রবিবার , ২২ মার্চ ২০২০ |

ধর্মবিশ্বাস এবং অট্টহাসি !

ডাঃ তাইফুর রহমান   রবিবার , ২২ মার্চ ২০২০

বন্ধুর অট্টহাসি আমাকে বিচলিত করে। বন্ধু হাসে, তুমি দোয়া কইরা করোনা ঠেকাইবা? থাক তোমার আল্লাহর উপর বিশ্বাস নিয়ে। এই বিজ্ঞানের যুগেও তোমরা! আমি চুপ করে থাকি। ভাবতে থাকি অতীত জীবন নিয়ে।

১. ২০১০ সাল।আমি তখন নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। হজ্বে থাকা অবস্থায় মক্কায় বসেই পাই মায়ের মৃত্যু সংবাদ। ক্বাবার সামনে মাকামে ইবরাহীমের কাছে জুমার খুৎবার মঞ্চ রেডি । আমি ডান পাশে দ্বিতীয় কাতারে। পাশে বসা একজন মিশরীয় আমার মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে আমার হাত উপরে তুলে ধরলো। এত সুন্দর একটা দোয়া করলো! বললো আমি একজন হাফেজ। আমাকে বললো তুমি প্রতিদিন এক আয়াত মুখস্থ করো একদিন তুমিও হাফেজ হয়ে যাবে। যদি না ও পারো আল্লাহ কবুল করে নিবেন। মনে রেখাপাত করলো।

ক্বাবার সামনে দোতলায় বসে সবাই সুললিত কন্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করছে। আমি অবাক হয়ে শুনি। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। আমি ভাবি গুন্নাহ্, নুক্তা, মাদ কিভাবে পারবো আমি? আমিতো হরফই চিনিনা!

দেশে ফিরে যোগ দেই কর্মক্ষেত্রে। এক নেতার সাথে কিছু বিষয়ে ঝামেলা হলো। আমি চেষ্টা করেও বিরোধ মিটাতে পারলাম না। এক রাতে তিনি আমাকে টেলিফোনে মেরে ফেলার হুমকি দেন। আমি তিন মাসের আর্ন লিভ নিলাম। সাথে সাথে ট্রান্সফারের চেষ্টা করলাম। একজন মন্ত্রী আমাকে তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে নিয়ে গেলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রী মহোদয় আশ্বাস দিয়ে দরখাস্ত রেখে দিলেন। তখন হঠাৎই ডিপিসি হবে বলে সবধরনের ট্রান্সফার, পোস্টিং বন্ধ হয়ে গেল। আমিও ছুটি নিতেই থাকলাম। ছুটি শেষ হওয়ার উপক্রম হলো।

একপর্যায়ে ঐ ভদ্রলোক কুমিল্লার এক নেতা, আমার অতি প্রিয় একজন মানুষকে অনুরোধ করলেন আমাকে কুমিল্লা থেকে বের করে দেয়ার জন্য কারন আমি মার্ডার কেইসের আসামি, দুর্ধর্ষ ক্যাডার!! কুমিল্লার সেই নেতাও ভুল বুঝলেন। আমি বললাম জীবনে কাউকে থাপ্পর দিয়েছি মনে পড়ে না।

আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। আমি পাকড়াও হয়ে গেলাম সবদিক থেকে। শেষ চেষ্টা হিসাবে আমি একরাতে তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম। পরদিন মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে বললো এখন ট্রান্সফার বন্ধ হলেও আমরা আপনার এটাচমেন্ট ক্যানসেল করে দিলাম।
আমি হলাম ওএসডি। এই সুযোগে আমি একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলাম, নিজে মাদ্রাসা লাইনে পড়াশোনা শুরু করলাম। মাখরাজ দিয়ে শুরু করে নাজারা পর্যন্ত পড়লাম।

আলহামদুলিল্লাহ আমি কিছুদিন আগে মসজিদে নববীতে শায়েখদের কাছে পড়া দিলাম। তারা সহীহ বলেছেন। এ আমার জন্য আল্লাহ পাকের অপূর্ব নেয়ামত।

২. মুন হাসপাতালে এনজিওগ্রাম মেশিন আসলো। মুন হাসপাতাল ব্যপকহারে প্রচার করলো। আমি হতাশা উপলব্ধি করলাম। আমার পাশের চেম্বারের এক ডাক্তার এনজিওগ্রাম করবে আর আমিতো ভালোভাবে পারি না। না, সম্ভব না। সবাই বললো এই প্র্যাকটিস ফেলে কিভাবে এনজিওগ্রাম শিখতে যাবেন? তবুও আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলাম।

এর মধ্যে আমার সহকারী অধ্যাপক চ.দা. বদলে জুনিয়র কনসালট্যান্ট কনফার্ম করে পোস্টিং দেয়া হলো। পোস্টিং দিল মুরাদনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। জয়েন করার আগেই মন্ত্রণালয় থেকে আরেকজনকে মুরাদনগর দিয়ে দিল। আমি ঝুলে গেলাম।

ডিজি অফিস থেকে ফোন দিল আপনাকে কোথায় দিব? আমি বললাম আশেপাশে কোথাও দিয়ে দেন। এতে অফিস সহকারীর প্রচন্ড গোস্বা হলো। উনি আমাকে হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পোস্টিং করিয়ে দিলেন। পরে শুনলাম একটা হাজার টাকা দেয়া দরকার ছিল।

তারপর আট মাসে সচিব, মন্ত্রী, এমপি এমন কেউ নেই যে দেখা করিনি। সচিব মহোদয় জয়েন্ট সেক্রেটারিকে বললেন ওনাকে হাতিয়া ফেলে রেখে দেশের কি লাভ? নাহ্,তারপরও কিছুই হয়নি। পারিনি ট্রান্সফার হতে। হাতিয়ায় কাউকে না দিয়ে আসা যাবে না।

শেষ পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মহসিন ভাই বুদ্ধি দিলেন ইনভেসিভ কার্ডিওলজিতে ফেলোশিপ কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য। হার্ট ফাউন্ডেশনে চলে আসলাম। ওখানকার ম্যাডামও স্যারদের আন্তরিক তত্বাবধানে প্রচুর কাজ করার সুযোগ পেলাম। এখানে প্রতিদিন ৮০-৯০ টা এনজিওগ্রাম হয়। নিজে প্রতিদিন আট দশটা এনজিওগ্রাম করতাম। বিশেষ করে আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরন করতে হবে ডাঃ অশোক কুমার দত্তকে।

৩. একটু দ্রুত হাঁটতে গেলেই হাঁপিয়ে উঠি। ভয় হচ্ছিল হার্টে বোধহয় ব্লক আছে। আমার যেহেতু হাঁপানি আছে সবাই ধরে নিল এ কারনেই এমন হচ্ছে। আজও আমি সাত তলায় হেঁটে উঠেছি। আমার ইকো করে বলা হলো হার্ট ১০০% নরমাল।
তবুও আমি গেলাম এনজিওগ্রাম করাতে।

হাত দিয়ে ছিদ্র করে এনজিওগ্রাম করা হলো। প্রথম ছবিটা দেখেই আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম , লেফট্ মেইন! সবাই চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইলেন, একি লেফট্ মেইন থেকে শুরু করে দুইটা ব্রাঞ্চের গোড়ায় ব্লক। মারাত্মক ব্লক। আমার ফ্যামিলির সবাইকে ডেকে নিয়ে আসা হলো। সবাইকে জানানো হলো এর পরিনতি হলো সাডেন ডেথ। মানে এটাক হলে হাসপাতালে নেয়ার সময় পাওয়া যাবে না। সব স্যাররা চলে আসলেন। ফজিলাতুন্নেছা মালিক ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন কি করবা রিং লাগাবা নাকি বাইপাস?

আমি বললাম ম্যাডাম, রিং লাগিয়ে দিন। ব্যংকে টাকা জমা দিয়ে দিলাম। পায়ে ছিদ্র করা হলো। রিং লাগানোর গাইড ক্যথেটার এনগেজ করা হলো। রিং খোলা হলো। শুধু রিং ফিট করা বাকি। হঠাৎ ম্যাডাম গ্লাভস খুলে ফেললেন। বললেন তিনদিন রক্ত তরল করার ঔষধ খাও তারপর করবো, নাহলে রিং বন্ধ হয়ে যাবে।

তিনদিন পর সকালবেলা আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী স্যার বললেন খবরদার রিং লাগাবেনা, এই জায়গায় রিং টিকে না। একমাসও টিকবে না রিং। পড়ে গেলাম দ্বিধা দ্বন্ধে। কি করবো? অগত্যা কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। অশোক দত্ত স্যার সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেই ফোন দিলেন, 'বেঁচে গেছেন। আল্লাহ যে মানুষকে হাত দিয়ে বাচিয়ে দেন আপনাকে দেখে বুঝলাম। '

অপিনিয়ন নেয়ার জন্য ইন্ডিয়া গেলাম। সাথে এলাকার এক ছোট ভাই, টাকা বলতে একটা ক্রেডিট কার্ড। ডা. নরেশ ত্রিহান, মেদান্তা হাসপাতাল, দিল্লি। আমার এনজিওগ্রামের সিডি দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠলেন, এখন ভর্তি, কাল অপারেশন। আমি বললাম আমারতো কোন সমস্যা নাই, আমি প্রিপেয়ার্ড নই। উনি বললেন তুমি রিস্ক নিতে পারো আমি পারি না। আমি তোমাকে ঘুমে মরতে দিতে পারি না। সাডেন ডেথ হবে তোমার। আমি তাও রাজি হচ্ছিলাম না। আমার সাথে আর কথা বাড়ালেন না।

আইসিইউতে ফোন করে বললেন, Young Bangladeshi cardiologist. Admit him & monitor. আমাকে দুইজন ধরে নিয়ে আইসিইউতে ভর্তি করে দিল। তার পরদিনই বাইপাস সার্জারি করে ফেললেন। বলা হয়নি, বারো বছর আগে মুন হাসপাতালে যেদিন ইটিটি মেশিন আনে সেদিন কৌতুহল বশতঃ ইটিটি করতে গেয়ই পেয়েছিলাম স্ট্রং পজিটিভ ইটিটি। আমি পজিটিভ বলে চিৎকার করে উঠেছিলাম। তার পরদিন ওয়াদুদ চৌধুরী স্যার, তৌফিক শাহরিয়ার ভাই আমাকে অতি দ্রুত ঢাকায় যেতে বললেন। তারা আমার এনজিওগ্রাম করবেন। তারপর বেমালুম ভুলে গেলাম।

এমন ঘটনাও কেউ ভুলে যায়! তাও হার্টের ডাক্তার হয়ে! আমি ক্যলাস। আমার হার্ট এটাক হতে পারতো, মরে যেতে পারতাম। আর যদি এনজিওগ্রাম করা হতো বাইপাস করা হতো। আর্টারিয়াল গ্রাফ্ট লাগানোর সিস্টেমই ছিলোনা তখন । ভেনাস গ্রাফ্টগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে যেত এতোদিনে । হয়তো সেগুলোতে আবার রিং লাগানো লাগতো । আমার জীবনের অনেককিছুই হয়তো থমকে যেতো এতোদিনে।

আমার জীবনের অনেক প্রয়োজনও আমি বুঝিনি। যা বুঝেছি তাও যেভাবে চেয়েছি, সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও পারিনি। সেগুলো অন্য কোন পন্থায় আল্লাহ ঠিকই পুরণ করে দিয়েছেন।

সুতরাং তাওয়াক্কল তু আলাল্লাহ বলাটা কি খুব অন্যায় হবে?ধর্মই আমাকে শিখিয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। তবে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ' তোমরা উট বেঁধে তাওয়াককুল করো।'

আল্লাহ সুবহানু তায়ালা যা করেন তার বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা অবশ্যই আছে। আল্লাহ মহামারী করোনা থেকে নিশ্পাপ শিশুদের রক্ষা করেছেন। করোনা যেসব রিসেপ্টরের মাধ্যমে কাজ করে সেই এসিই রিসেপ্টর ও ইন্টারলিউকিন ৬ রিসেপ্টর ওয়েল ডেভেলপড্ না শিশুদের দেহে । কত সুন্দর বৈজ্ঞানিক উপায়ে তাদের রক্ষা করেছেন আল্লাহপাক।

সুতরাং আসুন উট বেঁধে, পর্যাপ্ত নিয়ম মেনে আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াককুল করি। দয়া করে কারো ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করবেন না। যিনি কটাক্ষ করছেন তিনি বোকা, তিনি হতভাগা।

ডাঃ তাইফুর রহমান
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
ডি-কার্ড, এমডি (কার্ডিওলজি)
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ