মঙ্গলবার , ৩১ অক্টোবর ২০১৭

গোপালগঞ্জ সংবাদদাতা : 
২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত এখানে ৩৮৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিল। কোনো কোনো ওয়ার্ডে শয্যার বাইরে রোগী রয়েছে, যাদের ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে।
গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি এক শিশুর দাদি কল্যাণী বিশ্বাস বলছিলেন, ‘নাতির পাতলা পায়খানা নিয়ে হাসপাতালে আসি।
ডাক্তার রোগীকে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি করে। এখানে যে পরিবেশ তাতে রোগী আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। ওয়ার্ডের বাহিরের ও ভিতরের পরিবেশ খুবই নোংরা। বমি আসে। তারপর কষ্ট করে থাকছি। ’
ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সামনে যে অবস্থা সেটা দেখলে মনে হবে ওয়ার্ডটির নিজেরই ডায়রিয়া হয়েছে। পানি জমে আছে। পানি  থাকার কারণে কোথাও কোথাও শেওলা পড়ে গেছে। পেছনে রয়েছে একটি ডাস্টবিন।
সেখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা গরু খাবার খুঁজে খাচ্ছে।
গতকাল সোমবার সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরেও এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ওয়ার্ডগুলোর ভেতরের পরিবেশ মোটামুটি ভালো হলেও বাইরে ময়লার স্তুপ পড়ে আছে।
বহির্বিভাগের দক্ষিণ পাশে রয়েছে বড় ডাস্টবিন। সেটা উপচে আশপাশ ভরে গেছে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে সারা হাসপাতাল এলাকায়। কেউ কেউ নাকে কাপড় দিয়ে চলাফেরা করছে।
হাসপাতাল এলাকায় বসবাসকারীরা জানিয়েছে, নিত্যদিনের এ ভোগান্তি তাদের সয়ে গেছে।
ডায়রিয়া ওয়ার্ডের নোংরা পরিবেশ ও দুর্গন্ধের কথা স্বীকার করে দায়িত্বরত নার্স শান্তা সুইটি মৃধা বলেন, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে মোট ১৪টি শয্যা রয়েছে। সেখানে রোগী রয়েছে ২১ জন। এ ছাড়া আছে তাদের লোকজন। ওয়ার্ডের সামনে পানি জমে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। পেছনে ডাস্টবিন। এ কারণে খুব সমস্যা হয়।
শিশু ওয়ার্ড, গাইনি ওয়ার্ড, চক্ষু বিভাগ, পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড মিলিয়ে মোট ১৫টি ওয়ার্ড রয়েছে এ হাসপাতালে।  
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কথা হয় হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মো. সোহেল সিকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, হাসপাতালে সরকারিভাবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন সাতজন। একজন শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেষণে আছেন। তিনজন অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) আছেন। এখন হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্ত তিনজন এবং গোপালগঞ্জ ড্রাগ অ্যাসোসিয়েশন থেকে পাওয়া পাঁচজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এত বড় হাসপাতালে এত কমসংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে শতভাগ কাজ আশা করা যায় না বলে তিনি মনে করেন। তাঁর দাবি, তিন পালায় অন্তত ৪৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ৪৫ জন বয় বা আয়া থাকা প্রয়োজন।  
জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি গ্রামের লিটু মন্ডল গাইনি ওয়ার্ডের পিও-০৩ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, ‘আমার সিজারে বাচ্চা হয়েছে। সিজার করতে আমার দুই-আড়াই হাজার টাকার ওষুধ লাগে। সেটা আমার স্বামী কিনে দেছে। হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ দেয়নি। শুধু অপারেশন করেছে। ’
গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন পাশের বাগেরহাট জেলার মোল্লারহাট উপজেলার মেহেরপুর গ্রামের কাকলি সিকদার, গোপালগঞ্জের বন্যা বেগমসহ বেশ কয়েকজন রোগী বলছিলেন, হাসপাতাল থেকে দু-একটা খাবার বড়ি দেয়। বাকি সব দামি ইনজেকশন বাইরের দোকান থেকে কিনতে হয়।
হাসপাতাল ঘুরে জানা গেছে, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের দালালদের দাপটে রোগীরা অতিষ্ঠ। দালালদের কেউ বোরকা পরে, আবার কেউ রোগীর স্বজনদের ছদ্মবেশে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যায়। হাসপাতালে বিভিন্ন ঝামেলা বা সমস্যার কথা বলে রোগীদের ক্লিনিকে নিয়ে যায় তারা। শহরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো তাদের মাসিক বেতন বা কমিশনের ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী জানিয়েছেন, গোপালগঞ্জ শহরে প্রায় ৩০টি ক্লিনিক ও ৩৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দু-একজন করে দালাল হাসপাতালে নিয়োজিত। তাদের বেশির ভাগই নারী। তাদের সহায়তা করেন হাসপাতালে কর্মরত বেশ কয়েকজন কর্মচারী। এর বিনিময়ে তাঁরা দালালদের কাছ থেকে টাকা পান।
এসব সমস্যা নিয়ে কথা হয় হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. ফরিদুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লোকেরা হাসপাতাল গেটের বাইরে অবস্থান করে। তারা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায় বলে আমি শুনেছি। কিন্তু বাইরে খেয়াল রাখা একটু কষ্টের বিষয়। ’
ডা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের ওষুধ রোগীদের জন্যই। যতক্ষণ ওষুধ থাকে, সেটা রোগীরাই পায়। যখন থাকে না তখন বাইরে থেকে কিনতে হয়।
হাসপাতালের পরিবেশের বিষয়ে সহকারী পরিচালক বলেন, ‘লোকবল কম থাকায় আমরা শতভাগ পরিষ্কার রাখতে পারছি না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নিয়োগ হলে বা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল পেলে তখন আর সমস্যা থাকবে না। ’
এদিকে গতকাল সংবাদ প্রকাশের পর গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। পরে বিকেল ৩টায় তিনি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নবিষয়ক এক সভায় মিলিত হন।

 বিশেষ খবর থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ