বুধবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ |

রাঙ্গাঁর বক্তব্যে নিন্দার ঝড়, ক্ষমা চাওয়ার দাবি

অনলাইন ডেস্ক   মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর ২০১৯

নূর হোসেনকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ \'মাদকাসক্ত\' বলার প্রতিবাদে সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদের পরিবারের সদস্যরা।

গণতন্ত্রের আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বলায় জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঁঙ্গাকে নিয়ে চলছে নিন্দার ঝড়। তার বিতর্কিত বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে নূর হোসেনের পরিবার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছে। নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি বলেছেন, রাঙ্গাঁকে জাতির সামনে ক্ষমা চাইতে হবে।

একই দাবি তুলেছে ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বসহ রাঙ্গাঁর দল জাতীয় পার্টির নির্বাচনী জোটের সঙ্গী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও, যারা ’৯০ এর গণআন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ২০১৪-১৮ সালের সরকারের প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে তার জেলা রংপুরেও।

এইচ এম এরশাদের গড়া দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঙ্গাঁ রোববার তার দলের এক অনুষ্ঠানে বলেন, “হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মাদকাসক্ত নূর হোসেনকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।”

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদকে হটাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামসহ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে ১৯৮৭ সালে ঢাকা অবরোধের কর্মসূচি দিয়েছিল; সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন পরিবহন শ্রমিক নূর হোসেন।

বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক-গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে সেদিন মিছিলে নেমেছিলেন আওয়ামী লীগকর্মী নূর হোসেন; সেদিন তার আত্মদান এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দিয়েছিল নতুন মাত্রা।

১৯৮৭ সালে আন্দোলন নতুন মাত্রা পাওয়ার পর তিন বছরের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে ১৯৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়তে হয় এরশাদকে। রাঙ্গাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে বসেন নূর হোসেনের পরিবারের সদস্যরা।


ওই কর্মসূচিতে নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি বলেন, “নূর হোসেন আমার একার ছেলে না, সে জনগণের ছেলে। আপনারা ১০ নভেম্বর পালন করেন। এই জনগণের ছেলেকে সে (রাঙ্গাঁ) নেশাখোর বলেছে।

“যে লোক এই কথা বলেছে, এর বিচার আমি জনগণের কাছে দিলাম। তাকে এর জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।” অশ্রুনয়নে যখন মরিয়ম বিবি একথা বলছিলেন, তখন তার পাশেই ছিলেন নূর হোসেনের তিন ভাই আলী হোসেন, দেলোয়ার হোসেন ও আনোয়ার হোসেন এবং বোন শাহানা বেগম।

আলী হোসেন বলেন, “আমার মা সারাদিন কাঁদছে আজকে, সারাটা রাত, কিছুই বলতে পারিনি। অনেক চিন্তাভাবনা করে রাস্তায় বসছি। আপনারা সবাই আমাকে একটু সহযোগিতা করেন। এই লোকটাকে এর জন্য বিচার করেন আপনারা।”

রাঁঙ্গা তার বক্তব্যের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত প্রেস ক্লাবে অবস্থানে চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন নূর হোসেনের ভাই। রাঙ্গাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবেন কি না- সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মরিয়ম বিবি বলেন, “আমি আমার ছেলেকে বলেছি, মামলা করা উচিৎ। আমি মামলা করতে রাজি আছি।”

পাশে থাকা বড় ছেলে আলী হোসেন বলেন, “নূর হোসেনের এই ঘটনার জন্য এরশাদ জাতীয় সংসদে ক্ষমা চেয়েছেন। আমাদের বাসায় গিয়ে আমার আব্বার কাছে মাফ চেয়েছেন যে আমি ভুল করেছি। আমার আব্বা নেই, আজকে বেঁচে থাকলে হয়ত বলত। কিন্তু এই ধরনের একটা মন্তব্য..তখন কি ইয়াবা ছিল? ফেনসিডিল ছিল?”

তিনি বলেন, “আমি জনগণের কাছে বলতে চাই, এই ছেলেটা আত্মাহুতি দিল দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। তাঁকে এইভাবে ছোট করাটা কি ঠিক হল? আমরা জনগণের কাছে বিচার দিলাম।”


নূর হোসেনের ভাই আলী হোসেনও অশ্রুনয়নে বলেন, “আমরা তো কিছু চাই না আপনাদের কাছে। আমরা যে অবস্থায় আছি, সে অবস্থায় থাকি। কোনোদিন কারও কাছে হাত পাতি নাই। আমার মা, আমরা, খাই-না খাই, কোনোদিন কাউকে কিছু দিতে বলি নাই।

“আমাদের যারা ভাই আছে, দেখেন, টেস্ট করেন আমাদেরকে। আমরা কোনো অন্যায় কাজ করি কি না। আমরা শ্রমিক মানুষ। কাম করি খাই। সবাই আমরা মেহনতি মানুষ। দেশের মানুষকে ভালোবাসি। আমরা চাই দেশটা সুখে-শান্তিতে থাকুক।”

আলী হোসেন বলেন, “আমরা তো ক্ষমা করেই দিছিলাম, ভুলেই গেছিলাম। কেন সেই জিনিসটাকে আবার জাগাই তুলল? ৩৩ বছর পর আবার নতুন করে ঘাঁ সৃষ্টি করলো কেন? আমরা কি অন্যায় করেছি?” এই সময় পরিবারের সবাই মিলে বলে উঠে ‘আমরা এই মিথ্যা অপবাদের বিচার চাই’। এই বক্তব্যের মাধ্যমে রাঙ্গাঁ গণতন্ত্রের অন্য শহীদদেরও অপমান করেছেন বলে মন্তব্য করেন আলী হোসেন।

“জনগণ তাকে বয়কট করুক। এই ধরনের কথা বলার জন্য এই দেশে তার অধিকার নেই থাকার। তার এমপি পদ কেড়ে নেওয়া হোক। যদি আমরা এর প্রতিবাদ না করি তাহলে তো সে এই ধরনের কথা আরও বলবে।” রাঙ্গাঁর এই বক্তব্যের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছেও বিচার দাবি করেন নূর হোসেনের ভাই।

‘রাঙ্গাঁই বেসামাল’

শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য রাঙ্গাঁকেই ‘বেসামাল’ বলেছেন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। তিনি বলেন, “জাতীয় পার্টির মহাসচিবের বক্তব্য শুনে মনে হয়, তিনি নিজেই মাদকাসক্ত হয়ে বেশামাল কথাবার্তা বলছেন।

“নূর হোসেনকে নিয়ে এমন বক্তব্য নিন্দনীয়, তার এমন বক্তব্যের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।” সংসদ সদস্য অসীম কুমার বলেন, “নূর হোসেন গণতন্ত্রের আন্দোলনের মাইলফলক। নূর হোসেনের জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কাঠামো শক্তিশালী হয়েছিল।”

সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, “শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গার বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, তিনি নিজেই একজন বেসামাল, ভারসাম্যহীন ও কুরুচিপূর্ণ ব্যক্তি।

“তা না হলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে শহীদের নাম জনগণের হৃদয়ে গেঁথে আছে, তাকে নিয়ে একটি দলের শীর্ষ নেতা এমন বক্তব্য দিতে পারেন না। তাকে অবশ্যই কুরুচির্পর্ণ বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।”

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা চিকিৎসক নেতা মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, “রাঙ্গাঁর এমন বক্তব্যই প্রমাণ করে জাতীয় পার্টি বড় স্বৈরাচার ছিল। আমি মনে করি, রাঙ্গাঁর ক্ষমা চাওয়া উচিৎ, ক্ষমা না চাইলে এদেশের জনগণ ব্যবস্থা নেবে।”

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, “এটা একটা শিষ্টাচারবহির্ভূত নিন্দনীয় কথা। নূর হোসেন শুধু যুবলীগের একজন কর্মীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক।

“নূর হোসেনকে নিয়ে এমন বক্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক। এই বক্তব্যের জন্য রাঙ্গার দুঃখ প্রকাশ করা উচিৎ, জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।” নূর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বলায় জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঁঙ্গাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু।

বিবৃতিতে বলা হয়, “জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের উপস্থিতিতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঙ্গাঁ শহীদ নূর হোসেনকে ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর বলে যে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একজন শহীদকে যেভাবে অপমান ও অশ্রদ্ধা করেছেন, ডাকসু তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।

“একই সাথে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁকে তার এই বক্তব্য প্রত্যাহার ও জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহবান জানায়। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করা গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।”

ক্ষোভ-বিক্ষোভ


রাঙ্গাঁর বক্তব্যে ক্ষোভ জানিয়ে ঢাকায় তার কুশপুতুল পুড়িয়েছে যুবলীগ। সোমবার বিকালে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে আওয়ামী লীগের যুব সংগঠনটি।

সমাবেশে যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, “রাঙ্গাঁ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও কটূক্তি ক‌রে‌ছে। তাকে গ্রেপ্তা‌রের দাবি জানাই। রাঙ্গাঁ জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা না চাইলে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে।”

‌তি‌নি বলেন, “যেহেতু জাতীয় পার্টির সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি নির্বাচনী সমঝোতা আছে, তাই জাতীয় পার্টির সাথে ঐক্যের স্বার্থে অবিলম্বে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁকে অব্যহতি দেওয়ার আহ্বান জানাই।

সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল করে যুবলীগ; মিছিল শেষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে রাঙ্গা কুশপুতুল পোড়ানো হয়। নূর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বলায় রাঙ্গাঁর বিরুদ্ধে মিছিল করেছে রংপুর মহানগর যুবলীগ। সোমবার দুপুরে নগরীর জেলা স্কুল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রেস ক্লাবে গিয়ে শেষ হয় ওই মিছিল।

সেখানে সমাবেশে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মন্ডল বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাঙ্গাঁ ওই ‘অরুচিকর’ বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে যুবলীগসহ আওয়ামী লীগ রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হবে। - তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

 রাজনীতি থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ