বুধবার , ০১ নভেম্বর ২০১৭

স্বজন না দুর্জন আমাদের ডাক্তার

  বুধবার , ০১ নভেম্বর ২০১৭

ডাক্তার বা ইন্টার্র্ন ডাক্তারদের সঙ্গে প্রায়ই রোগীর স্বজনদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে এক ডাক্তারকে মারাত্মকভাবে আহত করে তার হাত ভেঙে দিয়েছে রোগীর আত্মীয়স্বজন। বেচারা ডাক্তার অত্যন্ত মনোকষ্টে আছেন। তার ভাষ্যমতে, রোগী যখন ভর্তি হয় তখনই লাস্ট স্টেপে ছিল। আমরা এ বিষয়ে আগেই রোগীর স্বজনদের বলেছিলাম। তারপরও রোগী মারা গেলে তারা আমার ওপর হামলা করে এবং এতে আমার হাত ভেঙে যায়। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।

ডাক্তার এবং রোগীর সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। আজকাল ঘন ঘন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রায়ই ডাক্তার, ইন্টার্ন ডাক্তার এবং স্টাফদের কথা-কাটাকাটি এমনকি হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের সবার মধ্য থেকেই ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতা উঠে যাচ্ছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছি না। কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। ডাক্তার যেমন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন, অপরদিকে রোগীর স্বজনদেরও ধৈর্য নেই। তাই পান থেকে চুন খসলেই ডাক্তারকে ধর। তারপর হাসপাতালে ভাঙচুর চালানো হয়। এটা একটা নোংরা মানসিকতা। একে অপরের প্রতি অবিশ্বাসের প্রতিফলন।

গুটিকয়েক ভালো মান ও মনের ডাক্তার ছাড়া আমাদের দেশে ডাক্তারবাবুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। চিকিৎসা ফি, টেস্ট ফি মিলিয়ে পকেটের মোটা টাকা খরচ হয়ে যায় ডাক্তারের কাছে গেলে। ভারতের বিখ্যাত গায়ক নচিকেতার গান- ‘ও ডাক্তার তুমি কতশত পাস করে এসেছ বিলেত ঘুরে, তোমার এমবিবিএস, এফআরসিএস ঝোলাতে...।’

মোটামুটি ছোটবড় সবাই শুনেছে। সেখানে ডাক্তারদের সেবার বিপরীত অবস্থানটি স্পষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সবাই সমান নয়। ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে ডাক্তারদের অতিরিক্ত সুসম্পর্ক সবারই জানা। তাদের দেখানো ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয়। রোগীকে আইসিইউতে বিনা কারণে আটকে রেখে টাকা আদায়ের জন্য কয়েক দিন আগেই এক নামকরা ডাক্তার গ্রেফতার হলেন। এ রকম আরো কত ঘটনা ঘটছে। এতকিছুর পরও রোগী বিশ্বাস রাখে যে, ডাক্তারবাবু হয়তো তাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্তই নিচ্ছেন। তারপরও মানুষ আশায় থাকে। ডাক্তারবাবুই সঠিক সেবা দিতে পারেন। তাদের মুখের ভালো কথা সবকিছু ভুলিয়ে দিতে পারে। সেই অভ্যাসটা ইন্টার্ন করা অবস্থা থেকেই রপ্ত করতে হবে। রোগীর সঙ্গে আত্মীয়ের ব্যবহার করতে হবে। দেশে মুক্তামণির হাতে অপারেশন আর আবুল বাজনাদারের হাত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে সেই ডাক্তাররাই দেশবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

আপা ডাক কি খুব খারাপ কিছু? বাংলায় এই ডাক অত্যন্ত শ্রুতিমধুর এবং আন্তরিক। বাস্তবিক অর্থে কোনো কাউকে যদি ভাই বা আপা বলে ডাকা হয়, তাহলে সেটা খুব বেশি প্রেস্টিজ ইস্যু হওয়ার কথা নয়। ভালোবাসার মিশ্রণ থাকে এই ডাকে। একজন সাধারণ মানুষ এক ইন্টার্ন চিকিৎসককে যদি আপা ডেকেই থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার কথা নয়। অন্তত হাতাহাতি হওয়ার তো কথাই নয়। কিন্তু তা হয়েছে।

পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক ইন্টার্ন চিকিৎসককে পঁচিশ বছর বয়সী কোনো এক রোগীর আত্মীয় আপা সম্বোধন করায় তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা অপর পুরুষ ইন্টার্ন চিকিৎসকের আত্মাভিমানে লাগে এবং তারা সেই ডাক দেওয়া আত্মীয়ের কলার চেপে ধরেন। ঘটনার সূত্রপাত এখান থেকেই। তারপর রীতিমতো লঙ্কাকান্ড। সেই ভর্তিকৃত রোগীকে পরে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময় তিনি পথের মধ্যেই মারা গেছেন। এক আপা ডাকের এত মহিমা কে জানত! জানলে কি আর বেচারা আপা ডাকতে যায়!!

সে কি আদৌ জানত সেই ইন্টার্ন চিকিৎসককে স্যার বা ম্যাডাম ডাকতে হবে। আমার ধারণা, সে জানত না। আবার ইন্টার্ন চিকিৎসকও যে মনে মনে আপা ডাক শোনার জন্য একেবারেই অপ্রস্তুত ছিলেন তাই বা কিভাবে রোগীর আত্মীয় জানবে। সে যে ডাক্তার হতে চলেছে। এই ঘটনায় অবশ্য কর্তৃপক্ষ একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে। রোগীর সেই স্বজন নাকি সেই মহিলা ইন্টার্ন চিকিৎসককে ইভটিজিং করেছে। যদি এই ব্যাখ্যাও মেনে নিই, তাহলেও এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটার কথা নয়। কারণ সেই ইভটিজিংয়ের আইনি শাস্তি রয়েছে এবং খুব সহজেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করে তাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া যেত বা অন্যকোনো শান্তিপূর্ণভাবে মিটমাট করা যেত। মারপিট করার কোনো দরকার ছিল না।

ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং মেডিক্যাল কলেজের কিছু ছাত্র মিলে সেই স্বজনদের মারধর করেছে। অথচ সেটা একটা হাসপাতাল। যেখানে কেউ আহত হতে নয়, বরং আহত হওয়ার পর যায় চিকিৎসা নিতে। এই ঘটনা এখানেই প্রথম নয়। সিরাজগঞ্জেও প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সেখানেও রোগীর মৃত্যু হয়েছিল এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেখান থেকেও ঘটনার পেছনে রোগীর স্বজনদের ইভটিজিং করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। মাঝে মাঝেই দেখা যায়, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিভিন্ন দাবিতে ধর্মঘট ডাকছে। সব সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে তারা সেই ধর্মঘট সফল করে তুলছে। তাছাড়া রোগীর সঙ্গে বাক-বিতন্ডা এমনকি হাতাহাতির ঘটনা একেবারেই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক্তারি একটা মহান পেশা। এই পেশার সঙ্গে জড়িতদের মানুষ সবসময় সুপারম্যান হিসেবে দেখে। কারণ এই ডাক্তার মানুষের শেষ সময়ের আশার আলো দেখাতে পারে। কিন্তু আমাদের এসব ইন্টার্ন চিকিৎসক যারা আর কয়েক দিন পরেই পূর্ণাঙ্গ ডাক্তার হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেবা দিতে যাবে, তাদের এই অসহিষ্ণুতা দেখানো মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়।

ডাক্তারি একটি সেবামূলক পেশা। সেবামূলক পেশায় থেকে ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই আসতে হবে। রোগীর সঙ্গে বা তার সঙ্গে আসা লোকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং হাতাশাজনক। পঁচিশ বছর বয়সী এক তরুণের মুখে আপা ডাক শোনার পরই যদি ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তাকে আক্রমণ করে বসতে হয়, তাহলে তার ভবিষ্যতে এই পেশায় না আসা উত্তম। কারণ আমাদের দেশের গ্রামেগঞ্জে খেটে খাওয়া মানুষ ঠিক সবসময় স্যার বলাটা রপ্ত করতে পারেননি। তারা সব সময় হুজুর হুজুর করতে শেখেননি। তারা বিশ্বাস করতে শিখেছেন। তাই তাদের অন্তরের ডাক শুনতে হবে। আপা বা ভাই ডাক শুনেই রেগে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে স্যার বা ম্যাডাম নয়, বরং আপা বা ভাই ডাকতেই অভ্যস্ত। আমাদের হবু ডাক্তারবাবুদের এসব ডাক শুনতে অভ্যাস করতে হবে।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ