শনিবার , ১১ জানুয়ারী ২০২০ |

আতিক হেলাল:
বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ছিলেন উপমহাদেশের একজন স্বনামধন্য আইনবিদ।সেইসাথে তিনি ছিলেন একজন যথার্থ সংস্কৃতবিান ব্যক্তিত্ব,যিনি বিচারপতির আসনে অধিষ্ঠিত থেকে সুযোগ সীমিত থাকা সত্ত্বেও নানান ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করে সাধারণ মানুষরে ভালোবাসা অর্জন করেন।মানবতাবাদী সমাজহতিষৈী,আইনের শাসন ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম ‘সার্ক’-এর অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্ঠা বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের আজ ১০৯ তম জন্মবার্ষিকী।১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জানুয়ারি কোলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের জন্ম।১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।
আমরা জানি,সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় আইন পেশায় বাঙালি মুসলমানের প্রবেশ অনেক বিলম্বে।উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে পাশ্চাত্যে শিক্ষিত মুসলমান আইনজীবীর সংখ্যা ছিলো অতি নগণ্য।অবিভক্ত বঙ্গে স্যার সৈয়দ আমীর আলী (৬ এপ্রিল ১৮৪৯-৩ আগষ্ট ১৯২৮)কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলমান বিচারপতি নিযুক্ত হন ১৮৯০ সালে।এরপর তাঁর পুত্র সৈয়দ তারক আমীর আলীসহ আরও অনেক বাঙালি মুসলমান হাইকোর্টের বিচারপতি হন।সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ হাইকোর্টেও বিচারপতি নিযুক্ত হন পাকিস্তান প্রতিষ্টার পর।তৎকালীর হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে তাঁর এই সম্মানজনক আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে তখনকার সমাজে বাঙালি মুসলমানদের জন্য উচ্চ আদালতসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের রুদ্ধ দ্বার উন্মোচিত হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে বিচারপতি মোরশেদ ছিলেন সত্যিই এক অনন্য ব্যতিক্রম।তিনি ছিলেন তাঁর কর্মক্ষেত্রে যেমন,তেমনি সামাজিক, সাংস্কৃতকি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের এক উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক।সামাজিক দায়বদ্ধতার কারনে তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিলো অনেক প্রসারিত।তাই তো এক পর্যায়ে তিনি প্রধান বিচরপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হতে দ্বিধা বোধ করেননি।বিচারপতি-জীবনে তিনি অনেকগুলো জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঐতিহাসিক,সময়োপযোগী রায় দিয়ে স্বৈরশাসনের মধ্যেও আইনের শাসন সমুন্নত রাখেন।
বাংলা-ইংরেজি ছাড়াও আরও কয়েকটি ভাষায় তাঁর দখল ও পাণ্ডিত্য ছিলো।আইন ছাড়াও তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতি বিষয়ে বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন।অখন্ড পাকস্তিানে ও স্বাধীন বাংলদেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য ভূমিকা রেখে গেছেন।নর্ভিজোল গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি ছিলেন একজন অবিচল প্রবক্তা।সর্বোপরি,তাঁর আর্কষনীয় ব্যক্তিত্ব ও বৈদগ্ধ সকল প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও উজ্জ্বলতাকেও অতিক্রম করেছে।
জন্ম ও পরিবারঃ পারিবারিক সূত্রমত,েহযরত ইমাম হোসেনের বংশধরদের একজন,মুফতি সৈয়দ আলী রাশেদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের প্রথম দিকে সদর দেওয়ানি আদালতের বিচারক ছিলেন।তিনি তাদরে র্পূবপুরুষদরে একজন।মাহবুব মোরশদেরে পিতা সৈয়দ আবদুস সালেকও একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন।কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করওে তিনি যোগ দেন বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে।জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালক্টের হসিবেে তিনি বগুড়া,দিনাজপুর প্রভৃতি জেলায় নিযুক্ত ছিলেন। একজন ধর্মপ্রাণ,সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা হসিবেে তার বেশ খ্যাতি ছিলো।মাহমুব মোরশেদের মা আফজালুন্নেসা বেগম ছিলেন শরেে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বোন।মাতামহ কাজী ওয়াজেদ আল ছিলেন  উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান আইন গ্র্যাজুয়টে প্রখ্যাত সমাজ-সংস্কারক নবাব আবদুল লতিফের  জ্ঞাতি ভাই।১৯৩৯ সালের ১ অক্টোবর কোলকাতার মেয়র একেএম জাকারিয়ার কন্যা লায়লা আরজুমান্দ বানুর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মাহবুব মোরশেদ।
শক্ষিা: শিক্ষাজীবনে মাহবুব মোরশেদ একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন।স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিতে  তিনি প্রথম হন।১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন।প্রবশেকিা পাসের পর তিনি কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৩১ সালে অর্থনীতিতে সম্মানসহ ডিগ্রি লাভ করেন।এরপর কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং প্রথম শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রি নেন যথাক্রমে ১৯৩২ও ১৯৩৩ সালে।কলেজজীবনে তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়ও সম্পৃক্ত হন।প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনের তিনি সম্পাদকও ছিলেন একবার।একই সময়ে তিনি তুখোড় বক্তা হসিবেওে খ্যাতি অর্জন করেন।তিনি কোলকাতা বশ্বিবদ্যিালয়ে বিতর্ক দলের নেতৃত¦ও দিয়েছেন।কলেজজীবনে তিনি ক্রীড়াক্ষেত্রেও সুনাম অর্জন করেন।৩০-এর দশকে মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের সংগঠকের দায়িত্বও পালন করেন।সেকালে মুসলমান তরুণদের মধ্যে খেলাধুলায় অংশগ্রহণে একধরনের অনীহা ও অবহেলা ছিলো,তরুণ মাহবুব মোরশেদ সেই নেতিবাচক অবস্থা দূরীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করেন।
আইন পেশায়ঃ মাহবুব মোরশেদ কোলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হসিবেে কাজ শুরু করেন ১৯৩৪ সালে।তবে তিনি মামা ফজলুল হকের সহকারী না হয়ে সুভাষ চন্দ্ররে অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু(১৮৮৯-১৯৫০) এবং খ্যাতনামা অবাঙালি আইনজীবী কে বি খাইতানের জুনিয়র হয়ে কাজ করার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেন।এর অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য যুক্তরাজ্য যান।১৯৩৮সালে তিনি লন্ডনের বিখ্যাত লনিকনস ইন থেকে বার অ্য্যট ল(ব্যারিস্টার) ডগ্রিি লাভ করেন।দেশে ফিরে তিনি আবার আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং ১৯৫১ সালে ঢাকা হাইকোর্ট বার এ যোগ দেন।১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বারে প্র্যাকটিস করেন।ভাষা আন্দোলন,৫৪র নির্বাচন,যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা এবং শেরে বাংলার নেতৃত্বে গঠিত সেই সরকারের  কেন্দ্র কর্তৃক বরখাস্ত হওয়া,রাজনৈতিক নেতাদের উপর নানামুখী নির্যাতন ইত্যাদি ঘটনায় সময়টা ছিলো উত্তাল।এসব ঘটনা নিয়ে তিনিও সচেতন ছিলেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলেনে নিজেকে ইতিবাচকভাবে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।১৯৫৫ সালে,যখন মোহাম্মদ আলী(বগুড়া) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী,তখন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারক হিসাবে  যোগ দেন।১৯৫৬ সালে পাকিসÍানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে যাঁরা সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেন, মাহবুব মোরশেদ ছিলেন তাদেরই একজন।
বচিারপতরিূপঃে মাহবুব মোরশেদ ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন ১৯৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে।দেশে তখন হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্ট সরকার।পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে।এই সময়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকও কছিুদনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী ছিলেন।তিনি আইনের শাসনের অবিচল প্রবক্তা ছিলেন।
১৯৫৮-এর অক্টোবরে জেনারেল আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।সংসদীয় গণতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায়।মানুষের সব মেীলিক অধিকার হরণ করা হয়।তখন বিচারপতির আসনে থেকে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়েছে।এর মধ্যে অনেক মামলা ছিলো তৎকালিন প্রতাপশালী সরকারের বিরুদ্ধে।মরহুম বিচারপতি আবদুর রহমান চেীধুরীর মতে,বিচারপতি মোরশেদের অনেকগুলো রায় ছিলো ইতিহাসের মাইলফলক,দেশের সাংবিধানিক আইনের ম্যাগনাকার্টা স্বরুপ। একবার (১৯৬৪) পশ্চিমবঙ্গের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লো পূর্ব পাকিস্তানে। বিচারপতি মোরশেদ হাই কোর্ট থেকে সুয়োমোটো (স্বাপ্রণোদিত রুল) জারি করলেন,যার ফলে এদেশের সংখ্যালঘুদরে উপর কোনো আঘাত আসতে পারেনি। বিচারপতি মোরশেদ কিছুকাল পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টেরও(আপিল বিভাগ) এডহক বিচারক ছিলেন।সেখানেও তিনি তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।এর আগে,১৯৪৩ সালে বেঙ্গল ফেমিন এবং ৪৬-এ দাঙ্গার সময়ে তিনি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত থেকে অনেক মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজেও অংশ নিয়েছেন।৪৭-এর দেশভাগের পর নহেরেু লিয়াকত চুক্তিতেও তিনি অগ্রণী ভূমকিা রখেছেলিনে।
বিচারপতি মোরশেদ প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায়ই প্রচন্ড সাহসিকতা ও গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন।১৯৬৬ তে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফার খসড়া প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করেন,যে ৬ দফার কারণে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাবরণ করতে হয়।শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যের  কারণেই বিচারপতি মোরশেদ ৬ দফা প্রণয়নে সম্পৃক্ত হননি,৬৫-এ যুদ্ধের পরে তিনি উপলদ্ধি করেন যে,পূর্ববাংলার প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থাও যথেষ্ট মজবুত ছিল না।এই বিষয়টিও গভীরভাবে তাঁর চিন্তার মধ্যে ছিলো।
১৯৬৯-এ আইয়ূবের গোলটেবিল বৈঠকে বিচারপতি মোরশেদ ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট দাবি করেছিলেন।তাঁর যুক্তি ছিলো,ওয়ান ইউনিট পাকিস্তান ভেঙে দেয়ার পওে জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্ববাংলা ছিল সংখ্যাগরিষ্ট এবং এ অঞ্চলের ভোটেই পাকিস্তান গঠিত হয়। যে কারণে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন পূর্ব বাংলার প্রাপ্য।সেই হসিবে,েএই অঞ্চলে যে দল বেশি আসন পাবে,সেই দলই কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের দাবিদার।
জানা যায়,১৯৭১-এর ৮ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের একদল আইনজীবী পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিশাবে টিক্কা খানের শপথ গ্রহণের বিষয়ে বিচারপতি মোরশেদের কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি দৃঢ়তার সাথে তখন বলেছিলেন,এই মুহুর্তে দেশে একটা সাংবিধানিক ভ্যাকুয়াম চলছে,এই পরিস্থিতিতে টিক্কা খানের শপথ গ্রহণ সমীচীন নয়।আর একটি ঘটনার কথা বলতে হয়।১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে এক সাক্ষাতে বিচারপতি মোরশেদ তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের জন্য পরামর্শ দেন এবং দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন।১৯৯৮ সালে ঢাকায় বিচারপতি মোরশদেকে এক স্মরণ সভায় তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব  তবারক হোসেন এই তথ্য উল্লেখ করেন।
বিচারপতি মোরশেদ একজন প্রগতিশীল ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন।তিনি কখনো কোনো সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সাথে হাত মলোনন।ি তিনি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সাহসের সঙ্গে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।সর্বোপরি,বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আন্দোলনে বিচারপতি মোরশেদ ছিলেন অন্যতম প্রধান রুপকার, একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই।

[আতিক হেলাল: কবি, শিশুসাহিত্যিক, জীবনসদস্য, বাংলা একাডেমি]

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ