থাকে তার বেশির ভাগই উপকারী। ধূমপান, চিনি, টেনশন এগুলো পরিহার করে বরং কোলেস্টেরল প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডিম খাওয়া বন্ধ করে নয়। গবেষণায় বলা হয়, সাপ্তাহিক খাবারের তালিকায় কুসুম থাকা মানে হাড় দীর্ঘায়ু হওয়া, ফলে বাতের ব্যথা বা এ ধরনের হাড়ের অসুখ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বেশি দিন বাইরে ফেলে রাখলে ডিম নষ্ট হয়ে যায়। আবার রেফ্রিজারেটরের ভেতরে ডিম অনেক দিন পর্যন্ত ঠিকঠাক থাকে। বেশি দিন বাইরে ফেলে রাখলে ডিমের মধ্যে সালমোনেল্লা নামে একপ্রকার ব্যাকটেরিয়া থাকে। ডিমের শক্ত খোসা ভেদ করে এই ব্যাকটেরিয়া ভেতরে প্রবেশ করে। তবে ফ্রিজের মধ্যে রাখলে কখনই এই ব্যাকটেরিয়া মারা যায় না। তাদের বৃদ্ধি এবং কাজকর্ম মন্থর হয়ে ফ্রিজের ঠান্ডায় কাজকর্ম শিথিল হয়ে পড়ায় বাইরে থেকে ডিমের খোসা ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে পারে না ব্যাকটেরিয়া। ফ্রিজে রাখলে ডিমের খোসার আয়ু বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক দিন ডিম ভালো থাকে। পোলট্রির ডিম শীতকালে ৭-১০ দিন পর্যন্ত রেফ্রিজারেটরের বাইরে রাখাই যায়! গরমকালে ৩-৪ দিনে। জিনিউজ, এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডের এক খবরে বলা হয়েছে, আসল ডিমের সঙ্গে প্লাস্টিক ডিমের পার্থক্য সহজে বোঝা যায় না। প্লাস্টিকের ডিম চেনার উপায়গুলো জেনে রাখুন ডিম ভাঙার পর সাদা অংশ ও কুসুম এক হয়ে যায়। সাধারণ ডিমের চেয়ে এই ডিম বেশি ঝকঝকে। এর খোলস বেশি শক্ত। খোলের ভেতর রাবারের মতো লাইন থাকে। ডিম ঝাঁকালে পানি গড়ানোর মতো শব্দ হয়। প্লাস্টিকের ডিমে কোনো গন্ধ থাকে না। আসল ডিম ভাঙলে মুড়মুড়ে শব্দ হয়। কিন্তু প্লাস্টিকের ডিমে তেমন শব্দ হয় না। আসল ডিম ভেঙে রেখে দিলে পিঁপড়া বা পোকামাকড় আসে। কিন্তু নকল ডিমে পোকামাকড় আসে না।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ