মঙ্গলবার , ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২০ |

দিল্লী বিধানসভা নির্বাচন ও ভারতীয় রাজনীতির নতুন মোড়

রাজীব দাস   মঙ্গলবার , ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২০

ভারতীয় রাজনীতিতে দুর্দান্ত এক সময় যাচ্ছে। নাগরিকপঞ্জি আইন (সিএএ) নিয়ে রাজনীতির নতুন মোড় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একত্র করতে পেরেছে। যেখান থেকে শুরু হতে পারে ভারতীয় রাজনীতির নতুন ইতিহাস।

গত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সারা ভারতজুড়ে গেরুয়া রং বিজেপির জয়-জয়কার চলেছে। যেখানে মাত্র কয়েক বছর আগেও কংগ্রেসকে ঠেকানো দুরূহ ছিল, সেখানে ৫৪৩ এর মধ্যে ৩০২ আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নিজেদের অ্যালায়েন্সকে সরকারে বসিয়েছে বিজেপি। কোন কোন এলাকায় বিশেষ করে পশ্চিম বাংলায় নিয়ে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। সে নির্বাচনের পরপরই মোদি সরকার নেমেছিল ৭০ বছর ধরে স্বপ্নে দেখা ‘রামরাজত্ব’ (হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র) কায়েমের খুব কাছে। এ নিয়ে বেশ জোরেসোরেই আগাচ্ছিল বিজেপি ।

সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা তুলে দিয়ে কাশ্মিরীদের বিশেষ ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর সেই সাথে যুক্ত হয়েছে সিএএ, যা ভারতকে নামায় নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মাঠে। এতদিন মোদিকে জনসমাবেশগুলোতে মুচকি হাসিতে হাস্যোজ্জ্বল থাকতে দেখা গেলেও, গত কয়েকদিন সমাবেশে গিয়ে মন খারাপ করে জবাব দিতে হচ্ছে সিএএ এর বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের প্রশ্নের৷ কিছুদিন আগেও যেই মোদিকে আটকানো অনেকটা অসম্ভব ঠেকছিল। রাজনীতির ফেরে পরে আজ মোদিকে প্রকাশ্যে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করতেও অনেকেই দ্বিধাবোধ করছেন না।

মূলত ভারতীয় ইতিহাসে মোঘল সাম্রাজ্যের পতন হলেও দিল্লীর শাসন পতন হয়নি। বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে ‘দিল্লীর শাসন’-ই বলেন অনেকে। কেননা দিল্লীর জনগণকে রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে দেশের অন্যান্য সব জায়গার থেকে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে৷ এসব বাড়তি সুবিধার মধ্যে রয়েছে পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ নানা বিষয়।

যেমন দিল্লীর নির্বাচনের ঠিক আগ দিয়ে কেজরিওয়াল সরকার ইতিমধ্যে  ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুত বিলের পুরো এবং ২০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৫০ ভাগ সাবসিডি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সেই সাথে একটি পরিবারের জন্য ২০ কিলোলিটার পানির খরচ একদম সরকারিভাবে বহন করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।

কেজরিওয়াল উন্নয়মূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে দিল্লীর নারীরা সরকারি লোকাল বাসগুলোতে চলার সুযোগ পাবেন কোনও ভাড়া ছাড়াই। এই সুবিধারন আওতায় প্রতিদিন দশ লাখ নারী সুবিধা পাবেন বলে কেজওয়ারি লাল সরকারের দাবি। আম-আদমি পার্টির নেতা কেজওয়ারিলাল এর স্কুল কলেজের শ্রেণিকক্ষ বাড়ানো, মহিলা ক্লিনিক নির্মাণসহ আছে আরও বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজের প্রতিশ্রুতি।

এতসব উন্নয়ন আর মোদি সরকারের সংবিধান শুদ্ধিকরণের মাঝেই দিল্লীর নির্বাচনী প্রচার চলেছে। পার্টির ইশতিহার রাজনৈতিক বক্তব্য গানে,  কবিতায় এমনকি অ্যাডভারটাইজমেন্টের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে জনগণের কাছে। ৭০ সিটের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৮ ফেব্রুয়ারি।

আগের পরিসংখ্যান ঘাটলে বোঝা যায়, দিল্লীতে আঞ্চলিকভাবে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সব থেকে এগিয়ে আছে কেজরিওয়াল সরকার। আর মাত্র দশবছর আগে দখলে রাখা দিল্লীর ক্ষমতার শুন্য ভাগ আছে কংগ্রেসের হাতে। ৭০ সিটের মাত্র ৩টি আছে বিজেপির হাতে। কিন্তু গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের হিসেব মিলালে একটু গণ্ডগোলেই পড়তে হবে। ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরির (NCT) সাত সিটের সাতটিই আছে এখন বিজেপির হাতে। সেই এলাকা রাজনীতির নতুন ধারা কিংবা শাহীনবাঘ আন্দোলনের ধারা কতটুকু আম-আদমি পার্টি (এএপি) ‘ক্যাশ’ করতে পারবে তার জন্য নির্বাচনের দিনটি দেখতেই হবে।

‘গেরুয়া বাহিনী’ তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে জোরেসোরেই। দেশ আপাতত তাদের দখলে ‘খুব আগাচ্ছে’, যদিও অর্থনীতির ঢাল নামছে নিচের দিকে। তাই দিল্লীকেও তারা সেই আওতায় আনতে চায়। এদিকে নির্বাচনী লড়াইয়ে লেগে থাকার জন্য আম আদমির পক্ষ থেকে বাজানো হচ্ছে প্রেরণামূলক দলীয় গান।

মহারাষ্ট্র, ঝাড়খান্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন কৌশল নিয়ে পথে নেমেছে ভারত উপমহাদেশের সবথেকে পুরনো দল কংগ্রেস। জাতীয় নির্বাচনের পরে যে কয়টি আঞ্চলিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোর কোথাও কোথাও দেখা গেছে গেরুয়াদের সাথে আধা-আধা লড়াই, আবার কোথাও-কোথাও মাঠ দখল করতে নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। মহারাষ্ট্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায় বিজেপি ঠেকাতে এখন বিজেপি নিয়ন্ত্রিত অ্যালায়েন্সের বাইরে প্রচুর জোট হচ্ছে। এমনকি কখনও কখনও বিজেপির অ্যালায়েন্স ভেঙেও বাকী সব দল ছুটছে একই পথে। মহারাষ্ট্রের ২৮৮ সিটের মধ্যে আরএসএস, এনসিপি, আর কংগ্রেস জোটে বিজেপিকে হার মানতে হয়েছে ১৫৪ সিটের নতুন জোটের কাছে।

ইতিমধ্যে দিল্লীর সাত নির্বাচিত এমপি সহ ৩৭৫ জন পার্লামেন্ট সদস্য এবং রাজ্যসভা সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দিল্লীর মানুষের কাছে দেশের বার্তা পৌছে দিতে। আর সেই নির্দেশনা এসেছে ইউনিয়ন মিনিস্টার প্রকাশ জাদাভেকর। কিন্তু দিল্লীতে আপাতত কংগ্রেসের ভাল সময় যাচ্ছে না। মাত্র ১০ বছর আগে যেই দিল্লীর পুরো দখল ছিল কংগ্রেসের হাতে আজ তা নেমেছে শুন্যের কোটায়।

দিল্লীতে ‘লালঝাণ্ডা’-র সেরকম কোন প্রভাব না পড়লেও এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নাগরিক পঞ্জি আইনে’র প্রতিবাদে আন্দোলনে  শিক্ষার্থীদের একাত্মতাসহ আছে তাদের কঠোর অবস্থান। ‘লালঝাণ্ডা’ বা কমিউনিস্ট পার্টির স্বপ্ন সেটি ধরে কতটুকু আগাতে পারবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

কেজরিওয়াল যেই উন্নয়নের হাওয়া দিল্লীতে লাগিয়েছেন সেদিক থেকে প্রতিযোগিতাটা হবে বিজেপি আর আম আদমির মধ্যেই। আর সেই ফলাফলই বলে দিতে পারে সামনের দিনের ভারত কেমন হবে। আর দিল্লীর চলমান শাহীনবাঘ আন্দোলনের রূপরেখাও অনেকটা নির্ভর করছে এই নির্বাচনের উপরেই।

নির্বাচনের ফলাফলে বিজেপির অবস্থান দিল্লীতেও দৃঢ়ভাবে তৈরি হয়, সেখানে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে অনেকখানি। অর্থাৎ তাদের কৃতকাজের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আছে, সেটি তারা নির্দ্বিধায় বলবেন। আর যদি দিল্লীর মত ক্যাপিটাল টেরিটরিতে কেজরিওয়াল তার ধামাকা টিকিয়ে রাখতে পারেন, তাহলে শাহীনবাঘ আন্দোলনে ‘কেজরিওয়াল বিরিয়ানি পাঠাচ্ছেন’ বলে বিজেপি যে অভিযোগ ছুঁড়ছে তারও একটা বিহিত হয়তো হয়েই যাবে। সেটি নিশ্চয়ই চলমান আন্দোলনগুলোর জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

কে জানে ৮ ফেব্রুয়ারি দিল্লীর নির্বাচন থেকেই হয়তো শুরু হবে ভারতীয় রাজনীতির নতুন পথচলা!

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ