বৃহস্পতিবার , ০২ নভেম্বর ২০১৭

আটকে আছে ট্রানজিট : সম্ভাবনার দুয়ার রুদ্ধ

  বৃহস্পতিবার , ০২ নভেম্বর ২০১৭

ভারত, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের সঙ্গে ট্রানজিট বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটি দীর্ঘসূত্রতায় আটকা পড়েছে। দেশগুলোর ইচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক বিরোধিতা, নীতিনির্ধারণী মহলে সিদ্ধান্তহীনতাসহ নানা কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ট্রানজিট বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অথচ এসব দেশকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার রিজিওনাল ‘হাব’-এ রূপান্তরিত হবে। বদলে যাবে চট্টগ্রাম বন্দর, পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতিও। চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় দ্বিগুণ হবে। ট্রানজিট শুরু হলে ভারতের সেভেন সিস্টার বলে খ্যাত রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বহুলাংশে বেড়ে যাবে। কমে যাবে অবৈধ বাণিজ্য। ট্রানজিট ঝুলে থাকায় গতি পাচ্ছে না চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন। একাধিক প্রতিবেশী দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার সব সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। এ বন্দর বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর মতো চট্টগ্রাম বন্দরকে একুশ শতকের উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমারের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর রিজিওনাল ‘হাব’-এ পরিণত হবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের সঙ্গে মিয়ানমার, ভুটান ও চীনের আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। এসব অঞ্চলকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হলে সব দেশের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে দেশের অর্থনৈতিক চেহারাও পাল্টে যাবে। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে ভারতের সেভেন সিস্টার অঞ্চলে ব্যাপক বাণিজ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে না একমাত্র সমুদ্রবন্দরজনিত কারণে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এসব রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য কলকাতা বন্দরকেন্দ্রিক। এ অঞ্চলে কোনো সমুদ্রবন্দর না থাকায় দূর পথ দিয়ে বিপুল খরচে এ অঞ্চলের ব্যবসয়ীরা পণ্য আমদানি-রফতানি করে থাকেন। অথচ কাছেই রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও কলম্বোতে কনটেইনার জাহাজ চলাচল করছে। সম্প্রতি কলকাতা বন্দরেও পণ্য নিয়ে একটি জাহাজ আসা-যাওয়া করেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাজারগুলো কলকাতা বন্দরের মাধ্যমে ফিডার জাহাজে করে তাদের পণ্য বিভিন্ন দেশে পাঠায়। এতে সময় ও দাম দুটোই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে এসব রাজ্যের ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি-রফতানি করলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চেহারা যেমন পাল্টে যাবে, তেমনি সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।

এদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বেড়েই চলছে অবৈধ বাণিজ্য। সীমান্তপথে আসছে ভারতীয় পণ্য, অপরদিকে বাংলাদেশ থেকেও যাচ্ছে ভারতের চাহিদামতো পণ্য। দুই দেশের একশ্রেণীর ব্যবসায়ী অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। ব্যবসায়ীদের মতে, এ অবৈধ বাণিজ্যের অঙ্ক ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। চট্টগ্রাম চেম্বারের উদ্যোগে ভারতের উত্তর-পূবাঞ্চলীয় রাজ্যের ব্যবসায়ীরা অবৈধ বাণিজ্যের ওপর জরিপ করেছেন। এতে জানা গেছে, ভারত থেকে যে পরিমাণ পণ্য বাংলাদেশে আমদানি হয়, তার চেয়েও বেশি পরিমাণ পণ্য অবৈধভাবে দেশে ঢোকে। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও অবৈধপথে ভারতে বিপুল পণ্য যায়।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বলে খ্যাত ত্রিপুরা, মিজোরাম, আসাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, মেঘালয়ে বাংলাদেশি যেসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, তৈরি পোশাক, ফলের রস, ইলিশ, চিপস্, কনফেকশনারি আইটেম, শুঁটকি মাছ, কটন, পাস্টিক ফুটওয়্যার, স্যান্ডেল, পাস্টিক টেবিল, কিচেন ওয়্যার, জামদানি শাড়ি, কাঁচা পাট, মিনারেল ওয়াটার, চানাচুর, সস, মটরডাল, এমএস রড, সিমেন্ট, ইট, সিআইশিট, আইসক্রিম, ইমারজেন্সি লাইট, কনডেন্সড মিল্ক ইত্যাদি। পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো হতে বাংলাদেশে যেসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কয়লা, আদা, পেঁয়াজ, ড্রাই চিলি, পোলট্রি ফিড, ডিম, কাপড়, চিনি, অটো পার্টস, বিভিন্ন ফল, প্রকৌশল পণ্য, টিউবলাইট ইত্যাদি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত রাজ্যগুলোর বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য না বাড়ার কারণে সীমান্তপথে ব্যাপক চোরাচালান হয়।

বাংলাদেশের পরবর্তী দরজা বলে পরিচিত ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যের অন্যতম অরুণাচল। এ রাজ্যের প্রধান ফসল হচ্ছে ধান, ভুট্টা, গম, সরিষা, চিনি ও ডাল। ফলের মধ্যে রয়েছে, আনারস, আপেল, কমলা, আঙুর। প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে রয়েছে, কয়লা, চুন, পেট্রোলিয়াম পণ্য, পাথর। আসামে উৎপাদিত ফসলের মধ্যে রয়েছে, ভুট্টা, পাট, চিনি, তুলা ও চা । প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে আছে কয়লা, চুন, পেট্রোলিয়াম পণ্য, লোহা, বিভিন্ন পাথর। মণিপুরে ভুট্টা, তেল, বিভিন্ন বীজ, সরিষা, ধান, চিনি, গম পাওয়া যায়। আছে চুনাপাথর ও ক্রোমেট। মেঘালয়ে হয় ভুট্টা, ধান ও পাট। আছে রাবার ও কফির বনায়ন। রয়েছে কয়লা, কাচ, চীনামাটির আকরিক। মিজোরামে ধান, ভুট্টা, রাবার, চা ও কফি উৎপাদিত হয়। কয়লা, চুনাপাথর এবং গ্যাস রয়েছে এ রাজ্যে। নাগাল্যান্ডে ধান, ভুট্টা, পাট, চিনি, কলা, আনারস, আদা ও হলুদসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন রয়েছে। আছে খনিজ সম্পদ। ত্রিপুরায় চিনি, কলা ও কমলার রফতানিযোগ্য উৎপাদন রয়েছে।

চট্টগামের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা বলেছেন, অনেক পণ্য আছে সেগুলো ভারতের সাত রাজ্য থেকে অন্য দেশের তুলনায় কম দামে আমদানি করা যায়। আবার ভারতও চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা নিতে পারে, এতে বন্দরের আয় বাড়বে। অন্যদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যর ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশ থেকে কম দামে ও কম পরিবহন খরচে পণ্য নিতে পারেন।

 অর্থ-বাণিজ্য থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ