বুধবার , ০৮ July ২০২০ |

মীর আব্দুল আলীম

পেঁয়াজ উড়োজাহাজে উড়ে এসেও ভোক্তাহূদয় জুড়াতে পারেনি। পেঁয়াজ নিয়ে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে তা চলছেই। সরকার দেশে পেঁয়াজেরদাম কমিয়ে আনতে বিদেশ থেকে কার্গো বিমানে করে পেঁয়াজ আমদানি করছে। সরকারের পক্ষ থেকেবলা হয়েছে- বিমানে পেঁয়াজ এসেছে চিন্তার কারন নেই। উড়াল পেঁয়াজ দেশেএলেও ভোক্তাদের দ:ুশ্চিন্তা রয়েই গেছে। পেঁয়াজের মূল্য কিছুটা কমে আবার চড়েছে। অতীতেরসব রেকর্ড ছাড়িয়ে পেঁয়াজের কেজি এখনও ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। পেঁয়াজ নৈরাজ্য চলছেই; চলবেহয়তো আরও অনেটা সময়। এটা দেখার কেউ নেই। সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরামুনাফা লুটছে। পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষের এখন আর পেঁয়াজখেতে পারছে না। প্রশ্ন হলো, পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের নৈরাজ্য আর কতদিন চলবে?  আসলে এই বাংলায় আমরা সবাই রাজা! কারোরই যেন অর্থকড়িরঅভাব নেই! তাই ১ টাকার জিনিস ২ টাকায় কিনতেও কোন নেই সমস্যা। ভাবখানাতো এমনই। বাজারেপণ্যমূল্য বেড়েছে অবিশ্বাস দরে। দাম বাড়ে হু হু করে। পিঁয়াজের বাজারতো রিতিমত আগুনলেগেছে। ২৫ টাকার পিয়াজ কিনতে হচ্ছে ১৫০ টাকারও বেশি মূল্যে। এতো বেড়েছে পিয়াজের দামতবু কেনা কমেনি। জনগণ বাড়তি দামে পণ্য কিনছে। পিঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের এতো দাম! তবুও দেশেরকোথাও কোন প্রতিবাদ নেই। আমজনতার মুখে কুলুপ আঁঁটা। বলতে গেলে জনগণের গাঁটে পয়সা আছে;তাই গায়ে লাগছে না এই আর কি!

ভাবা কি যায়,পিয়াজ কয়েকদিনের ব্যবধানে১২৫ টাকা কেজিতে বেড়েছে। কোন কোন পণ্য ৩০/৪০ টাকা থেকে লাফিয়ে বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে।কাঁচামরিচ ও বেগুন ও অন্যান্য সবজি সবটার দামই বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ তিনগুন হয়েছে। ৩০টাকার শসা বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কাঁচামরিচ ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা দরেবিক্রি হলেও চলতি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। আর মাছ-মাংসের দামতো আগেথেকেই বেড়ে আছে। ভরমৌসুমেও ইলিসের দাম চড়া। কেজি প্রতি পাঙ্গাস ১৪০-১৬০, সিলভার কার্প১৬০-২০০, শিংমাছ ৬০০-৮০০, তেলাপিয়া ১৮০-২২০, দেশি মাগুর ৬০০-৮০০, চায়না পুঁটি ১৫৫-১৯০।দেশি আলু (লাল) ৩০-৪০, করলা ৬০-৮০, পটোল ৬০, কাকরোল ৫৫-৬০, চিচিঙ্গা ৫০-৬০, মিষ্টিকুমড়া (কাটা পিস) ২৫-৪০, লাউ ৪০-৬০, কচুর লতি ৫০-৬০, গাঁজর ৫০-৮০ টাকা, পেঁপে ৩০-৩৫টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এটাই বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের হালচিত্র। শুধু তরিতরকারিনয় ছোলা, ডাল, মাছ মাংস সব কিছুর দামই এখন বেশ চড়া।

এখন দেশে অতি খরা হয়নি, নেই হরতালঅবরোধও। তাহলে কেন এভাবে বাড়লো পণ্যমূল্য? চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করারজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া সত্ত্বেও তার সুফল অনেক সময় ধরাছোঁয়ারবাইরে থেকে যায় পরিবহন চাঁদাবাজি ও মজুদদারির কারণে। এবারো বেড়েছে। আগে বাজার অনেকটাইনিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা।দ্রব্যমূল্য এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সরকার কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। মন্ত্রনালয় থেকেওদ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদেরসঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে; পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেচিঠি দিয়েছে। সারাদেশে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভাগীয়এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। কিন্তু তাতেও কি দ্রব্যমূল্যনিয়ন্ত্রণে আছে? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আর জেলাপ্রশাসনের তাবৎ হুমকি ধমকিকে কি পাত্তাদিচ্ছে ব্যবসায়ীরা? উল্টে পিয়াজের দামে আগুন লাগিয়ে ছেড়েছে।

বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং ভারতেরবাজার থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে পিয়াজের দাম এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৭৭ দশমিক১০০ শতাংশ। ২৫ জুলঅই খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পিয়াজের দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা। ২ সপ্তাহআগে ছিল ৮০-৯০ টাকা। এখন (১৩ নভেম্বর) ১৫০-১৬০টাকা। সরবরাহ বাড়াতে বিকল্প উৎস থেকেপিয়াজ আমদানি শুরু হলেও তার প্রভাব পড়েনি বাজারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মূল্য বৃদ্ধিরলাগাম টেনে ধরা না গেলে সামনে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০টাকা পর্যন্ত দাম উঠতে পারে পিয়াজের।প্রশ্ন হলো তবে কি দেশে পেঁয়াজ মজুত নেই? বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারা গেছে, দেশে বিপুলপরিমাণ পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করেই ইচ্ছা অনুযায়ী পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েরাতা-রাতি আঙ্গুল  ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। বিশ্লেষকরামনে করছেন, এটা অতি মুনাফা ছাড়াও সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের ষড়যন্ত্রও হতে পারে। সরকারকেবিব্রত করা এবং বিপদে ফেলাই মূল উদ্দেশ্য হতে পারে। বিষয়টি সরকারকে ভালোভাবে ক্ষতিয়েদেখতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে বলছে, প্রতিবছর দেশে ১৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদারয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবেই উৎপাদন হয় প্রায় ১২ লাখ টন। আর চাহিদার মাত্র ৩ লাখ টনপেঁয়াজ বছরের বিভিন্ন সময়ে আমদানি করা হয় ভারত থেকে। মানুষের পকেট মেরে রাতারাতি বাড়ি-গাড়িআর ব্যাংক ব্যালেন্স করার জন্যই এসব করা হচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এটা চলমান প্রক্রিয়া।ফি বছরধরেই হয়। তবে সকালে ৬০ দুপুরে ৮০ আর রাতে ১০০ টাকা এভাবে কি পৃথিবীর আর কোনোদেশে দাম বাড়ে? এ দেশে হুট্ হাট্ পণ্যমূল্য বেড়ে; বাড়ে জনগণের নাভিশ্বাস। এটা নতুননয় যে কোন অজুহাত মানেই পণ্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়া। ভারত থেকে পিয়াজের আমদানী বন্ধহয়েছেতো খবর পেয়ে পিঁয়াজের দাম ব্যবসায়ীরা এক লাছে উঠিয়েছে ১শত টাকার উপরে। তা বর্তমানেঠেকেছে ১৬০ টাকায়।

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন পাগলা ঘোড়াছুটছে তো ছুটছেই। বর্তমানে অস্থির হয়ে উঠেছে বাজার। কোনোই সুখবর নেই। চাল, ডাল, তেল,পেঁয়াজ, রসুন, ডিম, আলু, খেজুর, মাছ, মাংস, মসলা, কাঁচামরিচ, শাকসবজি, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয়প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় হেন পণ্য নেই যে, গায়ে মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপনেই-তফাৎটা শুধু ডিগ্রির, কোনোটার বেশি কোনোটার কম। এবার নতুন বাজেটের পরও পণ্যবাজারেতার বিরূপ প্রভাব পড়েনি। তাই সরকারি মহল সেসময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলো। কিন্তু২টামাস পার না হতেই কারণ ছাড়াই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ লাগে। ব্যবসায়ী-মজুদদাররামুনাফায় পকেট ভারি করার মওকা ছাড়ে না। সুযোগমত দুটো পয়সা কামিয়ে নিতে এরা কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নেয়।মজুদ গড়ে তোলে, দফায় দফায় মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ে।

এসবমুনাফা খোররা এদেশের অসহায় মানুষের কথা ভাবে না। এখন নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের চাপিয়েদেয়া দাম দিয়ে খাবার কিনতে পারছে না। ওরা ২ বেলা পেট পুরে খেতে পারছে না। আসলে মানুষকেজিম্মি করে অধিক মুনাফা লাভের ব্যবসায়ীদের এই খেলা কোনো সরকারই বন্ধ করতে পারে না,একথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সরকারের সৎ ইচ্ছা থাকলে এই খেলা বন্ধ করা অবশ্যই সম্ভব,কিন্তু এই সম্ভবকে অসম্ভবের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারকে অবশ্যই হার্ড লাইনে চলতে হবে।প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে সেসব অসাধু ব্যবসায়ীদের যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণকরতে তাদের সকল বিবেকহীন আয়োজন সম্পূর্ণ করেছে। অর্থনীতিতে একটা কথা আছে, চাহিদার তুলনায়উৎপাদন যতো কম হবে পণ্যের দাম বাজারে ততো বেশি হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণকরা সহজ কাজ নয়। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও চারদলীয় জোট সরকার এবং বর্তমানক্ষমতাসীন সরকারের সময় দেখেছি, যতবার পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, ততবার বাজারেমূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা সরকারকে বারবার আশ্বাস দিচ্ছে, পণ্যের দাম বাড়বে না।কিন্তু বাস্তবে তা তামাশা মাত্র! তার কোনো প্রভাব কখনই বাজারে পড়ে না।

দেশব্যাপী ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অসংখ্য অসৎ ব্যবসায়ী সব সময়ই বেপরোয়া। তারা মন্ত্রী, সচিব, ডিসি এসপিদেরছোঁড়া হুংকারকে দিব্যি ধিক্কার দিয়ে চলে। অসৎ বৃহৎ ব্যবসায়ীদের একটি গোষ্ঠী বড়াবরইপণ্যমূল্য বাড়িয়ে তাদের পকেট স্ফীত করে চলেছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। দ্রব্যমূল্যেরনিয়ন্ত্রণ সরকারকে যেকোনো মূল্যে নিতেই হবে। এজন্য বিরোধীদলগুলোকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়েএগিয়ে আসতে হবে। এভাবে অহেতুক পণ্যমূল্য বাড়ার ঘটনা বোধ করি কোনো সভ্য সমাজে ঘটে না।অন্য কোনো দেশেও তার নজির নেই। এভাবে আর চলতে পারে না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এখনইওদের রুখতে হবে। সরকার, জনগণ দলমত নির্বিশেষে ওদের ওপর দুর্বার গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তেহবে। প্রতিবাদি হতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে এর আর বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না।

দ্রব্যসামগ্রীঅর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসমূহের মূল্য স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে বর্তমান পরিস্থিতিতেযা করা দরকার তাহলো- সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তাদের নেয়া পদক্ষেপগুলো কার্যকরকরতে হবে। যেকোনো মূল্যে মধ্যস্থানীয় শ্রেণির কারসাজি বন্ধ করতে হবে। সরকারকে ব্যবসায়ীদেরওপর বাজার নিয়ন্ত্রণের নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয়দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য সামঞ্জস্য আছে কিনা নিয়মিত তা তদারকি করতে হবে। দোকানদারদের কাছথেকে চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজি বন্ধের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিবন্ধ করতে হবে। বাজাওে যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি, তা বেশি করে যোগান দিতে হবে। পাইকারিবাজার থেকে মধ্যশ্রেণির গোষ্ঠী যাতে স্বার্থ হাসিল না করতে পারে, সেজন্য পাইকারি বাজারথেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সরকারি নিজস্ব পরিবহন ও জনবলের মাধ্যমে খুচরা বাজারে পণ্যসামগ্রীপৌঁছে দেয়া যেতে পারে। তাতে করে চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে। বেশি করে পণ্য আমদানিকরে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করা। আরো বেশি করে সরকারি বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করে সুষ্ঠু ওস্বচ্ছভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি ব্যবসায়ীদের

শপথ নেয়া উচিত-আমরা পণ্যসামগ্রী মজুদের মাধ্যমে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয়পণ্যের মূল্য বাড়াবো না এবং পণ্যসামগ্রীতে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করবো না।  সর্বোশেষ, আগাম সতর্ক বার্তার মতো উচ্চারণ করা যায়,বাজার একবার চড়লে সেই চড়া বাজার আর নামতে চায় না। এটা হচ্ছে অতীতের অভিজ্ঞতা। সে জন্যপণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে যা যা করা দরকার তা সরকারকে করতে হবে। এজন্য বাজার মনিটরিংয়েসরকারকে আরও চৌকস হতে হবে। আর তাতে হয়তো জনগনের কিছুটা মুক্তি মিলতে পারে।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ