মঙ্গলবার , ৩১ অক্টোবর ২০১৭

দুর্যোগের সঙ্গেই আমাদের বসবাস

  মঙ্গলবার , ৩১ অক্টোবর ২০১৭

বাংলাদেশে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিক্ষয়, বনাঞ্চল ধ্বংস, আর্সেনিক, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, বেকারত্ব, অপুষ্টি, নদীর নাব্য হ্রাসসহ নদ-নদীর পানি দূষণ। বাংলাদেশ প্রায় প্রতি বছর বেশ কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রতি বছর বাংলাদেশের ১৮% ভূমি বন্যায় প্লাবিত হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যা ছিল দেশের বৃহত্তম বন্যা। এই বন্যায় দেশের ৬০% ভূমি প্লাবিত হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যাকে ভয়াবহ বললেও ১৯৯৮ সালেও বাংলাদেশ একটি বড় ধরনের বন্যার সম্মুখীন হয়। এতে ৭৫% ভূমি প্লাবিত হয়। তখন বাংলাদেশ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে। বাংলাদেশ ২০০৪ সালেও একটি বড় বন্যার সম্মুখীন হয়। এছাড়া ছোট ছোট বন্যার সম্মুখীন হচ্ছে প্রতি বছর। তবে এই বন্যাসমূহ শুধু কয়েকটি জেলাভিত্তিক। বিশেষ করে যমুনা ও পদ্মার তীরবর্তী এলাকায় এর প্রভাব বেশি।

১৫৮২ সালের ঘূর্ণিঝড়ে দুই লাখ লোক মারা যায় (তথ্যসূত্র: আইনি আকবরি)। ১৬৯৯ এবং ১৭৬০ সালের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে সুন্দরবনের উপকূলে। এতে সুন্দরবন বেশ ক্ষতির মুখে পতিত হয়। ধ্বংস হয় সুন্দরবনের বনজ সম্পদ। ২০০৭ সালেও একটি দুর্যোগের সম্মুখীন হয় সুন্দরবন, এতে মারাত্মক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয় সুন্দরবন। বনজ সম্পদের পাশাপাশি বনের পশু-পাখি এবং জলজ সম্পদেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সময় লাগে বেশ কয়েক বছর।

বাংলা যখন ইংরেজদের হাতে চলে যায় নবাব সিরাজের হাত থেকে ঠিক তার ১০ বছর পর ভয়াবহ একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বরিশালে। এতে ৩০ হাজার লোক মারা যায়। ১৮২২ সালের একটি ঘূর্ণিঝড় বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপকূলে আঘাত হানে, এতে লোক মারা যায় প্রায় ৫০ হাজারের বেশি। এরপর ঠিক নয় বছর পর আরেকটি ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করে বরিশাল। বরিশালের উপকূলে এটি আঘাত হানে। এই দুর্যোগে ২২ হাজার মানুষ মারা যায়। আরো একবার ১৮৭৬ সালে বরিশাল অঞ্চল একটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হয়, এই ঝড়ে প্রাণহানি ঘটে দুই লাখ মানুষের। ১৯৯৭ সালে আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে চট্টগ্রাম উপকূলে।

১৮৯৭ সালে একটি ঘূর্ণিঝড় কুতুবদিয়া ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে, এতে প্রাণহানি ঘটে ১৪ হাজার লোকের। দুর্যোগের পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ কলেরায় মারা যায় আরও ১৮ হাজার মানুষ। ১৯৪৮ সালের ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রামে এক লাখ পরিবার ঘরছাড়া হয়। ১৯৬১ সালে খুলনা ও বাগেরহাটের ঘূর্ণিঝড়ে লোক মারা যায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষ। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়টি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী।  এতে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এবং ২০ হাজার জেলের নৌকা ধ্বংস হয়।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেল আইপিসিসি-এর সমীক্ষা অনুযায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা ৫০ সে.মি. বাড়লে বাংলাদেশের মোট ভূ-খণ্ডের ১২ শতাংশ সাগরগর্ভে নিমজ্জিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ১৮শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ০.৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়েছে যার প্রভাব পড়ছে সমগ্র বিশ্বে।

সম্প্রতি বিলুপ্ত সোনালি ব্যাঙ এবং হার লেকুইন ব্যাঙকে ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ইউনেস্কোর জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের ৭৫% ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষার আগে বা পরে খরা দেখা দেয়। ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কখনো সারাদেশে একযোগে খরা দেখা দেয়নি। ১৯৫১ সালে ৩১% ১৯৫৭ সালে ৪৭%, ১৯৫৮ সালে ৩৭%, ১৯৬১ সালে ২২% , ১৯৬৬ সালে ১৮% , ১৯৭২ সালে ৪৩% এবং ১৯৭৯ সালে ৪২% অঞ্চল খরা আক্রান্ত হয়েছিল। খরার প্রকোপে ৯০-এর দশকে চাল উত্পাদন ৩.৫ মিলিয়ন কম হয়েছে।

ভারতের ফারাক্কা বাঁধের উজানে পানি প্রত্যাহার করার ফলে ভাটিতে পানির প্রবাহ ও স্বাদু পানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ থেকে আসা পানি প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার ফলে দক্ষিণ পশ্চিমে উজানের দিকে ক্রমেই লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে এবং গোটা অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জ লবণাক্ততায় বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

বাংলাদেশের অন্য একটি মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে আর্সেনিক সমস্যা। বর্তমানে এর প্রভাব একটু কমই বটে। দেশের ৬৪ জেলার মাঝে ৬১টি জেলাই এই দূষণের শিকার। আর্সেনিক একটি মারাত্মক বিষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আর্সেনিক সহনীয় মাত্রা দশমিক শূন্য এক। বর্তমানে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে এর মাত্রা .০৫ মি. ছাড়িয়ে গেছে। আর্সেনিক হলো একটি ধাতব মৌল যা পানিতে দ্রবীভূত থাকলে সেই পানি ব্যবহার করা বিপজ্জনক। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, চীন, জাপান, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের অনেক দেশে আর্সেনিক একটি অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে গেলে পানির সাথে আর্সেনিক যুক্ত হয়ে দূষণ ঘটায়।  কোনো অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টি হলে নদ-নদী বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাব্য হারিয়ে ফেললে অতিরিক্ত পানি সমুদ্রে গিয়ে নামার আগেই নদ-নদী কিংবা ড্রেন উপচে আশপাশের স্থলভাগ প্লাবিত করে ফেললে তাকে বন্যা বলে। সাধারণত নদ-নদী ও সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল, নিম্নাঞ্চল, পাহাড়ের ঢালু অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যা সাময়িক জলাবদ্ধতা নয়, বরং দীর্ঘকালীন দুর্যোগ— যা কয়েক সপ্তাহ থেকে মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

নদী ভাঙন একটি মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর ফলে ঘরবাড়ি, কৃষি, ভূমি, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট প্রভৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের স্বপ্ন, আশা-ভরসা সবই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মানুষ হয়ে যায় অসহায়, নিঃস্ব। মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবন এবং পরিবেশের উপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে নদীর তীর নরম হয়ে যায় এবং নদীতে অতিরিক্ত পানি প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এসময়ে নদীতে পলি জমা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অধিক হারে নৌযান চলাচল প্রভৃতি কারণে নদী ভাঙনের ঘটনা ঘটে। প্রতি বছর বাংলাদেশ এই দুর্যোগের সম্মুখীন হয়।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ