বুধবার , ১১ মার্চ ২০২০ |

নব্য পারমাণবিক বোমা ‘প্লাস্টিক’

  বুধবার , ১১ মার্চ ২০২০


 মো: মিন্টু মিয়া:

নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীর অন্যতম একটি ‘প্লাস্টিক’। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। স্থায়িত্বের গুণাগুণ, কম খরচে ক্রয়সাধ্য,আকারে বহুলতা এবং সহজলভ্যতা সেই কাঙ্খিত চাহিদার যোগান দিচ্ছে। তবে বৈশ্বিক পরিবেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসছে বিরাট এক অশণি সংকেত। পারমাণবিক বোমার ন্যায় প্লাস্টিকের সক্রিয়তা ভাবিয়ে তুলছে সমস্ত জীব জগতের অস্তিত্বকে।
বিজ্ঞানের ভাষায়, প্লাস্টিক হলো পলিমার জাতীয় পদার্থ যাতে একই ইউনিটের অণু বারবার ব্যবহৃত হয়ে মনোমারের রুপ নেয়। প্লাস্টিক ব্যাগের ক্ষেত্রে সেই মনোমার হলো ইথিলিন। যখন ইথিলিনের অণু পলিমারাইজ করা হয় তখন হয় পলিইথিলিন। তখন তারা কার্বন অণুর লম্বা শিকল রচনা করে হাইড্রোজেন অণুর সঙ্গে শক্তিশালী  বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
তবে প্লাস্টিক সহজাতভাবে বিষাক্ত বা ক্ষতিকারক নয়। কিন্তু নানা ধরণের জৈব এবং অজৈব  কালার‍্যান্ট ও পিগমেন্ট, প্লাস্টিসাইজার, অ্যাটিঅক্সিডেন্ট, স্টেবিলাইজার এমনকি ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুসহ বিভিন্ন  রকম এ্যাডিটিভ ব্যাবহার করে এর ক্ষতিরকর দিকটি আড়ালেই রাখা হয়।
প্লাস্টিসাইজার হলো কম উদ্বায়ী চরিত্রের জৈব এস্টার। এই প্লাস্টিসাইজার লিচিং এর ফলে খাদ্যদ্রব্যে মিশে ক্যান্সারের ন্যায় মরণব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে। আর ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু ধীরে ধীরে শরীরে প্রবেশ করে হার্ট এনলার্জমেন্টসহ মস্তিষ্কের টিস্যুর ক্ষতি সাধন করে।
এক গবেষণা বলছে, পানি ভর্তি বোতলে প্রতি তিন দিনে প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে প্রায় ৩ লাখ ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি হয়। গবেষকরা আরও জানান, খাবারের সঙ্গে বছরে প্রায় ৬৮ হাজার ৫০০ ধরণের বিপদজনক প্লাস্টিক ফাইবার মানব  শরীরে প্রবেশ করে। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। 
ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হচ্ছে। পলিথিন ব্যাগের পাশাপাশি প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখেরও বেশি টিস্যু ব্যবহার করা হয়। আর তা জমা হচ্ছে জলাধার ও নদীতে। সেটি পৌঁছে যাচ্ছে মহাসাগর অব্দি। 
পয়ঃনিষ্কাশন সহ জীববৈচিত্রের উপর ফেলছে মারাত্মক প্রভাব। প্লাস্টিকের ভয়াবহতা সম্প্রতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বুড়িগঙ্গার পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করতে নদী খনন কালে। দেখা যায় প্রায় ৬ ফুট পর্যন্ত পুরু প্লাস্টিকের আস্তরণ জমা হয়ে আছে। যা, সরানো অতিশয় দুরহ ব্যাপার। এছাড়াও অতিমাত্রায় পলিথিনের ব্যাবহারে তৈরী হচ্ছে মশার স্বর্গরাজ্য। ভূমিকা রাখছে ম্যালেরিয়া ও ফাইলেরিয়ার মতো নিত্য নতুন রোগের  বিস্তারে। আর ডেঙ্গু তো এখন আরেক আতঙ্কের নাম।
সাম্প্রতিক  বিশ্ব অর্থনৈতিক  ফোরামের প্রতিবদন অনুযায়ী,  বিশ্বব্যাপী প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিক বোতল এবং প্রতিবছর প্রায় ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সাগরে পতিত হচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে প্রতি বছর প্রায় আড়াই কোটি টন ( ২৫ মিলিয়ন টন) প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে দেড় লাখ টন বর্জ্য মহাদেশের নদ- নদী ও  জলাশয়ে গিয়ে জমা হয়। 
জাতিসংঘের মতানুযায়ী, বিভিন প্রকার প্লাস্টিক বর্জ্যের দরুণ প্রতিবছর প্রায় ৮০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এমনটা আশঙ্কা করা হয় যে, এই হারে প্লাস্টিক পতিত হল আগামী  ২০৫০ সালর মধ্যে সাগরে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের সংখ্যাই বেশি হবে।
অপর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিবছর প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়। যেখানে এক কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে দুই থেকে তিন কেজি পরিমাণ কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। সেই সাথে যে  মিথেন গ্যাস নির্গত হচ্ছে তা  বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। যা নিতান্তই আমাদের দায়বদ্ধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। 
“যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ” বলছে–মুদি দোকান থেকে কেনা  পণ্য যে সামান্য পলিব্যাগে বহন করা হয়, তা প্রকৃতিতে  মিশে যেতে সময় লাগে ২০ বছর। আর কফি খাওয়ার জন্য যে প্লাস্টিকের কাপ ব্যাবহার করা হয় তার সময় লাগ ৫০ বছর এবং প্লাস্টিক বোতল মাটির সাথে মিশতে সময় লাগে ৪৫০ বছরেরও অধিক।
পরিবশ বিজ্ঞানীরা বলছে, প্লাস্টিকের দূষণ ক্ষমতা প্রতিনিয়ত যে হারে বেড়ে চলছে সেই আনুপাতিক হার ক্রমবর্ধমানভাবে চলমান থাকলে তার ভয়াবহতা হতে পারে পারমাণবিক বোমার মতোই। কেননা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ‘‘লিটল বয় ও ফ্যাটম্যান’’এর তেজস্রিয়তার রেশ এখন পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারে নি। আর প্লাস্টিক যেহেতু ৪৫০ বছরেও পচনশীল নয় সেহেতু এই প্লাস্টিক-ই হতে পারে এ যুগের নব্য পারমাণবিক বোমা।
আমাদের উচিত প্লাষ্টিকের এই ভয়াবহতা রোধকল্পে প্লাস্টিকের পূন:ব্যবহারের পাশাপাশি প্লাস্টিকের বিকল্পজাত পণ্য ব্যবহারে সচতন হওয়া। যাতে করে এই নব্য পারমাণবিক বোমার হাত থেকে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বকে রক্ষা করত পারি। 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ