শনিবার , ২৬ আগষ্ট ২০১৭

Under Construction

নায়করাজের পালকি বানানোর গল্প

  শনিবার , ২৬ আগষ্ট ২০১৭

নায়করাজ রাজ্জাক ভাই আমার খুব আপন মানুষ ছিলেন। কতটা আপন তা বলে বোঝানো যাবে না। তার প্রথম ছবি, ‘বেহুলা’য় তিনি সুচন্দা আপার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন, তখন আমরা তখন গেন্ডারিয়া বাসায় থাকতাম। জহির রায়হান আমার দুলাভাই। তখন থেকে রাজ্জাক ভাইকে চিনি। তিনি আমাদের বাসায় আসতেন। আমি তখন অনেক ছোট। আমি ভাবতাম, রাজ্জাক ভাই বুঝি আমাদের আত্মীয়। জহির ভাই ‘সংসার’ নামে একটা ছবি বানাবেন। আমাকে নেবেন। আমি ছবিতে অভিনয় করব ভাবিনি। আমি রাজি ছিলাম না। সুচন্দা আপা বললেন, একটা মাত্র ছবি, তোর দুলাভাই বলছে, কর। সে ছবিতে আমি রাজ্জাক ভাইয়ের কন্যার ভূমিকায় অভিনয় করেছি। সুচন্দা আপা মা, রাজ্জাক ভাই বাবা। সাজ্জাদ মাহমুদ নায়ক। ছবিটি রিলিজ হলো। প্রথম ছবিতে আমার নাম ছিল, সুবর্ণা। ছবিটি বেশি চলেনি। এর দুবছর পর জহির ভাই আমাকে নায়িকা করে ছবি বানাবেন। ছবির নাম, ‘শেষ পর্যন্ত’। নায়ক রাজ্জাক। ছবি করতে গিয়ে প্রবলেম হলো, আমি কিছুতেই সহজ হতে পারছি না। রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করতে পারছি না। আমি ভাবছি, কয়দিন আগে ‘বাবা’ বলে ডাকলাম আর এখন প্রেমের অভিনয় করতে হবে। পারব না। জহির ভাই লাগালেন বকা, ‘তুমি কি এটাকে সত্যি মনে করেছ?। এটা তো সিনেমা।’
রাজ্জাক ভাই বললেন, ‘তুমি এখনো ছোট্টটিই রয়ে গেছ। আগে তোমাদের বাসায় যখন যেতাম, তুমি ফ্রিজের র‌্যাক খুলে ভেতরে বসে থাকতে তোমার গরম লাগত বলে।’ আমি বললাম, তাই নাকি। আপনার সব মনে আছে। আমরা একটা পরিবারের মতো ছিলাম।
প্রথম ছবি। আমার আম্মা হসপিটালে। আমি ছবির কাজ করে পাওয়া ১২ হাজার টাকায় গাড়ি কিনেছি। আম্মাকে গাড়ি দেখাব। তারপর সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যাব। সবাই এলো। ভেতরে গিয়ে শুনি, আম্মা দুই মিনিট হলো মারা গেছেন। এরপর ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘স্বরলিপি’, ‘টাকা আনা পাই’ করি।
রাজ্জাক-ববিতার ছবি মানেই সুপার হিট। রাজ্জাক ভাইয়ের প্রোডাকশনের বেশিরভাগ ছবির নায়িকাই আমি। এ নিয়ে অন্যরা হিংসা করত। কেন শুধু ববিতাকেই উনি নেন। ‘অনন্ত প্রেম’ রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের প্রথম ছবি। লাভ স্টোরি। কাপ্তাই, রাঙামাটি। নিরাপত্তারক্ষীরা বললেন, ‘আপনাদের নিজ দায়িত্বে যেতে হবে। আমরা আর ভেতরে যাব না।’ ওখানে এই পাহাড় থেকে ওই পাহাড় যাতায়াতের জন্য রাজ্জাক ভাই একটা ছোট্ট পালকি বানালেন। ওইখানে একটা পাহাড়ে আমি বিশ্রাম নিতাম। পাহাড়টির নাম হয়ে গিয়েছিল, ‘ববিতা পাহাড়’। পাহাড়টির সামনে আমাদের মৃত্যুদৃশ্য চিত্রায়িত হয়। ছবিটি সুপার হিট হয়েছিল।
রাজ্জাক ভাই ছিলেন আমার ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড। কয়েকদিন আগে তাকে বললাম, রাজ্জাক ভাই, আমি তো ভালো রান্না করতে পারতাম না। এখন শিখেছি। আপনাকে খাওয়াব। আপনি, ভাবি আর বাচ্চাদের নিয়ে একদিন আসেন। রাজ্জাক ভাই বললেন, ‘আমি থাইল্যান্ডে যাচ্ছি পুরো ফ্যামিলি নিয়ে। ফিরে আসি, তারপর আসব।’ নায়করাজ রাজ্জাক ভাইয়ের কথাটি থেকে গেল, তাকে খাওয়ানোর সুযোগ আর আমার হলো না। রাজ্জাক ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।
পরিচিতি: চলচ্চিত্র অভিনেত্রী

 সাক্ষাৎকার থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ