বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ ২০২০ |

বছর জুড়েই নারীর অধিকার বজায় থাকুক

জুবায়ের আহমেদ   বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ ২০২০

১৯১৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ৮ই মার্চকে প্রতি বছর নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। দিবসটিকে ঘিরে সর্ববিষয়ে নারীর অধিকার বাস্তবায়নের প্রতি জোর দাবী থাকলেও মূলত ৮ই মার্চ নারীর মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হয়েছিল। প্রথমে দিবসটির নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস হিসেবে রাখা হলেও পরবর্তীতে শুধুমাত্র নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। যেখানে শুধুমাত্র কর্মজীবী নারীই নয়, সকল নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সম্মান, সামাজিক মর্যাদা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ সহ নারী উন্নয়নের সামগ্রিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা করা হয়।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রæয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োাজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়ঃ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে নারী দিবস। (তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া)

বাংলাদেশের নারীরা এগুচ্ছে দুর্বার গতিতে। পবিত্র ইসলাম ধর্মে নারীর ভরণপোষণের দায় দায়িত্ব পিতা-ভ্রাতা ও স্বামী-সন্তানের উপর হলেও নারীকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও কর্মে বাধা প্রদান করেনি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নারীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। সর্বক্ষেত্রেই নারীদের উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে দিন দিন। নারীরা এগিয়ে যেতে থাকলেও নারীর প্রতি সহিংসতা ও প্রতিবন্ধকতাও কম নয়। এখনো বহু নারী স্বামীর গৃহে শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। যৌতুকের জন্য বহু নারীকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়, স্বামীর গৃহ ছাড়তে হয়। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাওয়া ও সংসারের হাল ধরতে চাওয়া নারীদেরকে বিভিন্ন ভাবে দাবিয়ে রাখা হয়।

নারী শিক্ষা নিয়েও বহু প্রতিবন্ধকতা আমাদের সমাজে লক্ষ্য করা যায়। মেয়েদের লেখাপড়া করাতে অনীহা এবং বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষার বাহিরে ইংরেজী, বিজ্ঞান সহ নানা বিষয়ে মেয়েদের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দিতে না চাওয়া বহু পরিবারের কোন নারী সদস্যের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের প্রয়োজনে হাসপাতালে গিয়ে নারী ডাক্তার খোঁজেন তারা, অথচ নিজেদের পরিবারের মেয়েদের ডাক্তার বানাতে চান না। অসুস্থতা বিষয়ে কোন প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য খোঁজেন নারী টেকনোলোজিস্ট, কিন্তু নিজেদের পরিবারের কোন নারী সদস্য নার্স কিংবা মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট হবে, এটি তারা চান না। এসবের বাহিরে প্রত্যেকটি মাধ্যমেই নারীদের কার্য সম্পাদনের জন্য নারী সহায়তা চাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের পরিবারের কন্যাদের বিভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়বে সেটি তারা চান না, এই হলো আমাদের সমাজের বাস্তবতা। এছাড়াও শিশু কন্যা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মহিলা পর্যন্ত নানা ভাবে নিগ্রহের শিকার হন, সেসব বন্ধ করার জন্য পুরুষ মানুষদের ইতিবাচক মনমানসিকতা তৈরী এবং নারীরা বোঝা নয়, অবলা নয়, নারী একজন পুরুষের সকল কাজের সহ অংশীদার, একে অপরের পরিপূরক ভেবেই নারীকে দিতে হবে তার যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা।

প্রতি বছর ৮ই মার্চ নারী দিবস আসলেই নারীদের অধিকার নিয়ে স্বোচ্ছার হয় প্রতিবাদী নারীরা এবং বহু পুরুষ মানুষ। অথচ সারা বছর জুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা, অত্যাচার নির্যাতন এবং নারীকে অধিকার বঞ্চিত করে রাখার বহু ঘটনা ঘটছে। সেসবে দৃষ্টি নেই কারো। ৮ই মার্চ নারী দিবস প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শুধুমাত্র নারীকে অধিকার বঞ্চিত করা, যথাযথ মর্যাদা না দেওয়া এবং নারীকে পুরুষের মতো স্বাভাবিক দৃষ্টিতে না দেখার হেতুতে। এতেই স্পষ্ট যে নারীকে ভিন্ন চোখে দেখা হয় বলেই প্রতি বছর নারী দিবস ডাকঢোল পিঠিয়ে উদযাপন করা হয়।

নারী মায়ের জাতি, নারী অর্ধাঙ্গিনী, নারী ছাড়া পুরুষ সম্পন্ন নয়, নারী ছাড়া পুরুষের প্রয়োজনও তুচ্ছ। নারীকে মহান আল্লাহ তায়ালা পুরুষের চেয়েও বেশি এবং সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন। পুরুষ কর্তৃক নারীর প্রতি সকল প্রতিবন্ধকতার দেয়াল গুড়িয়ে দিতে হবে, নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, নারীর প্রতি সকল সহিংসতা বন্ধ করে নারীকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। নির্দিষ্ট কোন দিবসে নয়, নারী তার অধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুন্দর ও সুখী জীবন যাপন করুক সারা বছর জুড়ে। দেশ ও জাতির উন্নয়নে নারী অগ্রণী ভ‚মিকা রাখবে পুরুষের মতোই, সে দিনের স্বপ্ন দেখি।


শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম,
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)।



 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ