বৃহস্পতিবার , ১৯ অক্টোবর ২০১৭

ময়লা-বাণিজ্যের ২৪০ কোটি টাকা যায় কার পকেটে?

  বৃহস্পতিবার , ১৯ অক্টোবর ২০১৭

হাসান হামিদ:

পরিচ্ছন্ন বছর-২০১৬উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একটি হাস্যকর মন্তব্য করেছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আহ ম মোস্তফা কামাল। আমার খুবমনে আছে, তিনি সেদিন বলেছিলেন, ঢাকায় আগামী দেড় থেকেদুই বছর পর কোনো প্রকার ময়লা-আবর্জনা খুঁজে পাওয়া যাবে না! সেখানে তিনি বলেন,‘দুই বছরের মধ্যে খোঁজলেও আপনারা আর ময়লা-আবর্জনা পাবেন না। এজন্য আমাদের যা কিছু করা দরকার তাই করবো।সরকার তারপর কী কী করেছে আমরা প্রতিনিয়ত তা ঠের পাচ্ছি!

কিছুদিন আগে চলন্তিকা মোড়ের নীলগীতা রোডে একটি ম্যানহোল পরিষ্কার করতে গিয়ে সতের-আঠারোবছর বয়সী ওই তরুণ নিখোঁজ হয়। কিছু ময়লা পরিষ্কার করার পর পানির স্রোত বেড়ে যায়এবং তার টানে সে আরও ভেতরে ঢুকে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। আবার, গত ১৮সেপ্টেম্বর  একটি অভিজাত পত্রিকার প্রথমপৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতেবাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত ২০ কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে।বছরে এই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪০ কোটি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ময়লাসংগ্রহ করা হয় এবং সিটি করপোরেশন নির্ধারিত ফির চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হয়করপোরেশনের বাসিন্দাদের। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের লোকজন, আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বা তাঁদের ঘনিষ্ঠব্যক্তিরা এই ময়লা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন।

পত্রিকার প্রতিবেদন ও ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, প্রথমেযখন বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা শুরু হয়, তখনময়লা সংগ্রহকারীকে দিতে হতো ১০ টাকা। ২০০৯ সালে সিটি করপোরেশন ৩০ টাকা ফি নির্ধারণকরে দেয়। তবে সিটি করপোরেশন এই টাকার কোনো ভাগ পায় না। সেই ফি এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকায়ঠেকেছে। অভিজাত এলাকাগুলোতে এই ফি আরও বেশি। ভবিষ্যতে হয়তো আরও বাড়বে। এ ব্যাপারেসিটি করপোরেশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।  বেসরকারিভাবেযেসব প্রতিষ্ঠান ময়লা সংগ্রহ করে তাদের একটি সংগঠনও রয়েছে; নাম প্রাইমারি ওয়েস্ট কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডারস (পিডব্লিউসিএসপি)।এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহযোগী সংগঠন হিসেবে সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত। সংগঠনটি ইতিমধ্যেময়লা নেওয়ার জন্য ফি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করেঅনেকেই হয়তো বড়লোক হচ্ছেন। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।সিটি করপোরেশন শুধু নির্ধারিত জায়গায় রাখা ময়লার কনটেইনার এবং ময়লা রাখার ঘর বাসেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকে ময়লা সংগ্রহ করে।

আমরা দেখেছি, প্রতিটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেরআগে ঢাকা মহানগরীকে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করা থেকে সবুজ ঢাকা,বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন মেয়রপ্রার্থীরা। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিরবাস্তবায়ন হয় না কখনোই। এ রকমই কি চলবে? সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরখুব কমই রাস্তার ময়লা ঝাড়ু দেওয়ার কাজটি ঠিকভাবে করেন। অভিজাত হিসেবে পরিচিত নয়এমন সব এলাকার অবস্থা খুবই নাজুক। সড়কের আশপাশে ময়লা পড়ে থাকে দিনের পর দিন।পরিষ্কার  করার নামটি কেউ করেনা। একসময় এসব ময়লা মাটির সঙ্গে মিশে যায় কিংবা ড্রেনে পড়ে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাকেবাধাগ্রস্ত করে।

সিটি করপোরেশনসব সময় শহর পরিচ্ছন্ন না হওয়ার জন্য স্বল্প বাজেট ও জনবলের অভাবকে দায়ী করে থাকে।তাই যদি হবে তাহলে প্রথমে করণীয় হচ্ছে বাজেট ও লোকবল বাড়ানো। আর সেটা করা যদিসম্ভব না হয় তাহলে বেসরকারিভাবে বাসাবাড়ি থেকে যেভাবে টাকার বিনিময়ে ময়লা সংগ্রহকরা হচ্ছে, একইভাবে রাস্তাঘাট, অলিগলি পরিষ্কারের কাজটিও বেসরকারিভাবে করা যেতে পারে। ন্যায্য ওযুক্তিসংগত ফির বিনিময়ে এটা করা যেতেই পারে। শহরটা তো অন্তত পরিষ্কার থাকবে। তবেএই রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার অছিলায় যাতে আবার কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য না হয়,সেটাও দেখতে হবে। তবে নগর অপরিচ্ছন্নথাকার সব দায় সিটি করপোরেশনগুলোর ওপর না দিয়ে নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। আমরানগরবাসী সবাই কি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি? এইনগরটা এত নোংরা হয় সে আমরা করি বলে। আমাদের অনেকের স্বভাব হচ্ছে যেখানে সেখানেময়লা ফেলা। উন্নত দেশগুলোতে বাসাবাড়ি বা রাস্তাঘাট নোংরা করলে মোটা অঙ্কের অর্থজরিমানা করা হয়। আমাদের দেশেও সে রকম জরিমানার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তবেই যদিস্বভাব বদলায়।

বিশ্বব্যাংকেরএকটি সমীক্ষাতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে প্রতিদিনবর্জ্য জমা হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে গৃহস্থালি ও দোকান থেকেপ্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টন ময়লা তৈরি হয়। ঢাকায় এখন দুটি সিটি করপোরেশন। কিন্তুবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই দুই করপোরেশন খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি।বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাসাবাড়ির ময়লা দূর হলেও রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই করুণ।রাজধানীর খুব কম এলাকা আছে, যেখান থেকে নিয়মিত ময়লা অপসারণকরা হয়। আমরা আশাবাদী সামনে খুব ভালো কিছু হবে। শেষ করছি শামসুর রাহমানের কবিতা দিয়ে:

'আস্তাবলের দিকেঅন্ধকার, ঝুলছে নিষ্কম্প স্তব্ধতা;
আর সেই বেতো ঘোড়াটা অনেকক্ষণ ধরে ঝিমোচ্ছে
নিঃশব্দ কোনো আফিমখোরের মতো, মাঝে মাঝেশুধু
ফোলা পা নাড়ছে ঘাড় বাঁকিয়ে

(সেই ঘোড়াটা)

লেখক- গবেষক ওকবি, ঢাকা ।

 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ