মঙ্গলবার , ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২০ |

ভয় করোনা, সতর্ক থাকো

প্রভাষ আমিন   মঙ্গলবার , ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২০

আমরা কথায় কথায় বলি, বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়েছে। এবার সত্যি সত্যি দেখলাম। করোনাভাইরাস আতঙ্ক সারাবিশ্বকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। কোনো একটি ঘটনায় সারাবিশ্বকে প্রভাবিত করার উদাহরণ খুব বেশি নেই। অসুখের কথা যদি বলেন, আশির দশকে এইডস একবার বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। তবে তখন তথ্যপ্রযুক্তির এমন রমরমা ছিল না। তাই আতঙ্ক ছড়াতেও সময় লাগতো। কিন্তু এখন গোটা বিশ্বটাই যেন একটা গ্রাম। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যা কিছু ঘটুক, মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। আর এবার করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে চীন থেকে, যে চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে।

ব্যাপারটা এমন নয় যে, এইডসের পরে আর করোনার আগে আর কোনো ভাইরাস বা রোগ আসেনি। এসেছে। অনেকে মারাও গেছেন। সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু, সার্স, নিপাহ ভাইরাস, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকার মত নানারকম রোগব্যাধি বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাবু করেছে। গত মৌসুমে চেনা ডেঙ্গুই বাংলাদেশকে কাবু করে ফেলেছিল। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। একসময় কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেতে। এখন ঘরে বানানো স্যালাইনেই কলেরা কাবু। একসময় প্রত্যেক গ্রামেই মুখে বসন্তের দাগওয়ালা এক দুজন মানুষ পাওয়া যেতো। এখন আর গুটি বসন্ত নেই। এমন অনেক আতঙ্ক এখন টিকায় জয় করা গেছে। কিন্তু অচেনা রোগে আতঙ্ক বেশি। করোনা নিয়ে আতঙ্কের মূল কারণও এই মোকাবেলা করতে না জানা। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনো টিকা তো দূরের কথা চিকিৎসাও আবিষ্কার হয়নি। বিভিন্ন লক্ষণের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে শুধু। আর করোনা নিয়ে বিভ্রান্তিও বহুমুখী। কেউ বলছেন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়।

আরেকবার শুনছি, মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। একবার শুনছি, মানুষের শরীরে ঢোকার প্রথম দুই সপ্তাহ ভাইরাসটি সুপ্ত থাকে, তবে এই সময়ে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তার মানে দুই সপ্তাহ টেরই পাবেন না যে আপনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং আপনি আশেপাশে করোনা ছড়াচ্ছেন। এখন আবার শুনছি, সুপ্ত অবস্থায় করোনা ছড়ায় না। কোনটা যে ঠিক, কোনটা বেঠিক বোঝা দায়। আসলে কারো দোষ দিয়েও লাভ নেই, কেউই তো জানেন না, আসলে কোনটা ঠিক। সবাই নিশ্চয়ই চেষ্টা করছেন, বাঁচার আসল উপায়টা বের করতে। এখন পর্যন্ত মোটামুটি যে ধারণা পাওয়া গেছে, তাতে উহানের একটি সামুদ্রিক খাবারের বাজার থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। তার মানে প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে এসেছে প্রাণঘাতী করোনা। আর এখন দ্রুত তা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে।

এখন পর্যন্ত ২৮টি দেশে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ বছরের প্রথমদিনেই প্রথম করোনাভাইরাসের কথা আলোচনা হয়েছে। আর প্রথম মৃত্যু রেকর্ড করা হয় ১১ জানুয়ারি। এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৭ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এই লেখা পর্যন্ত চীনের বাইরে দুজনসহ মোট ৮১১ জন মারা গেছেন। এটা সরকারি হিসাব। অনেকের ধারণা চীনের মত নিয়ন্ত্রিত তথ্যপ্রবাহের দেশে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। সন্দেহটা আরো বাড়ছে, কারণ প্রথম যে ডাক্তার করোনার কথা বলেছিলেন, তাকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে পুলিশী জেরার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়ে সেই ডাক্তার বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি গুজব ছড়াচ্ছিলেন না, করোনা সত্যি প্রাণঘাতী।

মৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান হার আতঙ্কিত করেছে গোটা বিশ্বকেই। একটু দেরিতে হলেও চীন করোনার ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছে। মাত্র ৬ দিনে এক হাজার শয্যার হাসপাতালও বানিয়েছে। কিন্তু এখনও করোনা মোকাবেলার উপায় খুঁজে পায়নি। মহামারী আকারে করোনার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ব্যর্থতার কথা স্বীকারও করেছে চীন। আপাতত চীন নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। উহান শহরে তো কারফিউ পরিস্থিতি। সবধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাব-পাব বন্ধ। চীনের নববর্ষের ছুটি বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে চীন এখন এক নজিরবিহীন স্থবিরকাল অতিক্রম করছে। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিচ্ছে।

বাংলাদেশও চীনে আটকে পড়া নাগরিকদের ফিরিয়ে আনছে। আতঙ্কটা এমন পর্যায়ে পৌছেছে, বাংলাদেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা বিমানের পাইলট এবং ক্রুদের এখন অন্য দেশ ঢুকতে দিচ্ছে না। অবশ্য এটা যতটা না আতঙ্কের, তারচেয়ে বেশি সতর্কতার। তবে এত চেষ্টা করেও করোনার বিস্তার ঠেকানো যায়নি। এখন পর্যন্ত ২৮টি দেশে করোনার বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনার রোগী পাওয়া যায়নি। তবে ঝুঁকিটা অনেক বেশি। যেভাবে দেশের সব প্রবেশমুখে স্কিনিং করা হচ্ছে, বাংলাদেশে করোনা না ঢুকতে পারুক। কিন্তু এরই স্কিনিংয়ের সিরিয়াসনেস নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা চাই, সব ফেলে এখন বিমানবন্দর এবং সব স্থলবন্দরে কঠোর নজরদারি করা হোক, যাতে করোনাভাইরাস নিয়ে কেউ বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে। কারণে বাংলাদেশে এলে করোনা আরো অনেক ভয়াবহ হবে। কারণ বাংলাদেশ ঘনবসতির দেশ।

চীনের মত আমরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারবো না। আর যেহেতু ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু করার থাকে না, তাই যাতে না ছড়ায় সে চেষ্টা করাই ভালো। তবে করোনার স্বাস্থ্য ঝুঁকির চেয়ে বাণিজ্য ঝুঁকি অনেক বেশি হতে পারে। এবং সেই ঝুঁকিটা সত্যি সত্যিই সারাবিশ্বের। করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে বিশ্বের ২৮টি দেশে, কিন্তু এর কমবেশি প্রভাব পড়বে বিশ্বের সব দেশেই। আকারে যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতি হলেও প্রাণচাঞ্চল্যে চীনই বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। সমস্যাটা হলো, করোনার প্রকোপ যদি কঙ্গোতে হতো, তাহলে অত না ভাবলেও চলতো। কঙ্গোকে বিচ্ছিন্ন করে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিলেই হতো। কিন্তু দেশটি চীন, বিশ্বের কারখানা। চীন বন্ধ মানে বিশ্বের সাপ্লাই চেইন থেমে যাওয়া।

দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি কোম্পানি হুন্দাইয়ের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ চীন থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এটা একটা খুবই ছোট উদাহরণ। এমন শত শত উদাহরণ দেয়া যাবে। সুই থেকে বিমান- সবকিছুর উৎপাদনেই করোনার প্রভাব পড়বে। বিশ্বখ্যাত বিমান নির্মাতা এয়ারবাসের চীনের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শুরুর দিকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেউ কেউ খুশি হয়েছিল। চীনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নেয়া যাবে ভেবে। কিন্তু চীন উৎপাদনের কেন্দ্রে এমনভাবে অবস্থান করছে, চীনকে বাদ দিয়ে কারো পক্ষেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এমনকি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুযক্তরাষ্ট্রও চীনকে ছাড়া এগুতে পারবে না। আইফোনের মূল কারখানা কিন্তু চীনে।

এখন পর্যন্ত করোনায় চীনের ক্ষতি ৮ হাজার কোটি ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ক্ষতির এই পরিমাণ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে বলা মুশকিল। চীনের বিচ্ছিন্নতায় ধস নেমেছে বিশ্ব পর্যটনে, বিমান ব্যবসায়, হোটেল, রেস্টুরেন্টে। ম্যাকডোনাল্ড, স্টারবাকসের মত চেইন স্টোরের চীনের অর্ধেকের বেশি আউটলেট বন্ধ। যেগুলো খোলা আছে, সেখানে বিক্রি কম। চীনের নববর্ষের ছুটি লম্বা করেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যায়নি। খোলার পরপরই ধস নেমেছে চীনের শেয়ারবাজারে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিই এখন চাপের মুখে। আর এই প্রভাবটা এখনই টের পাওয়া যাবে না। ধীরে ধীরে তা অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। আমার আশঙ্কা সত্যি না হোক, করোনা বিশ্ব অর্থনীতিতেই এক অনিবার্য মন্দা ডেকে আনতে পারে।

বাংলাদেশও বিশ্বের বাইরে নয়। বরং বাংলাদেশ অনেক বেশি চীননির্ভর। তাই করোনা ঢুকতে না পারলেও এর নেতিবাচক প্রভাব এরইমধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের আমদানির ২৫ ভাগ আসে চীন থেকে, যা এখন বন্ধ আছে। এই সাপ্লাই চেন চালু হতে দেরি হলে মারাত্মক চাপের মুখে পড়বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। কারণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের মূল কাচামাল আসে চীন থেকে। চীন থেকে কাচামাল বা খুচরা যন্ত্রাংশ না এলে বন্ধ হয়ে যাবে বাংলাদেশের অনেক কারখানাও। বেড়ে যাবে মোবাইল, ফ্রিজ, টিভিসহ ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম। বড় চাপে পড়বে ই-কমার্স। কারণ অনলাইনে বিক্রি হওয়া পণ্যের বেশিরভাগই আসে চীন থেকে। বাংলাদেশের অনেক মানুষ আছেন, যাদের মূল পেশা হলো চীনে যাওয়া আসা করা। আসার সময় যে পণ্য নিয়ে আসেন, তা বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করেই তার সংসার চলে। তার চীন যাওয়া বন্ধ মানেই কিন্তু সংসার অচল হয়ে যাওয়া।

প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ