রবিবার , ২২ মার্চ ২০২০ |

করোনাভাইরাসের দুর্দিন যেভাবে মানবিকতার ‘সুদিন’

হাসান ইমাম   রবিবার , ২২ মার্চ ২০২০

সংস্পর্শ থেকে সংক্রমণ করোনাভাইরাস-কাহিনি হলে মানুষের রূপকথার নির্যাস—সংসর্গ থেকে সংঘবদ্ধতা। চিরকালীন সেই ঐক্য-একতা, যার ওপর রচিত মানবসমাজ। করোনাভাইরাসের এই দিনগুলোতে সামাজিক মানুষের জীবনের সেই সারকথা পরীক্ষার মুখে।

হ্যাঁ, করোনা-পীড়িতের কাছে যেতে না পারব না মানে তার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়াও কিন্তু নয়। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে সংক্রমিত ও অসংক্রমিত (সম্ভাব্য!) মানুষের স্ব স্ব দায়িত্ব পালনই একদিকে এই মহামারিকে পরাজিত করবে, অন্যদিকে বোধন ঘটাবে মানবিক সমাজের, আরেক দফায়।

ইতিহাসের পাতা ঢুঁড়ে যারা এর স্বপক্ষে দলিল-দস্তাবেজ পাবেন না, তাদের বলব, মানুষের কৃর্তী ইতিহাসে লিখিত, ইতিহাস মানুষের জয়যাত্রার রচয়িতা নয়। তাই নতুন করে ইতিহাস নিজেরা গড়ুন। এই দুর্দিন আপনার সামনে সেই ‘সুদিন’ এনে দিয়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব যেহেতু চীনের উহানে, নিশ্চিত করেই চলে দেশে এই ভাইরাসটির উপস্থিতি ছিল না। বিদেশফেরত সংক্রমিত ব্যক্তি/ব্যক্তিদের মাধ্যমে দেশে এর বিস্তার ঘটছে। এই নিয়ে প্রবাসীদের পক্ষে-বিপক্ষে যে বাহাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অস্থির, যার প্রভাবে কেঁপে উঠছে সমাজের পাটাতনও, করোনা এই ‘সুযোগ’টাই নেবে! কারণ, আমরা কেউই আমাদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছি না, একে অন্যের দোষ সামনে আনছি মাত্র।

বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা, অথচ তারা সবাই যে মানছেন না, এরই মধ্যে গণমাধ্যমে তা ফলাও করে এসেছে। ১৪ দিনের এই ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ থাকার মাধ্যমে তারা নিজেদের পরিবার-পরিজন শুধু নয়, প্রতিবেশী-গ্রামবাসী-ইউনিয়ন-থানা-উপজেলা-জেলা হয়ে পুরো দেশের মানুষের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন। এর চেয়ে বড় কী ‘কাজ’ করা সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে—কী দুর্দিনে, কী সুদিনে!

একজন নাগরিকের জীবদ্দশায় দেশের জন্য এত বড় করণীয় পালনের সুযোগ কি দুবার আসবে? যেখানে ১৮-২০ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বছরের বছর পরিবার-আত্মীয়-স্বজন, দেশ ছেড়ে ‘নির্বাসনে’ থাকতে পেরেছেন, সেখানে মাত্র ১৪ দিন! এই সময়টুকু কি দেশে ফিরে আসা প্রবাসী ভাই-বোনেরা নিজেদের আবেগ সংবরণ করতে পারেন না? না, আমরা ভুলিনি, আপনাদের রক্ত জল করে পাঠানো রেমিটেন্সের কথা, যা দেশের অর্থনীতির বড় শক্তি। কিন্তু করোনা সংক্রমণ রোধে অর্থও যে একঅর্থে ‘শক্তিহীন’। কেননা, আপনি হোম কোয়ারেন্টিনে থাকলে করোনা লাগামছুট ঘোড়ার মতো দিকে দিকে ছুটে যাবে। তখন তাকে বশে আনতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলেও কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। করোনাকে কাবু করতে চাই স্রেফ সতর্কতা। এরই মধ্যে আমাদের চেয়ে অনেক টাকাওয়ালা দেশের ক্ষেত্রে এ কথা ফলে গেছে। এরপরও কি আমাদের হুঁশ হবে না?

আর যারা দেশে আছি, তারা যদি বলি, আমরা তো করোনাভাইরাস ছড়ানোয় দায়ী নই, তাহলেও আমাদের দায় কিন্তু আরও বেড়ে যায়। শরীরে বহন করা ভাইরাস ছড়ানোর চেয়ে মিথ্যা-আজগুবি-বানোয়াট এবং অবৈজ্ঞানিক তথ্য বা গুজব ছড়ানো কম ভয়ঙ্কর নয়। আমরা অনেকেই অর্থহীন অনৃতভাষণে এরই মধ্যে কম সর্বনাশ ঘটাইনি। গরমের করোনাভাইরাস কমজোরি হয় ইত্যাদি। ঢালাওভাবে দেশে আসা প্রবাসীদের মুণ্ডুপাত করার প্রবণতাও কম বলা যাবে না। অথচ অন্য দেশ থেকে আসা বিদেশিরাও একই রকম ঝুঁকির কারণ। এখানেও সেই দায়িত্ববোধের প্রশ্ন।

আমার-আপনার ঘরের বা প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কেউ বিদেশফেরত হলে বাড়তি দায়িত্ব বর্তায় কাঁধে। বিদেশফেরত মানুষটির হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি তো আমাদেরই। তাই তার জন্য ভোজের ব্যবস্থা না করে, পুনর্মিলনীর আনন্দ-আয়োজন না করে স্বজন ফিরে পাওয়ার আহ্লাদে একটু রাশ টানুন। সরাসরি দেখা না করে ফোনে-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কুশলাদি নিন, তার দায়িত্বের (হোম কোয়ারেন্টিন) কথা মনে করিয়ে দিন। এর হেরফের হলে প্রয়োজনে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন। নিশ্চিত জেনে রাখুন, স্বজনের সঙ্গে কয়েকদিনের এই সামান্য ‘দূরত্ব’ সামনে বুকে জড়ানোর অঢেল দিন নিয়ে আসবে।

ঝুঁকি কমাতে সন্তানের স্কুল-কলেজ ছুটি দেওয়া হলো। আর আমরা কিনা পরিবার নিয়ে ভ্রমণে বের হলাম। সংখ্যায় হয়তো খুব বেশি নই এই আমরা, কিন্তু এমন দুর্দিনে একজনই শতজনের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারি। করোনার এমন বিপদেরই ডাক দিয়েছে। এই স্বল্প সময়ে বিশ্বব্যাপী ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় সেই বার্তা স্পষ্ট।

অথচ দরকার নেই, খাদ্যসামগ্রী কিনে ঘর ভরছি অনেকে। মওকা বুঝে অসাধু ব্যবসায়ীরাও দিচ্ছেন জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে। আচ্ছা, এই অসাধু ব্যবসায়ীরা শতকরা হিসাবে বা সংখ্যায় কত? বছরের বছর ঈদ-রোজা, পূজাসহ নানা ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব-পার্বণের আগে যেভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রতিযোগিতার কাছে ক্রেতাসাধারণ কুপোকাত হন, তাতে সাধু ব্যবসায়ীর ‘অস্তিত্ব’ থাকা নিয়েই সন্দেহ জাগে! সর্বশেষ পেঁয়াজ-কাণ্ডের পর এখন মাস্ক নিয়ে যা ঘটছে, তাতে যে কারো মনে হতেই পারে কোনো ব্যবসায়ীরই মুখ দেখি না আমরা, ‘মুখোশ’ দেখি!

তবু ভরসার কথাটি হলো, প্রত্যেকে যদি নিজের জীবনের দিকে তাকাই, দেখব, দশজনে হাত লাগালে যে কোনো কাজই সহজ হয়ে যায়—এই অভিজ্ঞতার বাইরে আমরা বেড়ে উঠিনি। কোনো না কোনো ক্ষেত্রে জীবনে একবার হলেও আমরা অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছি। এখন সেই যূথবদ্ধতার সময়, আরেকবার।

হ্যাঁ, সরকারের-কর্তৃপক্ষের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপ, ঢিলেঢালা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা আছে। এমনকী ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষোভ-বিক্ষোভ জানানোসহ মতামত জনগণই দেবে। কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব অবহেলা—কোয়ারেন্টিন না মানা বা গুজব ছড়ানোর জন্য জরিমানা গোনা বা গ্রেপ্তার হওয়ার নজির গড়ে আমরা সেই নৈতিক জোর হারাচ্ছি।

সন্দেহভাজন বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিটি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে বাঁচলেও হয়তো বাঁচতে পারেন, কিন্তু অন্য অনেকের মৃত্যুঝুঁকির কারণ হওয়া খুব সম্ভব তার পক্ষে। একজন সুস্থ মানুষ অন্যের মৃত্যুর কারণ হতে চাইবেন না, কিন্তু আতঙ্কিত বা ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের পক্ষে তা অসম্ভব নয়।

আতঙ্ক, শঙ্কাও মহামারির মতো বিস্তৃতশীল। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করা, বিবৃতি দেওয়া বা অভিজ্ঞতা, এমনকী ‘তথ্য’ শেয়ারের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক হওয়ার জরুরত আছে। ভীতি বা গুজব ছড়ানোর পরিণতি হবে আত্মঘাতী। আর, এই মুহূর্তে ‘দেশোদ্ধারের’ চেয়েও জরুরি কাজটি হলো হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার পালনসহ সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়ার মতো মামুলি কাজটি ঠিকঠাক করা। করোনার লক্ষণগুলোর সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে এমন অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনে বাড়িতে থাকা। হ্যাঁ, এটুকুই; এটুকুই এই দুঃসময়ে আপনার মানবিকতার পরাকাষ্ঠা জ্ঞান করা হচ্ছে। কারণ, এর মাধ্যমে আপনি নিজে ঝুঁকিমুক্ত থাকবেন, অন্যের জীবনঝুঁকির কারণ হবেন না।

সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণই এই করোনাভাইরাস-ক্রান্ত সময়ে আমাদের অভেদ্য রক্ষাকবচ।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ