রবিবার , ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ |

গুলতেকিনের দ্বিতীয় বিয়ে ও নারীমুক্তি

শাশ্বতী বিপ্লব   শনিবার , ১৬ নভেম্বর ২০১৯

গুলতেকিন খানের বিয়ে নিয়ে আলোচনাটা থামছেই না। আবার উস্কে দিলেন তসলিমা নাসরিন। তসলিমা বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া দেখে দু’কথা বলতে ইচ্ছা হলো। প্রথমেই বলে রাখি, তসলিমা নাসরিনের সবকথার সাথে একমত হতে পারি না। আবার তার অন্ধ বিরোধিতাও করি না। তিনি কখনো কখনো ভীষণ সঠিক কথা বলেন৷ কখনো কখনো গুলিয়ে যায় বলে আমার মনে হয়।

অন্যদিকে, হুমায়ূন আহমেদ ও শাওন এবং আফতাব আহমেদ ও গুলতেকিনের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে আমার কোনও উষ্মা নাই, আবার আহ্লাদও নাই। দুটো মানুষের যৌথ জীবন নানা কারণে ভেঙ্গে যেতে পারে। বাইরে থেকে দুই চারটা গল্প শুনে বা পড়ে সেই সমীকরণটা নিজের মতো অনুমান করা যায়, কিন্তু পুরোটা বোঝা যায় না। কে, কেন, কখন, কাকে বিয়ে করবেন সেটা তার জীবনের বাস্তবতা, প্রয়োজন আর সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে। এই সামর্থ্যটা মানসিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সামর্থ্য।

এবার আসি আসল কথায়। ধরুন, হুমায়ূন আহমেদ অন্য কোনও নারীর সাথে কোনও সম্পর্কে জড়ান নাই। শাওনকেও বিয়ে করেন নাই। তবুও গুলতেকিনের সাথে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। এবং গুলতেকিন সন্তানদের দায়িত্ব পেছনে ফেলে, হুমায়ূন ভক্তদের ধার না ধেরে, হুমায়ূনের জীবিত অবস্থায়ই আবার বিয়ে করলেন। হুমায়ূন তার সুলেখনীতে কিছু বিরহগাঁথা লিখলেন। তখন ঘটনাটা কি হতো?

অথবা ধরুন, হুমায়ুনের সাথে গুলতেকিনের বিবাহ বিচ্ছেদই হয় নাই। এখন হুমায়ূনের স্মৃতিকে আঁকড়ে না থেকে এই ৫৬ বছর বয়সে আবার বিয়ে করলেন। তাহলেই বা প্রতিক্রিয়াটা কি হতো?

অথবা, হুমায়ূন আরো কম বয়সে মারা গেলেন। নুহাশরা সব ছোট। মেয়েদের বিয়ে হয় নাই। গুলতেকিন সেই অবস্থায় কাউকে ভালোবাসলেন, বিয়ে করলেন৷ গুলতেকিনের ব্যক্তি স্বাধীনতা, নিজের মতো করে জীবন বেছে নেয়ার স্বাধীনতাটা তখন মানতেন তো আপনারা? মানতেন তো গুলতেকিনের পরিবার ও সন্তানেরা? নুহাশ কি বড় গলা করে বলতে পারতেন যে সে মায়ের বিয়ে দিয়েছে? হুমায়ুন আহমেদের বিয়ের পরও নুহাশ যেমন বাবার কাছে যেতো, যোগাযোগ রাখতো, তেমনি মায়ের সাথেও রাখতো কি?

না রাখার সম্ভাবনাই বেশি। বরং হুমায়ূন ভক্তরা গুলতেকিনের গুষ্ঠি উদ্ধার করতো। সন্তানেরা মাকে ঘৃণা করতো। সমাজ তাকে গালি দিত।

হুমায়ূন আহমেদের কাণ্ডকীর্তি এবং পাশাপাশি গুলতেকিনের ত্যাগের কারণে গুলতেকিনের প্রতি আমাদের একধরনের সফট কর্নার তৈরি হয়েছে। যেমন হয়েছে তার সন্তানদেরও। সকলের মনে হয়েছে, গুলতেকিন যথেষ্ঠ বঞ্চিত হয়েছেন। যথেষ্ঠ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। যথেষ্ঠ প্রতারিত হয়েছেন। এবার তার পাওয়ার পালা।  তাই সব দায়িত্ব পালন করা শেষে এবার একটু সে নিজের কথা ভাবতে পারে। এটাকে নারী অধিকার বা নারীমুক্তি কোনওটাই বলে না।

অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তফা দীর্ঘ ২২ বছর সংসার করার পর হুমায়ূন ফরিদীকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। প্রায় ৫০ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন বয়সে অনেক ছোট বদরুল আনাম সৌদকে। সেই বিয়েটাকে কি আমাদের নারীবাদ বা নারীমুক্তি  মনে হয়েছিল? আমরা কি তখন নারীবাদের জয় বলে উল্লাস করেছিলাম? না, করিনি তো। করিনি কারণ, সুবর্ণাকে আমাদের যথেষ্ট অসহায় মনে হয়নি। হুমায়ুন ফরিদীর প্রথম স্ত্রীও দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। এই বিয়েগুলোর কোনটাকেই নারীবাদ বলে বা নারীমুক্তির আন্দোলন বলে আত্মশ্লাঘায় ভোগার কিছু নাই।

আজ যদি গুলতেকিন বিয়েটা না করতেন। কিন্তু আফতাব আহমেদের সাথে প্রেম করতেন। দু’জনে মিলে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন, প্রয়োজনে একসাথে থাকতেনও, সেটা কি বিগদ্ধ সমাজ বা পরিবার মেনে নিতো? না নিতো না। এবং নিতো না বলেই গুলতকিনকে বিয়ে নামক চুক্তিতে জড়াতে হয়। যেই চুক্তি পুরুষতন্ত্রের বানানো। যেই চুক্তিতে পুরুষ নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। যেই চুক্তিতে পুরুষ বিয়ে করে এবং নারী বিয়ে বসে। যেই চুক্তি মূলত সম্পদের বন্টনকে নিশ্চিত করতে তৈরি। যে চুক্তিতে নারীকে সমঅধিকার দেয়া হয় নাই।

সেই চুক্তি স্বাক্ষর করে বিয়ে করার মধ্যে দিয়ে নারীর মুক্তি ঘটার সুযোগ নাই। বরং আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভ্রুকুটিকে নারীর উপেক্ষা করতে না পারার অসহায় আত্মসমর্পন। আছে একজন পুরুষের সাথে থাকতে চাওয়ায় সকলের সম্মতি। সেটা ভরণপোষণের জন্যই হোক বা নিঃসঙ্গতা কাটাতেই হোক। সেই সম্মতির বাইরে যাওয়ার সাহস বা ক্ষমতা নারীর নাই।

গুলতেকিনের বিয়ের ঘটনাটাকে আমি ব্যবচ্ছেদ করতে চাই নাই। আমার মনে হয়েছে, তিনি এই বিষয়টাকে ব্যক্তিগতই রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারেই আগ্রহ বেশি। তাই কারো চাওয়া না চাওয়ার ধার না ধেরে, আমরা মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে চটকাতে ভালোবাসি৷ এবার মনে হয় আমাদের থামা দরকার। গুলতেকিন খান এবং আফতাব আহমেদ নিভৃতে ভালো থাকুন। তাদের জন্য শুভকামনা রইলো।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ