মঙ্গলবার , ২৪ অক্টোবর ২০১৭

এশীয় আর্থিক সংকট ও বাংলাদেশের আর্থিক খাত

  মঙ্গলবার , ২৪ অক্টোবর ২০১৭

গত সপ্তাহে আমি এশীয় আর্থিক সংকটের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। এই সংকটের পর দুই দশক কেটে গেলেও এর রেশ কিন্তু কাটেনি। বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলোতে ফের ব্যক্তি ও কর্পোরেট খাতে দ্রুত ঋণ বাড়ছে। চীনে এই আমানত-ঋণ অনুপাত ৯০%-এ উঠে গেছে। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়াতেও ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। এতে ঝুঁকিও বাড়ছে। আর পাশাপাশি বাড়ছে ঋণ খেলাপির হার। এশীয় আর্থিক সংকটের পর খেলাপি ঋণের হার ব্যাপক হারে কমে গিয়েছিল এবং এক পর্যায়ে এসে তা স্থিতিশীল হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা চলে, ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪০%। এই হার ২০১৬ সালে ৩%-এ নেমে এসেছিল। কিন্তু চীনসহ এশিয়ার অনেক দেশেই গুণ-মানের ঋণ দেবার প্রবণতা কমে আসছে। আর তাই খেলাপি ঋণের হার বাড়ছে। আর্থিক খাতের তারল্য ও ঋণের যে চক্র রয়েছে তাতে সংকটের আগমুহূর্তের প্রবণতা ফের সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। এই ‘প্রোসাইক্লিকাল’ প্রবণতা ঝুঁকি বাড়ায়। আর সারাবিশ্বের আর্থিক খাত যেভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তাতে এক অঞ্চলের সংকট অন্য অঞ্চলকে অবশ্যি প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। সে কারণেই অবাধে বিদেশি মুদ্রার লেনদেনের মাধ্যমে বাড়তি ঝুঁকির বিষয়টি অনেককেই চিন্তিত করছে।

এমন পরিস্থিতিতে এশীয় নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা মাথায় রেখে আর্থিক সহনীয়তা বাড়িয়ে তাকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে যেতেই হবে। এজন্যে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে ম্যাক্রো অর্থনীতির মৌল কাঠামোকে বরাবরই শক্ত পাটাতনের ওপর দাঁড় করাতে সচেষ্ট থাকতে হবে। সংকটকালে আমরা দেখেছি অস্থির বিদেশি মুদ্রার লেনদেন কী করে এই ম্যাক্রো অর্থনীতির পাটাতন নড়বড়ে করে দিতে পারে। তাই খুব বেশি বিদেশি ঋণের প্রতি ঝোঁক সংবরণ করার সক্ষমতা নীতিনির্ধারকদের অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে স্বদেশি আর্থিক খাতের গভীরতা ও প্রসারতা—দুই-ই বাড়িয়ে যেতে হবে। এর ফলে আর্থিক খাতের দক্ষতা ও সহনীয়তা বাড়বে। বাড়তি তারল্য বেশি করে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করার জন্যে উপযুক্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল খুঁজে পেতে হবে। নয়া নয়া ঋণ পণ্য, আর্থিক বাজারের অবকাঠামো শক্তিশালী করা, নিয়মনীতি ও তত্ত্বাবধায়ন কাঠামো জোরদার করা এবং বিনিয়োগের ভিত্তিভূমি প্রসারিত করার উদ্যোগ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে বন্ড বাজার, পেনশন ব্যবস্থা, নানামুখী সঞ্চয় ব্যবস্থা জোরদার করে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের ভিত্তিকে আরো জোরদার করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার করে লেনদেন অবকাঠামো আরো অংশগ্রহণমূলক ও বিস্তৃত করার যে নয়া সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার সদ্ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে রেগুলেটরদের আরো বেশি উদ্ভাবনীমূলক নিয়মনীতি চালু করা ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের লেনদেন নিশ্চিত করা বেশ জরুরি হয়ে পড়েছে।

এতোক্ষণ ধরে এশীয় আর্থিক সংকটের আলোকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার নানা দিক নিয়ে যে আলোচনা আমরা করলাম তাতে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ সেভাবে আসেনি। বলতে দ্বিধা নেই যে, এই দুটো সংকটকালেই বাংলাদেশের আর্থিক খাত নিজেকে ভালোভাবেই সুরক্ষা দিতে পেরেছে। বিশেষ করে সর্বশেষ বৈশ্বিক আর্থিক সংকটকালে বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে যে বিচক্ষণতার সাথে পরিচালনা করা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ তেমন কোনো আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েনি। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এই সংকটকালে (২০০৯-২০১৬) আর্থিক খাতের অন্যতম প্রধান রেগুলেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের। একেবারে শুরুতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমাদের মূল উদ্যোক্তারা যেন এই সময় তারল্যের অভাব অনুভব না করেন। তাই ঐ সময়ে মুদ্রানীতি বেশ খানিকটা সহজ করা হয়। রপ্তানিকারকদের আমরা নানা ধরনের প্রণোদনা দিতে এগিয়ে আসি। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) দ্রুতই বাড়াতে শুরু করি। তাছাড়া, সব ধরনের রপ্তানিকারকদের বিদেশি মুদ্রায় সহজ শর্তে এই ঋণের সুবিধে করে দিয়েছিলাম। ২০০৯ সালে ইডিএফের পরিমাণ ছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল দু’বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী আরো ৫০০ মিলিয়ন বিদেশি মুদ্রার ঋণ যোগ করলে এ অংশ আরো বাড়বে। ঐ সাত বছরে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তের বিদেশি মুদ্রার ঋণেরও ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম। এছাড়াও কম সুদে সবুজ অর্থায়নের সুযোগ তাদের জন্য করেছিলাম। ফলে আমাদের রপ্তানিকারকরা আশেপাশের দেশের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে ছিলেন। একমাত্র গার্মেন্টস খাতেই আমরা যে পরিমাণ রপ্তানি এ সময়টায় করেছি তা ভারত ও পাকিস্তান মিলেও করে উঠতে পারেনি। ব্যবসা-বান্ধব কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার এই তৃপ্তি আমি দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াব।

রপ্তানিখাত ছাড়াও আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করি। উত্পাদনশীল খাতে বেশি করে ঋণ দেবার অভিপ্রায়ে আমরা একদিকে যেমন সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি দেশি-বিদেশি ব্যাংকগুলোকে কৃষি, এসএমই, নারী উদ্যোক্তা ও সবুজ পণ্য উত্পাদনে বাড়তি ঋণ প্রদানে উত্সাহী করেছি, তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের কল্যাণে সিএসআর সমর্থনের সুযোগ বাড়িয়েছি। এর ফলে হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরাও বৃত্তি পেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে পেরেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের তত্ত্বাবধায়নে বিশ্বমানের নিয়মনীতি চালু করেছি। সেসব নিয়ম ঠিকমত পালন করছে কিনা তা দেখার জন্যে প্রযুক্তিনির্ভর সুপারভিশন ব্যবস্থা জোরদার করেছি। এর ফলে অনেক ঋণ অনিয়ম ধরা পড়েছে। তবে একইসঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছিল। আমরা অবিচল সংকল্প নিয়ে ব্যাংকিং খাতের তত্ত্বাবধায়ন করার চেষ্টা করেছি। যে কারণে ডেসটিনি, হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। দুটো ব্যাংকের বোর্ড আমরা ঐ সময়ে ভেঙে দিয়েছিলাম। দু’জন এমডিকে চাকরিচ্যুত করেছিলাম। অনিয়মগুলো ধরা পড়ার কারণে পুরো ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট ছিলাম। খেলাপি ঋণ নিয়মনীতি কড়াকড়ির কারণে শুরুতে বাড়লেও তা আবার কমতে শুরু করেছিল। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা লক্ষ করছিলাম। কৃষক, ক্ষুদে উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের কাছে পুনঃঅর্থায়নের সুবিধে দিতে এগিয়ে এসেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও তাদের পুরোনো ধ্যান-ধারণা ফেলে দিয়ে নতুন করে সাধারণের কল্যাণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ দিতে এগিয়ে আসতে শুরু করেছিল। পুরো ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে দূর-দূরান্তে অবস্থিত দেশের বঞ্চিত মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছুনোর কারণে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ডের নানা প্রশংসার কথা বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছিল। আফ্রিকার অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি বাংলাদেশ সফরে এসে সৃজনশীল ব্যাংকিং বিষয়ে শিক্ষা নিচ্ছিলেন। উত্পাদনশীল খাতের দিকে নজর দেবার কারণে আমাদের দেশের ম্যাক্রো অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত হয় এই সময়ে। মূল্যস্ফীতি ডাব্ল ডিজিট থেকে কমে ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। রিজার্ভ বেড়েছে ছয়গুণ। লেনদেনের ভারসাম্য ছিল ইতিবাচক। বিনিময় হার ছিল খুবই স্থিতিশীল। দারিদ্র্যের হার দ্রুতই কমছে। জ্বালানি খাতে ব্যক্তি ও সরকারি খাতের বিনিয়োগ বেড়েছে কয়েকগুণ। বড় অবকাঠামোতেও বিনিয়োগ বেড়ে চলেছে। তবুও রাস্তাঘাট, রেল ও বন্দরের অবস্থা আশাতীত নয়। তা সত্ত্বেও এফডিআই বেড়েছে। সার্বিকভাবে দেশজ বিনিয়োগ এ সময়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এতোসব আশাবাদী খবর সত্ত্বেও ইদানিং আর্থিক খাতের পরিচালনা, খেলাপি ঋণের হার বেড়ে যাওয়া, রেমিটেন্স ও রপ্তানির হার কমে যাওয়া, রিজার্ভ বৃদ্ধির হার কমে যাওয়াসহ নানা দুঃসংবাদে মনটা খারাপ হয়ে যায়। এমনটি তো হবার কথা নয়। আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেগুলেশন ও সুপারভিশনের যে শক্ত পাটাতন তৈরি হয়েছে, মানি ট্রান্সমিশন চ্যানেলগুলো প্রযুক্তির কল্যাণে যেমন গতিময় হয়েছে তাতে তো ম্যাক্রো অর্থনীতি আরো সচল হবার কথা। তাহলে গলদটা কোথায়? আর্থিক খাতের পরিচালনায় কি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা আরও বাড়ানো খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরুণ কর্মকর্তাদের যে দক্ষতা আমি দেখেছি তাকে কাজে লাগাতে পারলে, তাদের নির্ভয়ে কাজ করতে দিলে নিশ্চয় তারা ব্যাংকিং খাতের চলমান অব্যবস্থাপনা অনেকটাই দূর করতে পারবেন। কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের আস্থার সংকট যাতে তৈরি না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের সুবিবেচনা কামনা করছি। এ জন্যে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োগ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ