রবিবার , ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ |

দেশের জাতীয় উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা

ওসমান গনি   মঙ্গলবার , ২৬ নভেম্বর ২০১৯

জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে দেশের প্রতিটি খাত কোন না কোন ভাবে যার যার অবস্থান থেকে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কারন কোন একক বা একক খাতের উন্নয়নে একটা দেশের জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব না। দেশের সকল খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটা দেশের জাতীয় অর্থনীতির পুরোপুরিভাবে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে থাকে। দেশের উন্নয়নের কথা বলতে গেলেই চলে আসবে গণমাধ্যমের কথা। গণমাধ্যমের আগে উন্নয়ন বাস্তবায়নের ভাবনা গাছ লাগানোর আগে ফল চাওয়ার মতো। উন্নয়ন ও গণমাধ্যম এ দুটি শব্দের উপস্থিতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি অপরটি ছাড়া ভারসাম্যহীন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের সাথে গণমাধ্যমের নিবিরতম সম্পর্ক রয়েছে। গণযোগাযোগ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহকে উপেক্ষা করে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি শুধুই কল্পনাবিলাস বৈ আর কিছু নয়। আর নিয়ন্ত্রিত ও শৃক্সক্ষলিত সংবাদ মাধ্যম কোন জাতির জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়। সার্বিক দিক বিবেচনায় আধুনিক গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মূলত সংবাদপত্র আর সংবাদকর্মীর মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দের প্রতিফলন ঘটে। তাই আধুনিককালে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতাকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিভুও বলা হয়।

একজন আত্মসচেতন ও বিবেকবান সংবাদকর্মী দেশ ও জাতির জন্য পথপ্রদর্শক। মূলত সংবাদকর্মীরা মানুষের আশা-আকাংখা, চাহিদা, প্রয়োজন ও স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। গণমাধ্যম তার স্ফূরণ ঘটাতে সহায়ক হয়। আর তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধি, সরকার বা রাষ্ট্রের। কোন অবহেলিত ও অনগ্রসর জনপদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রতিকার লেখনির মাধ্যমে চিহ্নিত করতে সংবাদকর্মী ও সংবাদপত্রে ভূমিকার গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আধুনিক প্রচার মাধ্যম সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সুবিধাবঞ্চিত জনপদ ও নাগরিকদের অধুনিক ও সমৃদ্ধ মানুষে পরিণত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আর গণমাধ্যমই পারে মানুষকে নতুন নতুন চিন্তা, ধারণা ও পদ্ধতি সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে।

অতীতে সাংবাদিকতার পরিসর সীমিত থাকলেও আধুনিকতাত্তোরকালে তা শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, আইসিটি, চাষাবাদ, ক্রয়-বিক্রয় থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু নেতিবাচক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণেই আমাদের দেশে রাষ্ট্রের এই অতিগুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গের পথচলা মোটেই নির্বিঘ্ন হয়নি। অপরাজনীতি ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে বরাবরই আধুনিক রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার কারণে আমাদের দেশে অনেক সময় সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং গণমাধ্যমকর্মীরা বারবার জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফলে তাদের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে নানাবিধ অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতা। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা, বাধা-প্রতিবন্ধকতা আর সংকীর্ণতা সত্ত্বেও আমাদের দেশের সংবাদকর্মী ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ইতিবাচকই বলতে হবে। একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, সাধারণ নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। মূলত, যে দেশে প্রচার মাধ্যম স্বাধীন-শক্তিশালী সে দেশে গণতন্ত্র উন্নত এবং উন্নয়নও গতিশীল। সুশাসনও মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এক্ষেত্রে অনগ্রসরতার কারণেই আমরা রীতিমত পশ্চাদপদ। গণমাধ্যমের বহুমাত্রিক ভূমিকা এবং গণমাধ্যম ও উন্নয়ন পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুনিবিড়। এ জন্য রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদ মাধ্যমকে বিবেচনা করা হয়। শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনার চালিকাশক্তি। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা, অর্জন, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দ প্রতিফলিত হয়। গণমাধ্যমকে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতিনিধি বলা চলে। মানবজীবন ও সমাজ উন্নয়নের একমাত্র মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। গণমাধ্যম দ্বারা সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন সাংবাদিক। আর উপজেলা পর্যায়ে একজন সংবাদকর্মীর চোখ থাকে সমাজের ঘটে যাওয়া একেবারে পিন থেকে কামান, ছোট থেকে বড়, ভালোমন্দ, সমস্যা-সম্ভাবনা সবকিছুতে। একজন সাংবাদিক নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে রাতদিন জীবনের সোনালি সময় ব্যয় করে গণমানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনার খোঁজে কান পেতে থাকেন। দিনের শেষে তার পাঠানো সংবাদ যখন পরদিন পত্রিকার পাতায় পাঠক হাতে পেলে বাস্তবের প্রতিফলন ঘটে। তখন হারানো সন্তান ফিরে পাওয়ার মতো আনন্দ লাগে সে সংবাদকর্মীর মনে। এটাই সংবাদকর্মীর সফলতা।

একজন নির্ভিক সংবাদকর্মী হলেন সমাজের নির্মাতা। সে গণমানুষের চাহিদা ও স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার পর সরকার বাস্তবায়ন করে। একটি অবহেলিত জনপদের খরব লেখনির মাধ্যমে সভ্যতার উচ্চতায় নিতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ভূমিকার বিকল্প নেই। নিজের স্বার্থ না দেখে গণমানুষের জন্য নিঃস্বার্থে কাজ করাই একজন নির্ভিক সংবাদকর্মীর কাজ। গণমাধ্যম সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে। সুবিধাবঞ্চিত জনপদের নাগরিকদের অধুনিক উন্নত সমৃদ্ধ মানুষে পরিণত করে। একমাত্র গণমাধ্যম পারে মানুষকে নতুন নতুন চিন্তা, ধারণা ও পদ্ধতি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত তথ্য সরবরাহ করে উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। আজকের যুগে গণমাধ্যম শিক্ষা, যোগাযেগ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, লাইফ স্টাইল, রেসিপি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, আইসিটি, চাষাবাদ, ক্রয়-বিক্রয় থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব চাহিদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে। নানা সীমাবদ্ধতা আর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও গণমাধ্যম সমাজের উন্নয়ন নিশ্চিত করছে। সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন-শক্তিশালী সে দেশে গণতন্ত্র উন্নত এবং উন্নয়ন ত্বতরান্বিত হয়ে থাকে।

একটি জনপদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি মূল্যায়নের সার্বিক মাপকাঠি হলো উন্নয়ন। উন্নয়নের ধারা ত্বরান্বিত করতে জনগণ গণমাধ্যমের ভূমিকার পক্ষে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অর্জনের পেছনে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তুপে পরিণত একটি দেশ ৪৮ বছরে এখন বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়নের অংশীদার। দেশের উন্নয়নে জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত।

অতীত পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, ক্ষমতাসীনরা সবসময়ই স্বাধীন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে নেতিবাচক। কিন্তু একথা ঠিক যে, গণমাধ্যম শুধু সরকারের ছিদ্রান্বেষণে ব্যস্ত থাকে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাবাদী শ্রেণি পরিবেষ্টিত সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সঠিত তথ্য দিয়ে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেয়। একই সাথে সরকারকে তাদের ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে আত্মসচেতন করে তুলতে সহায়ক হয়। আর গঠনমূলক সমালোচনা তো সরকারের জন্য ইতিবাচকই হয়ে থাকে। বস্তুত, স্বাধীন গণমাধ্যম জাতীয় উন্নয়নে যে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, তা আমাদের বিভিন্ন জাতীয় অর্জনের দিকে তাকালে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। কারণ, ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা অর্জন এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। বর্তমানে সমাজ দেহে যে বোধের জায়গা তৈরি হচ্ছে এর পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকাই প্রধান। গণমাধ্যম সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুর কাজ করে থাকে। গণমাধ্যম ছাড়া কোনোভাবেই সরকার ও জনগণের মধ্যে জনগণ কি ভাবছে, সরকার কি করছে তা প্রকাশ পাওয়া সম্ভব না। আজ মিডিয়া বা গণমাধ্যমের কল্যাণে পুরো পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা একে অন্যের জীবনযাত্রা, সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারছি। মূলত গণমাধ্যম জাতীয় উন্নয়ন, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসনের জন্য শক্তিশালী ও সহায়ক অনুষঙ্গ। তাই দেশের গণমাধ্যম গুলোকে কে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় কাজ করে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট


 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ