রবিবার , ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ |

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের গণতন্ত্র যেমন

আব্দুল্লাহ আল রাশেদ   সোমবার , ১৮ নভেম্বর ২০১৯

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের হাওয়া চাঙ্গা হয়েছিল।বার্লিন দেয়াল ভাঙ্গার সাথে সমাজতন্ত্রের পতন গণতন্ত্রের জন্য একটি উন্মুক্ত প্লেইস তৈরী করে দেয়। আর তখনই পৃথিবীর দিকে দিকে পুঁজিবাদের সাথে গণতন্ত্রেরও ব্যাপক প্রসার ঘঠে। নতুন নতুন গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে এসে গণতন্ত্রের সাথে যুক্ত হয় নিত্য-নতুন উপাদান। যা গণতন্ত্রকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে । তাই এই শতাব্দীতে এসে গণতন্ত্রের সাথে জনআকাঙ্খা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো পরখ করলে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অবস্থা জানা যাবে।


এখনকার প্রভাবশালী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকেই মনে করে করেন গণতন্ত্র এই শতাব্দীতে এসে চরম হোচট খেয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আকাঙ্খার তফাৎ বেড়ে যাওয়ায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। গণতন্ত্রের অধঃপতনের চিত্র উঠে এসেছে Freedom House,  Polity এবং  Economists Intelligence এর রিপোর্টে। আন্তর্জাতিক এসকল সংস্থার রিপোর্টে প্রতীয়মান হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের অধঃপতন হচ্ছে। খোদ আমেরিকা ২০১৮ সালে  Freedom House এর রিপোর্টে তিন পয়েন্ট হারিয়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে লোকরঞ্জনবাদের মতো প্রলুব্ধকর চাল চালছেন নেতৃবৃন্দ। গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিকরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ছুতো দেখিয়ে অগণতান্ত্রিক প্রচারণায় গণতান্ত্রিক দেশের নেতা নির্বাচিত হচ্ছেন। যার ফলে গণতান্ত্রিক দেশে অগণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে। তাছাড়া সারাবিশ্বে ডানপন্থীরা শক্ত অবস্থান তৈরী করছে যার ফলে মধ্যপন্থীরা রাজনীতি ময়দানে ঠিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ডানপন্থিদের অভিবাসন বিরোধী নীতি, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মবিদ্বেষ তাদেরকে ভোটের রাজনীতিতে সফল করলেও বিশ্বরাজনীতির জন্য  হুমকি তৈরী করছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের সূচক নিম্নমুখী হওয়ার কারন হিসেবে মনে করেন গণতন্ত্রের প্রতি জনগনের আশা- আকাঙ্খাও অত্যধিক হওয়া। গণতন্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কতগুলো শাসনব্যবস্থা পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকলেও তা নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে এখনো বৈশ্বিক হওয়ার জন্য লড়াই করছে। যেমন- চীনা মডেল, রাশিয়ার নব্য জারতন্ত্র, রাজতন্ত্র এবং ইসলামী খেলাফত। হেগেলের ভাষ্যমতে দুটি ধারনার মধ্যে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এই দুটির মধ্যে একটি ঠিকে যাবে অন্যটির পতন হবে। এই সূত্রে একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রকে ঠিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।

এদিকে Freedom House এর রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায় গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ হচ্ছে। রিপোর্টে পশ্চাৎপদের কারন সমূহের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলোর জনগনের আস্থা অর্জনে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখা হয়েছে। সকল ধরনের গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্য ট্রাস্ট ডিফেসিট একুশ শতকের রাজনীতির বৈশিষ্ট্যে পরিণত হচ্ছে। যার ফলে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল-জোটের প্রতি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস কমে যাচ্ছে। এর ফলে একটি এ-পলিটিকাল সোসাইটির (অরাজনৈতিক সমাজ) উদ্ভব ঘটছে। এসকল বৈশিষ্ট্য গণতন্ত্রের অধঃপতনের পরিচায়ক।

২০১৮ সালের ফ্রিডম হাউস কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে শিরোণাম করা হয় "গণতন্ত্র সংকটাপন্ন "।  এই শিরোণামই একুশ শতকের গণতন্ত্রের হালচাল অনেকটা ব্যাখ্যা করে। গণতন্ত্রের এই সংকটের কারনগুলোর মধ্যে বলা হয় রাজনৈতিক অধিকার এবং বেসামরিক অধিকার গত এক দশকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। সংকটের তীব্রতা বেড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন মানব স্বাধীনতার উন্নয়নের জন্য করা অঙ্গীকার থেকে ফিরে আসে। এছাড়া চীন-রাশিয়ার মতো সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্রগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসন যখন তাদের নিজেদের সীমানা পেড়িয়ে অন্যান্য দেশে বিস্তার লাভের চেষ্টা চলছে তখন গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে যায়। তাছাড়া সারা বিশ্বে যেমন কতগুলো রাষ্ট্র মুক্ত হচ্ছে তেমনি কিছু রাষ্ট্র আংশিক মুক্ত কিংবা অমুক্ত অবস্থার দিকে প্রত্যাবর্তন করছে। তাই এই শতাব্দী গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের উভয়েরই সম্ভাবনা বিরাজমান।

এই শতাব্দীর গণতন্ত্রের একটি আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মোড়ল রাষ্ট্রগুলোতে গণতান্ত্রিক উপায়ে অগণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচিত হচ্ছেন। এমন সকল প্রতিনিধি তৈরী হচ্ছেন যারা প্রকৃত অর্থে অগণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে ক্ষমতার মসনদে বসছেন অথচ তারা অগণতান্ত্রিক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের নির্বাচনে মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্টিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যার নির্বাচনী প্রচারণার ভিত্তি ছিল রেসিজম, ধর্মবিদ্বেষ, অভিবাসন বিরোধী মনোভাব, বর্ণবাদ। কিন্ত এসকল অগণতান্ত্রিক প্রোপাগান্ডার উপর ভিত্তি করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে তিনি ক্ষমতার মসনদে বসে যান।

ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু গত দুই মেয়াদে ভারতে এমন একজন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন যিনি কিনা ভারতকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে পরিচিত করতে চান। রাষ্ট্রচিন্তকরা মনে করেন হিন্দুত্ববাদী অাদর্শে বিশ্বাসী বিজেপী তাদের হিন্দুবাদী প্রচারণা চালিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় এসেছে।ভারতকে বলা হয় ইউনিটি অব ডাইবারসিটির দেশ। নরেন্দ্র মোদীর দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতাগ্রহণ ভারতের গণতন্ত্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলে দিবে।

রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের রাজত্ব চলছে চতুর্থ মেয়াদে। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসতে তার জন্য সংবিধানও সংশোধন করা হয়। বিরোধীদের উপর দীর্ঘদিন যাবৎ দমন-নিপীড়ন ও বিরোধী কণ্ঠরোধ করে রাশিয়া অবতারবাদের রাজনীতি কায়েম করছেন পুতিন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বস্তুত সেখানে গণতন্ত্র অকার্যকর।

ইরানের শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক কিনা তা নিয়ে একাডেমীক মহলে আলোচনা-সমালোচনা বিরাজমান। কিন্তু যেহেতু ইরান নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবী করে সেহেতু তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা যাচাই করলে সেখানে ইলোক্টোরাল ডে ডেমোক্রেসি পাওয়া যায়। নির্বাচনে কারা পার্থী হবেন তাও সরকার তথা ধর্মপ্রধান নির্ধারন করে দেন। ইরানের শাসন ব্যবস্থা কে গণতন্ত্রিক দাবী করা হলেও তা প্রকৃত অর্থে একধরনের ইসলামতন্ত্র।

গণতন্ত্র বলতে জনগণ শাসন বললেও মেজোরিটির শাসন নয়। সারা বিশ্বে বর্তমানে লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির জোয়ার বইছে। ক্ষমতালিপ্সু লোকরঞ্জনবাদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের আবেগ-আকাঙ্খাকে তাদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তারা ধর্মকে ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদ এবং উগ্রবাদকে উসকে দেয়। ধর্মে বিশ্বাসী সকল মানুষের কাছেই ধর্মীয় অনুভূতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। লোকরঞ্জনবাদীরা সেই সুযোগটিও খুব ভালোভাবেই কাজে লাগায়। কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন রহিত করা  মোদি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল। এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠরা খুশি।  পাকিস্তানের সরকার প্রধান ইমরান খান নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে ঘোষণা দেন পাকিস্তান চলিত হবে মদিনার রাষ্ট্রনীতির উপর ভিত্তি করে । মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদের ধোঁয়া তুলে ক্ষমতায় বসেছেন। এই তালিকায়  রয়েছেন মিয়ামারের অং সান সূচী, চীনের শিং জে পিং এবং ইজরাইলের  নেতানিয়াহু।
গণতন্ত্রের ধারনার মধ্যে নতুন নতুন উপাদান সংযুক্ত হয়েছে। যার ফলে বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র আরো বেশী গ্রহণযোগ্য এবং আস্থাশীল হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। নতুন এই প্রবণতাগুলোর মধ্যে রেফারেন্ডাম বা গণভোগ অন্যতম। গণভোটের ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণকে আগের চেয়ে বেশী সম্পৃক্ত করা যায়।  অংশগ্রহণমূলক বাজেট এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নাগরিকদের গণতন্ত্রের দৃষ্টি নিবন্ধিত রাখতে কাজ করছে। গার্ডিয়ান ইনস্টিটিউশন তৈরি করা হচ্ছে, ফলে সরকারের কর্মকান্ডে আরো জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার আভাস দিচ্ছে। তাছাড়া রাজনীতির উপর বুদ্ধিজীবিদের নজরদারী রাখতে কিছু দেশে রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের অনুদান দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ  সিমিটার মনে করেন এসকল উপাদান গণতন্ত্রকে একুশ শতকে আরো বেশী প্রভাবশালী করবে।

মোটকথা একুশ শতকের গণতন্ত্রের আলোচনা যেমন জটিল হচ্ছে তেমনি বিভিন্ন গৌণ উপাদানের সংযুক্তির ফলে এই শতাব্দীতে গণতন্ত্রের চর্চা আরো বেশ জটিল হবে। একথা অনস্বীকার্য যে ভৌগলিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারনে সারা বিশ্বের গণতন্ত্র একই রকম হবেনা। কোথাও উদারনৈতিক গণতন্ত্র আবার কোথাও রক্ষণশীল গণতন্ত্র দেখা যেতে পারে। বিশ্বে শান্তি বজায় রাখার জন্য গণতান্ত্রিক পিস তত্ত্ব কাজে লাগানো যেতে পারে । তাছাড়া  Identity Politics এর এই যুগে একক পরিচয়ের বদলে বহু পরিচয় রাজনৈতিক বিভাজন থেকে রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করতে পারে। সর্বোপরি বলা যায় একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণতন্ত্রকে এটির প্রতিদ্বন্দ্বীদের মতোও অনেক চড়াই-উৎরাই পারি দিতে হবে।


রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ