বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ ২০২০ |

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের সুদৃষ্টি ও সচেতনতা প্রয়োজন

ওসমান গনি   বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ ২০২০

করোনা ভাইরাসের কারনে কাঁপছে বাংলাদেশ। করোনা ভাইরাস সারাবিশ্বে মহামারি আকার ধারন করছে। যদিও এ ভাইরাস টি প্রথমে চীনে আক্রান্ত হয়ে লোকজন মারা যাওয়া শুরু করল তখন বিশ্বের অনেক দেশ একটা আতংকে ছিল। কারন রোগটি আস্তে আস্তে চীন ঘেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে কিনা। মানুষ যে আতংকে ছিল করোনা ভাইরাসের ভয়ে সেই করোনা ভাইরাস এখন বিশ্বের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। লোকজনও কমবেশি মারা গেছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষও একবারে ভয়ে আতংক গ্রগস্থ ছিলাম। কিন্তু না শেষ পর্যন্ত  আমাদের বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ৩ জন ধরা পড়ল। কিন্তু আমার কথা হলো, আমাদের সরকার আগ থেকেই দেশের ও দেশের মানুষের মধ্যে একটা আশা ও শক্তি জুগিয়ে ছিলেন এই বলে যে, আমরা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহন করে রাখছি। এজন্য তো সরকার কে সাধুবাদ জানাতেই হয়। সরকার কে মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে শক্তির সঞ্চার করার জন্য দেশের মানুষ সরকার কে প্রানখুলে মন থেকে ধন্যবাদ দিয়েছে।

কিন্তু একটি জিনিস দেশের মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে তাহলো, দেশে যে তিনজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত লোক ধরা পড়ল তারা আমাদের দেশের বিমানবন্দরের ধরা পড়ল না কেন? করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে দেশের প্রথম ও প্রধান স্থান হলো আমাদের বিমানবন্দর। ইটালি ফেরত লোকদের কে বিমান বন্দরে স্ক্যান করা হলো তাদের মধ্যে করোনা ভাইরাস ধরা পড়েনি। তাহলে বিমানবন্দরে এটা কি খেলনা হিসাবে রাখা হলো দেশের মানুষ কে শান্তনা দেওয়ার জন্য। আমাদের দেশে তিনজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের মানুষসহ পুরোদেশ করোনায় কাঁপছে।  এই ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত ৩ ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই জনমনে আতঙ্ক যেন আরো বেড়েছে। জনসমাগমস্থল ও গণপরিবহন এড়িয়ে চলতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ সেই আতঙ্কের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সামান্য সর্দি, কাশিতেই আতঙ্কিত হয়ে মানুষ ফোন করছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হটলাইনে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে অন্তত পাঁচদিন লাগে।

এদিকে এই ভাইরাস ঠেকাতে সরকারি উদ্যোগের প্রসংশা করলেও এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির রয়েছে বলেও মনে করছে আমাদের দেশের হাইকোর্ট। গত ৫ মার্চ করোনা প্রতিরোধে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানতে চান হাইকোর্ট। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ মার্চ  এ সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। করোনা ভাইরাস ছড়ানোর প্রেক্ষাপটে মাস্ক ও সেনিটাইজার নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে সিন্ডিকেট, কালোবাজারি করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও বলেন উচ্চ আদালত। সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয় কিন্তু যথেষ্ট নয়। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রস্তুতিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। এই ভাইরাস আরো ব্যাপক আকার ধারণ করার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে। এ নিয়ে অবহেলা, ঘাটতি থাকার কোনো সুযোগ নাই। এক-দেড়মাস হয়ে গেছে এখনো স্ক্যানার কেনার প্রক্রিয়ায় আছেন। কেনার জন্য বাজারে মাস্ক, সেনিটাইজার পাওয়া যাচ্ছে না। প্রস্তুতিতে ঘাটতি আছে। যদি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে মোকাবিলার প্রস্তুতি তো থাকতে হবে। কারণ এর কোনো প্রতিষেধক নেই।

দেশে হঠাৎ করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মাস্কের দাম বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণের বেশি মূল্যে মাস্ক বিক্রি করা হচ্ছে। এটি অনৈতিক কাজ। দেশের সংকটকালে মাস্কের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা কোনোভাবেই যেন অতিরিক্ত দাম না নেয় সে জন্য  মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সারাদেশে মনিটরিং করাসহ অপরাধ প্রমাণীত হলে অসাধু ব্যবসায়ীদের ড্রাগ লাইসেন্স বাতিল করার ব্যবস্থা করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্ততর গত ৯ মার্চ  দেশের মানুষের কল্যাণার্থে গুলশানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করায় আল নূর ফার্মেসি ও সাফাবি ফার্মেসিকে সিলগালা করেছে। জানা গেছে, রাজধানীর আরো কয়েকটি জায়গায় মাস্ক ও হ্যান্ড সেনিটাইজারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের ধরতে অভিযান চলছে। যারাই অনৈতিক উপায়ে পণ্যের দাম বেশি নেবে, তাদের কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। জাতির এ ক্রান্তিকালে অনৈতিকভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মাস্কের দাম বেশি নেয়া আইনত দণ্ডনীয়।

আমাদের দেশের মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের মতে,এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। শুধু যারা সংক্রমিত হয়েছেন তাদের সংস্পর্শে গেলেই অন্যদের সংক্রমণের ভয় আছে। সংক্রমণের শিকার রোগীকেই শুধু মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সুস্থ মানুষের মাস্ক ব্যবহারের দরকার নেই। অযথাই মানুষ মাস্ক কিনতে ছুটছেন। এ কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে। সেনিটাইজার না থাকলে সাবান দিয়ে হাত ধুলেও চলবে।

আমাদের দেশে  বিদেশ থেকে ফেরত প্রবাসীরাই এসেই দেশে করোনা ছড়িয়েছেন। তাই আহ্বান জানাব, এ ভাইরাস যেসব দেশে ছড়িয়েছে সেখান থেকে যেন প্রবাসীরা দেশে না আসেন। পাশাপাশি বিদেশ থেকে প্রবাসীদের আসা বন্ধে পর্যাপ্ত প্রচারণা করতে হবে। এছাড়া বিদেশ থেকে যারা আসবেন তাদের সবাইকে প্রয়োজন হলে কোয়ারেন্টাইন করা হবে। করোনা প্রতিরোধে কোরিয়া, ইরান, ইতালি ও চীনের নাগরিকদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থে স্বাভাবিকভাবে সব প্রতিষ্ঠানই খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।  তবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত হ্যান্ডওয়াশ ও সাবান রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের তেমন কোন অপরিহার্য নয়। কারন  স্কুল-কলেজে একই মানুষ প্রতিদিন আসেন। তবে সামাজিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সমাগম হয়। তাই এগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে।  করোনার চিকিৎসায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।  করোনা মোকাবিলায় ঢাকায় চারশ বেড এবং জেলা পর্যায়ে একশ বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ডাক্তার ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া করোনা পরীক্ষার পর্যাপ্ত কিট, মেশিন ও ওষুধ মজুত আছে। আরো ওষুধ ও কিট সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের ১০০ মিলিয়নের তহবিল দিয়েছে। তবে আরো তহবিল দরকার। সমাজের বিত্তবান এবং বিভিন্ন কোম্পানিকেও সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। তারা এই মুহূর্তে মাস্ক ও গাউন দিলে উপকার হবে।

 যারা বিদেশ থেকে আসছেন, তাদের অবশ্যই ১৪ দিন বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া যাবে না। তবে এটা মনে রাখতে হবে, বিদেশ থেকে এলেই কিন্তু তারা করোনা আক্রান্ত নন। সরকারী উদ্দোগ্যে দেশের প্রতিটি এলাকায় ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে।


লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট


 


 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ