রবিবার , ১২ জানুয়ারী ২০২০ |

উৎসব ও আড়ম্বরের পাশাপাশি সবার হোক মুজিববর্ষ

অজয় দাশগুপ্ত   রবিবার , ১২ জানুয়ারী ২০২০

শুরু হয়েছে মুজিববর্ষ। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ, শীর্ষদের একজন। আমরা জীবনেও স্বাধীন হতে পারতাম কি না জানি না। পাকিস্তানের মত দুঃশাসনের দেশ ও সামরিক শাসন থেকে আমাদের মুক্ত করা সহজ ছিলো না। দেশ মুক্ত হবার পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে নানা ষড়যন্ত্র আর বিদেশী মদদে তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু তারচেয়েও জঘন্য ছিলো সামরিক শাসক ও খালেদা জিয়ার আমলে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা। আমরা তখন তারুণ্যে। তার নাম নেয়াও ছিলো অপরাধ। রেডিও টিভি থেকে সব মিডিয়ায় খালকাটা জিয়াউর রহমান পরে রমণী পাগল এরশাদ আর খালেদা জিয়ার সরকার নিজেদের মতো করে গুজব আর অপপ্রচার চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। নতুন নতুন কাহিনী আর মিথ্যার তলায় চাপা পড়া জয় বাংলা আর বঙ্গবন্ধু ক্রমাগত উজ্জ্বল আর বিশালতা নিয়ে ফিরলেন। যা সময়ের চাহিদা, যা প্রকৃতির নিয়ম। এখানে শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা ও মেধা বাদে আওয়ামী লীগের অবদান কতটা বা বাকী নেতৃত্বের কি ভূমিকা তা আমরা ভেবে দেখি না।

কথাটা বললাম এই কারণে বঙ্গবন্ধু যখন মারা যান তখন আমি এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে ফলাফলের দিন গুণছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে দিনটি। মাথার ওপর আকাশে হেলিক্পটার চক্কর মারছে। হঠাৎ করে রাস্তায় আর্মির গাড়ির আনাগোনা। আমি চট্টগ্রাম শহরের এক জনাকীর্ণ রাস্তার মোড়ে কিছু উগ্র অসভ্য মীরজাফরকে কোলাকুলি করতেও দেখেছি। আমরা মনেপ্রাণে আশা করছিলাম একটা বড় ধরণের প্রতিবাদ বা পাল্টা আঘাত হানবে সরকারি দল বাকশাল তথা আওয়ামী লীগ। তা হয়নি। বরং নভেম্বরের তিন তারিখের পর সে আশাও গেল অস্তাচলে। যতদিন না মিজানুর রহমান চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক আর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা জোহরা তাজউদ্দীন হাল ধরলেন ততদিন আওয়ামী লীগের নৌকা ছিলো দিশেহারা স্রোতের তরণী। তখনকার সময়ের এই মাঝারী মানের নেতা আর সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও আওয়ামী লীগের তৃণমূলই সেদিন পথ দেখিয়েছিল। আর ছিলেন এদেশের পরিশীলিত বুদ্ধিজীবী সমাজ। তখন তারা বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠন করে নেতা ও জনকের যে ভাবমূর্তি তুলে এনেছিলেন তার কথা ভুললে অন্যায় হয়ে। বড় কঠিন অবস্থা তখন। আজকের মত তেলতেলে পরিবেশ ছিলো না। চাইলেই বঙ্গবন্ধু বা দলের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লোটা যেতো না। তাই অনেকে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দেশ শাসনে ফিরবে এটা বুঝতে পারেননি অনেকে। তাই আগের বছর জাতীয় শোক দিবসে চট্টগ্রামের মূল অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠ করার লোক পাওয়া ছিলো মুশকিলের বিষয়। সে বয়সে আমাকে তার দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। অবশ্য অকুতোভয় মুক্ত মানুষ মুস্তফা নূরুল ইসলাম ছিলেন প্রধান অতিথি। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বেশ কিছু চেনা মুখের হঠাৎ প্রস্থান দেখে মঞ্চ থেকেই বুঝতে পারি টিকটিকি নামের গোয়েন্দা ঢুকেছে হলে। এমন বৈরী পরিবেশ পেরিয়ে আপন মহিমা, ত্যাগ আর কৃতিত্বে ফিরে এসেছেন বঙ্গবন্ধু।

মনে রাখতে হবে আমরা আবেগপ্রবণ আর হুজুগে জাতি। পরপর তিনবার দেশ শাসনে থাকা আওয়ামী লীগ সরকার আর শেখ হাসিনার অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমেজে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। চারদিকে সব আওয়ামীময়। এরা সবাই কি আসলেই আওয়ামী লীগের লোকজন? এটা দলের নেতৃত্বও ভালো জানে। কিন্তু আমাদের সমাজে এটাই নিয়ম। যে যখন গদিতে তখন তার পৌষ মাস। এই পৌষমাসের সুযোগ নেয়া মানুষগুলো দেশে বিদেশে মুজিববর্ষের নামে কি করছে বা কি করতে চাচ্ছে তার একটা হিসাব থাকা প্রয়োজন। বিশ্বের নানা দেশের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা আবেগপ্রবণ হবেন, কিছু না কিছু করবেন এটাই স্বাভাবিক। তাদের প্রকাশনা বা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সেমিনার আলোচনাও জরুরি। এর বাইরে যেকোনো কিছুই হবে সন্দেহের। যেমন দেশে ইতোমধ্যে নানা ধরণের নমুনা দেখা যাচ্ছে। অকারণে শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে যাদের অফিসে, স্কুলে বা কলেজে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে তাদের মনোভাবটা কি এরা বোঝে? আসলে এতে তাদের কিছুই যায় আসে না। তাদের ধারণা যা হবার হোক যতদিন আছি লুটপাট করে খাই-দাই আর বাড়বাড়ন্ত করি সম্পদের। এর শিকার দল বা নেতারা হলেও বঙ্গবন্ধু হতে পারেন না। কারণ বহুকষ্ট আর ত্যাগে তিনি যেমন আমাদের জনক হয়েছেন তেমনি দীর্ঘ সময়ের পর আমরা পেয়েছি এমন এক আন্তর্জাতিক গৌরবের বাঙালি। এমন সম্পদ নিয়ে ছেলেখেলা করা অপরাধ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব বোঝেন। জানেন বলেই বলেন, পঁচাত্তরে কেন তার পিতার মৃতদেহকে সিঁড়িতে পড়ে থাকতে হয়েছিল? কেন সে রাতে বা পরে দলের নেতারা রুখে দাঁড়াতে পারলো না। এই কেন’র উত্তরও আমরা বুঝি। দলে মোশতাক গং সবসময় নানারূপে নানা পরিচয়ে থাকে। তারাই দলভারী। কারণ মানুষের প্রবৃত্তি হলো নেগেটিভ বিষয়ে আগ্রহ। তৃণমূলের নেতা কর্মীদের দূরে সরিয়ে এরা এখন লাইমলাইটে। সাথে আছে প্রশাসন বা সমাজে এক ধরণের প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য। তারা মূল দল ও নীতিকে তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠান ও আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছেন। নির্বাচন থেকে রাজপথে তার হাজার হাজার প্রমাণ। কিন্তু মানুষ এখনো ধৈর্য ধরে আছে শেখ হাসিনার ভালো কাজ আর ব্যক্তিত্বের কারণে। তারা বোঝে তিনি আছেন বলেই মানুষ আজ সুখে দিনাতিপাত করতে পারছে। তার মূল অভাবগুলো মিটেছে। সামনে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

মুজিববর্ষ আমাদের অহংকার। শতবর্ষে দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধু সুযোগ পাননি দেশ গঠনের। তিনি যে স্বপ্ন আর আদর্শে বাংলাদেশ দিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা তার অনেকটাই করে দেখিয়েছেন। শেখ হাসিনার ঘোর দুশমনও জানে, মুখে যাই বলুক তারাও শেখ হাসিনার ভালো কাজের সুবিধাভোগী। আমাদের যে জাতীয় পরিচয় আমাদের যে সবুজ পাসপোর্ট আমাদের যে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা তার পেছনে আছেন একজন মানুষের ত্যাগ। তিনি যদি আমাদের হুকুম না দিতেন তার আঙুল যদি আকাশে মাথা না তুলতো তার গগণবিদারী ভাষণে যদি সাহস না থাকতো আমরা পরাধীন জাতি হয়ে জীবন কাটাতাম। সেই মানুষটি তাই একক কোনো দলেরও না। তিনি সবার। আওয়ামী লীগ অবশ্যই তার মূল দাবীদার। কিন্তু জনককে যেন সবাই জানাতে পারেন তাদের মন ও আত্মার শ্রদ্ধা। তার শততম জন্মদিন সকলের জন্য পবিত্র আর এটাও মনে রাখার যে, আমরা তার মতো মানুষকেও ছাড় দেইনি। তিনি, তার পরিবার আর দেশপ্রেমী নেতাদের রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছি সবুজ প্রান্তর। সকল হানাহানি আর কলুষতার অবাসন কি হবে মুজিববর্ষের আদর্শ?

আওয়ামী লীগ ছাড়াও দেশের মুক্তমনা মানুষ, সংস্কৃতি, ভিন্নমতের সবকিছুতে থাক তার পদচিহ্ন। সে সুযোগ দেয়া হোক। তবেই মুজিববর্ষ পালন হবে সার্থক ও অনুপ্রেরণার। বঙ্গবন্ধু আকাশের এক নাম। হাওয়ার প্রতিধ্বনি। পানির ঢেউ। জীবনের এক পরিচয়। যেকোনো বর্ষে তিনি আমাদের আলোকময় বাতিঘর। শুভ হোক মুজিববর্ষ।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ