সোমবার , ১৬ অক্টোবর ২০১৭

ভবন নির্মাণে তদারকি না করে নতুন নতুন অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির দিকে ঝুঁকছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। নিয়ম অনুযায়ী ভবনের নির্মাণস্থল পরিদর্শন করে নকশার অনুমোদন দেওয়া, নিয়ম অনুযায়ী ভবন উঠছে কি না, আশপাশে পর্যাপ্ত খালি জায়গা রাখছে কি না, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, আগুন নির্বাপণের সরঞ্জামসহ ভবন নির্মাণের বিধিমালা মানছে কি না ভবন মালিকরা-তা তদারকি করার কথা। কিন্তু সেদিকে খেয়াল রাখছে না সংস্থাটি। এতে দিনকে দিন অবৈধ ভবনের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় নতুন নতুন অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে সংস্থাটি। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে জনবহুল এই নগরী।

রাজউক সূত্রমতে, ড্যাপের আওতাধীন এলাকায় প্রতিবছর গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার ভবন নির্মাণের নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। ইমারত বিধি অনুযায়ী ইমারত নির্মাণকাজ শুরুর ১৫ দিন আগে নির্মাণ-সংক্রান্ত তথ্য লিখিতভাবে রাজউককে অবহিত করতে হবে। এরপর নির্মাণকাজ শুরুর ১৫ দিন পরপর নির্মাণকাজের অগ্রগতির প্রতিবেদন রাজউকে জমা দিতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ নির্মাতা এ বিধান পালন করেন না। এসব নিয়ম ব্যত্যয় করার দায়ে রাজউক নকশার অনুমোদন বাতিল ও শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু রাজউক সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে না।

রাজউক কর্মকর্তারা বলেন, ভবন নির্মাণকালে রাজউকের অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকরা ভবন নির্মাণকাজ তদারকি করেন। তদারকিকালে তারা শুধু আর্কিটেকচারাল (স্থাপত্য) দিকটি দেখভাল করেন, স্ট্রাকচারাল (কারিগরি) দিকটি নয়। কারিগরি দিকটি তদারকি না করায় নির্মাণাধীন ভবনগুলোর বিএনবিসি (গুণগত মান) ঠিক রেখে নির্মাণ করা হয় কি না, তা রাজউকের আমলে থাকে না। তারা আরো বলেন, ভবন নির্মাণকালে প্রয়োজনীয় রড-সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণ ঠিকমতো দেওয়া হয় কি না, তা তদারকি করার দায়িত্ব যারা ভবনের নকশার ডিজাইন করেন সেই স্থপতি ও প্রকৌশলীদের ওপর। কিন্তু ভবন নির্মাতারা নকশার অনুমোদন পাওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট স্থপতি ও প্রকৌশলীকে বাদ দিয়ে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী অথবা অভিজ্ঞ মিস্ত্রির মাধ্যমে ভবন নির্মাণ করেন। এতে ভবনের গুণগত মান ও অনুমোদিত নকশাও ঠিক থাকে না।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ৫০০টি। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, এসব ভবনের অধিকাংশ অর্থের বিনিময়ে নির্মাণস্থল পরিদর্শন না করে আইন লঙ্ঘন করে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত অসাধু কর্মকর্তারা নকশার অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়া ভবনের মালিকরা নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা ভবনের বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না রাজউক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর ভবন তদারকির দায়িত্বে রয়েছে রাজউকের পাঁচজন অথরাইজড কর্মকর্তা। ফলে একজন অথরাইজড কর্মকর্তাকে নির্মাণাধীন সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি ভবনের কাজ তদারকি করতে হয়। জনবল সংকটের কারণে এ ক্ষেত্রে এ পাঁচ কর্মকর্তা দিয়ে ভবন তদারকি করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, নিয়ম-কানুন মানা হচ্ছে কি না তা তদারকির দায়ভার মূলত রাজউক ও সিটি করপোরেশনের। এ দুই কর্তৃপক্ষের বিশেষ দায়িত্ব আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না দেওয়া। যদি এর কোনো ব্যত্যয় হয়, তাহলে তাদের গাফিলতির জন্যই হয়েছে। মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিলেও আবার নিজেরাই পিছটান দেয়।

এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, এ ছাড়া আইন অমান্য করে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য স্থানীয় জনগণও দায়ী। তবে সেটাও রাজউক বা সিটি করপোরেশনের ওপরই বর্তায়। কারণ রাজউক বা সিটি করপোরেশন নিয়ম মানাতে পারছে না। জনগণকে নিয়ম মানানোর দায়িত্ব তাদের। আবাসিক এলাকায় যত্রতত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের এক অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ঢাকার প্রায় ৭০ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে নির্মিত ভবনের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যানও নেই। এখন পর্যন্ত রাজধানীতে নকশাবহির্ভূতভাবে প্রায় ১০ হাজার ত্রুটিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে রাজউক।

অন্যদিকে নতুন নতুন অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে রাজউক। সংস্থাটির অধীনে উত্তরা, পূর্বাচল ও ঝিলমিল আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে। সম্প্রতি বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, ২০২১ সালের মধ্যে নতুন করে রাজধানীতে প্রায় এক লাখ ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে উত্তরায় ১৫ হাজার, ঝিলমিলে ১৪ হাজার ও পূর্বাচলে প্রায় ৭০ হাজার ফ্ল্যাট হবে।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, কেরানীগঞ্জে ৩৮১.১১ একর ভূমিতে রাজউকের নতুন স্যাটেলাইট শহর ঝিলমিল হাউজিং প্রকল্প গড়ে উঠছে। এখানে ৪৯.৫০ একর জমিতে ১ হাজার ৭৪০টি প্লট রয়েছে। এ ছাড়া পূর্বাচলে ৬ হাজার ২২৭.৩৬ একর জমির ওপর গড়ে তোলা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি ১৯৯৬ সালে গ্রহণ করা হয়। এই আবাসিকে ৫ হাজার ১৬টি আবাসিক প্লটের পাশাপাশি এখানে ৬০ হাজার আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করবে সংস্থাটি।

রাজউকের উত্তরা তৃতীয় পর্বের ১৮ নম্বর সেক্টরে ২১৪.৪৪ একর জমির ওপর ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ‘এ, বি ও সি’-এ তিন ব্লকে ফ্ল্যাট হবে ১৫ হাজার ৩৬টি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, মানুষের আবাসিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিয়ম অনুযায়ী ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। তাই বলে ভবন নির্মাণের দিকে ঝুঁকছি তা নয়। রাজউকের অনুমোদনের বাইরে গিয়ে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে সেগুলো ভেঙে ফেলার কাজ চলছে। এ ছাড়া আবাসিকের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করা ভবনগুলো ভেঙে ফেলার নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬২ সাল থেকে তৎকালীন ডিআইটি (বর্তমান রাজউক) আশির দশক পর্যন্ত ১৩টি আবাসিক ও পুনর্বাসন এলাকা, তিনটি শিল্প এলাকা এবং নয়টি বাণিজ্যিক এলাকা নির্মাণ করে। ১৯৯২ সালে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকার প্রায় ৬ হাজার ১৫০ একর জমি নিয়ে পূর্বাচল নতুন শহর এবং ১৯৯৯ সালে উত্তরা তৃতীয় পর্ব ও কেরানীগঞ্জে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প হাতে নেয় রাজউক।

 অর্থ-বাণিজ্য থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ