রবিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০ |

কালিয়াকৈরের প্রাথমিক শিক্ষায় অর্জন ও অগ্রগতি

রমিতা ইসলাম   রবিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০

শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ। এই স্লোগানকে সামনে রেখে নিরক্ষরতা দূরীকরণসহ সকল শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্ববোধে, বিজ্ঞান মনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার এই লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে নেই কালিয়াকৈর উপজেলা। তারই অংশ হিসেবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন, অর্থাৎ, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে মাননীয় মন্ত্রী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা শিক্ষা অফিস, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক, এসএমসিসহ সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে দিন বদলের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। কালিয়াকৈরের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে বৃহত্তর পরিসরে নেয়া হয়েছে বৈচিত্র্যময় ও শিশুবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি।  


আমরা জানি, শিশুর শিখন প্রক্রিয়ায় যেসব উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিশুর চারপাশের পরিবেশ। একটি আদর্শ, আনন্দমুখর, শিশুবান্ধব শিখন পরিবেশ শিশুর বিদ্যালয়ে আসার প্রথম আকর্ষণ হিসেবে কাজ করে। তাই এই পরিবেশ হতে হয় আনন্দদায়ক, আরামদায়ক, সহানুভূতিশীল ও সহায়তামূলক, যেখানে শিশু নিরাপদ বোধ করবে, স্বতস্ফূর্তভাবে সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং শারিরীক ও মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হবার সুযোগ পাবে। এই লক্ষ্যে “সেজেছে স্কুল রংধনু রঙে, শিখবে শিশু মনে প্রাণে” থিমকে সামনে রেখে উপজেলার সকল, অর্থাৎ, ১২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে রংধনু রঙে সাজানো হয়েছে। শিল্প এলাকা হওয়ায় এবং জনসচেতনতার অভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য মূলত বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুদের আকৃষ্ট করতে রংধনু রঙে রাঙানোর উদ্যোগকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ স্বাগত জানিয়েছে। শুধু বহির্ভাগ সজ্জিতকরণ নয়, পাঠকে আকর্ষণীয় করে তুলতে, আনন্দঘন পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করতে ও অডিও-ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে শিখন ফল অর্জনে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে ক্লাসরুমকে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম হিসেবে সজ্জিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পরিকল্পনায় এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারবৃন্দের উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উপজেলার ১২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই জুলাই ২০১৯ সালে বিজয় ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার করে পাঠ পরিচালনা শুরু করে। একযোগে সকল বিদ্যালয়ে বিজয় ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রয় করে পাঠ পরিচালনার ক্ষেত্রে কালিয়াকৈর উপজেলা বাংলাদেশের প্রথম উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আর এই স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং বিজয় ডিজিটাল কন্টেন্ট এর নির্মাতা জনাব মোস্তফা জব্বার, মাননীয় মন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। এরফলে সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যালয়ে সরবরাহকৃত ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নকল্পে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে বিদ্যালয় পর্যায়ে বরাদ্দকৃত অর্থ ও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বরাদ্দের মাধ্যমে কালিয়াকৈরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নেয়া হয়েছে শিশুবান্ধব নানা উদ্যোগ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিশুদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার। শিশুদের মধ্যে সততা ও নৈতিকতার অভ্যাস গড়ে তুলতে বিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে সততা স্টোর ও লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড বক্স। শিশুকাল থেকে মানবিক গুণাবলীর অনুশীলনের জন্য বিদ্যালয় পর্যায়ে স্থাপন করা হয়েছে মহানুভবতার দেয়াল।

সকল বিদ্যালয়ের প্রতিটি কক্ষ সজ্জিত করা হয়েছে শিক্ষামূলক বিভিন্ন ছবি ও পাঠ্যবইয়ের অংশবিশেষ ব্যবহার করে। দেখে মনে হবে প্রতিটি দেয়াল যেনো এক একটি পাঠ্যবই। এছাড়া সকল বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ সৌরজগতের আঙ্গিকে সজ্জিত করা হয়েছে, যা শিশুদের মধ্যে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি শিক্ষামূলক। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিগুলো সজ্জিত করা হয়েছে শিশুদের উপযোগী বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের সমাহারে। সেখানে ঢুকলে মনে হবে কোনো স্বপ্নের রাজ্যে প্রবেশ করেছি যেনো। রয়েছে বিভিন্ন খেলার সামগ্রী। খেলতে খেলতে বেড়ে উঠছে প্রাক-প্রাথমিকের শিশুরা। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে রয়েছে আকর্ষণীয় পরীমঞ্চ। এই মঞ্চে উঠে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের পারফরমেন্স করে থাকে। এর মধ্যে শিশুকাল থেকেই তার জড়তা কেটে যায় এবং তার মধ্যে নেতৃত্ব দেবার আগ্রহ জন্মে। নেতৃত্বের গুণাবলী জাগ্রত করতে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে রয়েছে শিশুবান্ধব বক্তৃতা টেবিল।

উপজেলার ১০৬টি বিদ্যালয়ে রয়েছে সুদৃশ্য ফুলের বাগান। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টায় এই বাগানগুলো তৈরি হয়েছে এবং তারা নিজেরাই এগুলোর পরিচর্যা করে থাকে। প্রতি সপ্তাহে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির পাশাপাশি একত্রে বাগান পরিচর্যার বিষয়টি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যোগে, স্থানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে অথবা কোথাও জেলা পরিষদের অর্থায়নে স্থাপন করা হয়েছে শহিদ মিনার। এ পর্যন্ত স্থাপিত শহিদ মিনারের সংখ্যা ৯৫টি। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের উদ্যোগে নেয়া হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী আরও কয়েকটি উদ্যোগ। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিদ্যালয়ে অভিভাবক অপেক্ষাগার স্থাপন, স্থায়ী মঞ্চ তৈরি, পতাকা বেদি তৈরি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা তৈরি ও দেশের প্রতি আনুগত্যশীল করে তুলতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি ছেলেদের ও একটি মেয়েদের কাব স্কাউট দল খোলা হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত করতে উপজেলার সকল শিক্ষকের একরকম পোষাক তৈরি করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের সাথে সাথে চলছে শিক্ষার গুণগত মান অর্জন। মাননীয় সচিব মহোদয়ের ইনোভেশন “ওয়ান ডে, ওয়ান ওয়ার্ড” বিদ্যালয়ে অত্যন্ত কার্যকরিভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে সাবলীলভাবে পঠন ও লিখন শৈলি বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্বল শিক্ষার্থী চিহ্নিত করে তাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে এবং দুর্বলদের সবলের তালিকায় আনতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আর এটি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের একটি সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে কালিয়াকৈর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মুজিব শতবর্ষ শুরুর প্রাক্কালে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ আমাদের অঙ্গীকার। এভাবেই এগিয়ে যাক প্রাথমিক শিক্ষা, এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।   
- রমিতা ইসলাম, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

 সাক্ষাৎকার থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ