বুধবার , ০১ নভেম্বর ২০১৭

লাগে টাকা, দিবে অসহায় জনগণ

  বুধবার , ০১ নভেম্বর ২০১৭

জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রায়ই দেখতে পাই রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বড় অংকের লোকসান গুনছে। কয়েকটি বড় বড় সংস্থা যেমন রেলওয়ে, ডাক বিভাগ, বিমান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, টেলিটক, পাটকল করপোরেশন, চিনি শিল্প সংস্থার পুঞ্জিভূত লোকসানের পরিমাণ দেখলে রীতিমতো মাথা ঘুরে যায়। অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুঁরে কুঁরে খেয়েছে এবং খাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বাজেটের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিরাট দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর সরকারি কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। শব্দটি, ‘সরকারি কোষাগার’ বলা হলেও ঘুরে ফিরে এটি জনসাধারণের পকেটকে বুঝায়। বছরের পর বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান গুনছে, অথচ এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বার্ষিক প্রতিবেদন বের হলে একটু হৈ চৈ হয়। তারপর সব চুপসে যায়। আমরা মেনে নিয়েছি কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লোকসানে চলবে, এতে কিছু যায় আসে না। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে গেলে ঝামেলা বাড়বে। তার বদলে যে ভাবে চলছে, সেভাবে চলতে দেওয়া শ্রেয়।

লোকসানি সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ লোকসানের পেছনে একশ’ একটি কারণ দেখাবেন। কঠিনভাবে পরীক্ষা করলে এ কারণগুলো ধোপে টিকবে না। যুক্তি উপস্থাপন করা হয় যে, উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী বা সার্ভিসের দর সরকার উৎপাদন ব্যয়ের নীচে নির্ধারণ করে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে প্রতি ইউনিট সামগ্রী লোকসানে বিক্রি করতে হয়। এটি যদি সত্য হয়, তবে এ দায় সরকারকে বহন করতে হবে। রাখ-ডাক করে নয়, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তা করতে হবে। যদি জনস্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় উৎপাদিত সামগ্রী কম দামে বিক্রি করতে কারখানা কর্তৃপক্ষকে বাধ্য  করা হয়, তবে এজন্য সে কারখানাকে, ‘পাবলিক সার্ভিস অবলিগেশন’ বা চঝঙ দিতে হবে। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আয়ের সঙ্গে যোগ হবে। তার লাভ-লোকসানের হিসাবেও এটি এসে যাবে। তা না হলে সমগ্র প্রক্রিয়ার একটি বিকৃত ছবি জনসাধারণের কাছে উপস্থাপতি হবে। সরকারের সঙ্গে যথাযথভাবে দর-কষাকষি করাও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

এক সময় রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার উৎপাদিত সামগ্রী কম দামে বিক্রি করা হতো। এখন কিন্তু সে অবস্থা নেই। মিল-কারখানার দ্রব্যসামগ্রী বাজার দরে বিক্রি করা হয়। যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলোতে উৎপাদিত লালচে চিনির বাজার দর কেজি ৬২ টাকা, আর বেসরকারি মিলের সাদা (রিফাইনড )চিনি বিক্রি হয় কেজি ৫৫ টাকা। তাহলে চিনি কলগুলো লোকসান দিবে কেন? যদি লোকসান হয় তবে তা সরকারি নীতির দুর্বলতা বা ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা। ভোগান্তি জনগণের।

সমস্যার একটি বড় কারণ হচ্ছে আমরা সময় নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রগাঢ় (জরমড়ৎড়ঁং) ভাবে পর্যালোচনা করি না। প্রগাঢ় পর্যালোচনায় দুর্বলতাসমূহ বেরিয়ে আসবে। সেসব দুর্বলতা নিরসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ কঠোরভাবে গ্রহণ করলে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক হয়ে উঠতে বাধ্য। এর জন্য যথাস্থানে যথোপযুক্ত লোক বসাতে হবে। তাদেরকে ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করতে হবে, মন্দ কাজ করলে তিরস্কার করতে হবে।

এক কথায় যারা শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত তাদের স্বার্থের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। তারা যেন মনে না করেন যে, ‘কোম্পানি কা মাল, দরিয়া মে ঢাল’। নির্বাহীর স্বার্থের সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মেল-বন্ধন ঘটানো খুবই শক্ত কাজ। এ কাজটি সুষ্ঠু রূপে করতে পারলে প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াবে। এটি লাভজনক হয়ে ওঠবে। জ্ঞান, দক্ষতার অভাব, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির কারণে এ কাজটি আমরা করতে পারি না। অতএব, হে জনতা, তোমাদের পকেটই আমাদের শেষ সম্বল সহজ টার্গেট।

 সাক্ষাৎকার থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ